বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি ঘনবসতিপূর্ণ ছোট্ট দেশ। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অন্তর্গত অর্থ বিভাগ প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্যমতে বাংলাদেশে বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.১২ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে সে তুলনায় দেশে বাসস্থান ও খাদ্যের অপ্রতুলতা চোখে পরার মতো।
অন্যদিকে অতিরিক্ত জনসংখ্যার ফলে দেশে বেকারত্বের পরিমাণও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। বিপুলসংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেকোনো সরকারের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এই বেকার জনগোষ্ঠী নিজেরাই কর্মের খোঁজে গ্রাম থেকে শহরে চলে আসছে ফলে নগরায়ণ হচ্ছে তরতর করে।
অতিরিক্ত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে কমে যাচ্ছে জমি। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে শহরাঞ্চলে আবাসিক সুবিধা তৈরি করতে গিয়েই হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে শহরের খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের জন্য তৈরি করা পার্ক, ভরাট হচ্ছে জলাশয়। যেহেতু খেলার মাঠ কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে তাই আমাদের বর্তমান প্রজন্ম ডুবে গেছে মোবাইলের স্ক্রিনে। আমাদের শিশুরা তাদের রঙিন শৈশব হারিয়ে ফেলছে ডিজিটাল স্ক্রিনের অতল গহ্বরে।
অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তি বা স্ক্রিন-নির্ভরতা কমাতে শহুরে বাচ্চাদের হাতে আমরা তুলে দিয়েছি রংবেরঙের প্লাস্টিকের খেলনা ও শিক্ষা উপকরণ। আরও তুলে দিয়েছি বিভিন্ন রঙের মডেলিং-ক্লে যা দিয়ে বিভিন্ন আকার আকৃতির খেলনা তৈরি করা যায়।
আমরা অভিভাবকরা হয়তো শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ভালো হবে এই ভেবে এ ধরনের খেলনা ও রংবেরঙের উপকরণ কিনে দিয়েছি, কিন্তু এই খেলনা ও মডেলিং-ক্লে শিশুদের জীবনে নিয়ে আসতে পারে মহাবিপর্যয়। এসব খেলনা ও মডেলিং-ক্লে শিশুস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এসব খেলনায় পাওয়া যাচ্ছে শরীরের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতু ও মাইক্রো প্লাস্টিক যা মানব শরীরের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এসব খেলনার মোটামুটি ৮০ শতাংশ আসে বিদেশ থেকে বাকি ২০ শতাংশ বাংলাদেশের রিসাইক্লিং প্লাস্টিক থেকে তৈরি হয়।
ফিলিপাইন-ভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ও বাংলাদেশের বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক সম্পাদিত গবেষণার ২০২৪ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায় বাংলাদেশে শিশুদের খেলনা বিশেষ করে পুতুল, বর্ণমালা, খেলনা গাড়ি, ব্যাঙ, মগ, ফিডার, প্যাসিফায়ার (শিশুদের চূষণী) ও ব্যাগ ইত্যাদিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন টয় সেফটি রেগুলেশন (২০২৫/২৫০৯) নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে লেড অন্তত ৫ গুণ বেশি, মারকিউরি অন্তত ৪ গুণ বেশি এবং ক্যাডমিয়াম অন্তত ১৫ গুণ বেশি। এ ছাড়া ব্রোমিন, সিসা ও ক্রোমিয়ামের উপস্থিতিও নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
অন্যদিকে মডেলিং ক্লেতে রয়েছে থ্যালেট প্লাস্টিসাইজার, অ্যাসবেস্টস ও বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতু যেমন ক্যাডমিয়াম, লেড, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, মার্কারি ও নিকেল। এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ জার্নালে ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে মডেলিং-ক্লেতে উপস্থিত পলিভিনাইল ক্লোরাইড ও থ্যালেট প্লাস্টিসাইজার শিশুদের হাত থেকে সরাসরি মুখে যেতে পারে এমনকি ধুয়ে ফেলার পরও!
এই নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে হাত থেকে মুখে যাওয়ার প্রবণতা অন্ততপক্ষে ৫০ শতাংশ যা প্রতি ১০০ গ্রামে ৮.৪৪ মিলিগ্রাম মুখের মধ্যে যাওয়ার সমতুল্য। এ ছাড়া থ্যালেট সরাসরি ত্বকের মধ্য দিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে যা শিশুর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। থ্যালেট মানব শরীরে নানা ধরনের রোগ সৃষ্টি করতে পারে যেমন টেস্টিকুলার এট্রফি, জন্মগত ত্রুটি, যকৃত এবং থাইরয়েড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, পলিনিউরোপ্যাথি, জেনেটিক ত্রুটি ও ক্যানসার ইত্যাদি।
আর্কাইভস অব এনভায়রনমেন্টাল কন্টামিনেশন অ্যান্ড টক্সিকোলজি ও টালান্টা জার্নালে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে খেলনায় বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতু রয়েছে যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন টয় সেফটি রেগুলেশন (২০২৫/২৫০৯) নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। এসব ভারী ধাতুর উপস্থিতি শিশুর স্নায়ু রোগ হওয়ার অন্যতম কারণ (যেমন শিশুর আচরণের অস্বাভাবিক পরিবর্তন ও বুদ্ধাঙ্ক কমে যাওয়া), এলার্জিক রিঅ্যাকশন, হরমোনজনিত সমস্যা ও ক্যানসার ইত্যাদি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
২০২২ সালে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চ জার্নালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে দেখা গেছে পাকিস্তান থেকে বিভিন্ন প্লাস্টিক খেলনার ৪৪টি নমুনা সংগ্রহ করা হয় যার মধ্যে অন্তত ১৯টি নমুনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন টয় সেফটি রেগুলেশন (২০২৫/২৫০৯) নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতু যেমন লেট ক্যাডমিয়াম ইত্যাদির পরিমাণ বেশি। আবার অন্ততপক্ষে ২০টি নমুনায় নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে লেড, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও নিকেলের পরিমাণ বেশি।
এই গবেষণাটি আমাদের দেশের না হলেও মোটামুটি দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা কিছুটা প্রকাশ করেছে যেটি বাংলাদেশের সঙ্গে বেশ ভালো রকম সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুতরাং এটি সহজে বলা যায় যে আমাদের দেশে যেসব খেলনা ও মডেলিং-ক্লে পাওয়া যায় তা আমাদের শিশুদের জন্য এক ধরনের নীরব ঘাতক, কেননা এই খেলনাই কেড়ে নিতে পারে আমাদের কোমলমতি শিশুদের ভবিষ্যৎ। আমাদের শিশুরা আক্রান্ত হতে পারে বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে।
তাই এখনই সময় প্লাস্টিক খেলনা ও মডেলিং-ক্লে নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করার যাতে করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর ভয়াবহ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে। এ জন্য আমরা সার্টিফাইড নন-টক্সিক (বিষমুক্ত) বিকল্প খুঁজে বের করতে পারি যা বাচ্চাদের ক্ষতি করবে না।
এ ছাড়া লোকাল যেকোনো ধরনের প্লাস্টিক খেলনা ও ক্লে বর্জন করতে পারি অথবা ব্যবহার কমাতে পারি। তা ছাড়া শিশুদের আমরা ছোটবেলা থেকে খেলার মাঠে নিয়ে খেলাধুলা করানোর অনুশীলন করতে পারি তা হলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ পরিপূর্ণভাবে হবে। এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে সুস্থ-সবল ও কর্মঠ। তাই আমাদের সবার উচিত নিজে সচেতন হওয়া এবং অন্যদের এসব খেলনার ব্যাপারে সচেতন করে তোলা।
প্রভাষক, খাদ্য প্রকৌশল ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
সময়ের আলো/এআর