গ্লোবাল সাউথের উত্থান কী বার্তা দিচ্ছে!

মো. শাহিন আলম

বিবিধ

বিশ্ব রাজনীতির বড় পরিবর্তনগুলো সাধারণত দৃশ্যমান নাটকীয়তার ভেতর দিয়ে আসে যুদ্ধ, বিপ্লব কিংবা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অভিঘাতে। কিন্তু কিছু পরিবর্তন ঘটে

2026-02-23T04:03:39+00:00
2026-02-23T04:03:39+00:00
 
  শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬,
২৬ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
বিবিধ
গ্লোবাল সাউথের উত্থান কী বার্তা দিচ্ছে!
মো. শাহিন আলম
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:০৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বিশ্ব রাজনীতির বড় পরিবর্তনগুলো সাধারণত দৃশ্যমান নাটকীয়তার ভেতর দিয়ে আসে যুদ্ধ, বিপ্লব কিংবা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অভিঘাতে। কিন্তু কিছু পরিবর্তন ঘটে নীরবে, কূটনীতি ও বাণিজ্য প্রবাহের দিকবদলে। ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর উত্থান তেমনই এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, যা ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতি দীর্ঘ সময় আবর্তিত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন নামক দুই পরাশক্তিকে কেন্দ্র করে। তাদের পারস্পরিক আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক উত্তেজনা দক্ষিণের দেশগুলোর অর্থনীতিকে প্রায়শই নির্ভরতার কাঠামোর ভেতর আবদ্ধ করে রেখেছিল। 

উন্নয়ন, বাণিজ্য কিংবা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত অসমতা লক্ষ করা যেত। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণের দেশগুলোকে প্রায়শই প্রান্তিক অবস্থানে থাকতে হয়েছে। 
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী তিন দশক যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর একমেরু বাস্তবতাকে প্রায় চূড়ান্ত বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু আজ সেই স্থিতি প্রশ্নবিদ্ধ। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গভীরে এখন বহুমাত্রিক পরিবর্তনের প্রবাহ তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হলো গ্লোবাল সাউথের উত্থান।

গ্লোবাল সাউথ কোনো ভৌগোলিক অঞ্চল নয়। এটি মূলত আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে এমন একটি ধারণা। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এগুলোর সব কটি উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত দেশ। 

গ্লোবাল সাউথের ধারণা সম্পূর্ণ নতুন নয়। সত্তর দশকের প্রথম দিক থেকেই তৃতীয় বিশ্বের পাশাপাশি এ ধারণা চলে আসছে। তবে সাম্প্রতিককালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং ভূরাজনৈতিক গতিশীলতায় এ দেশগুলো তাদের অবস্থানের বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা বর্তমান আন্তর্জাতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জও করছে।

গ্লোবাল সাউথের এই নব-উত্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন। একসময় জি৭৭ উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমষ্টিগত অর্থনৈতিক দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। এখনও এটব বৈশ্বিক অর্থনীতির এক-পঞ্চমাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বিদেশি বিনিয়োগের বিভিন্ন প্রবাহও ক্রমশ দক্ষিণমুখী হচ্ছে। 

তবে এর ভেতরে নানা দেশ উন্নয়নের এবং রাজনৈতিক শক্তির নানা স্তরে অবস্থান করছে। এখানে যেমন চীন, ভারত বা ব্রাজিলের মতো দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণ হওয়া দেশ অন্তর্ভুক্ত, একই সঙ্গে আফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উন্নয়নের নিচের সারির দেশও রয়েছে। এসব দেশের যে বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়, এর মধ্যে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলোÑ এদের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ তরুণ এবং শ্রমশক্তিতে তাদের প্রাচুর্য আছে।

এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে চীনের উত্থান। চীন ইতিমধ্যে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তর অর্থনীতির দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জায়গা করে নিয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ ও গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে চীন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের পরাশক্তিও বটে। চীনের এ নতুন অবস্থান ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

কৌশলগত ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও দক্ষিণের দেশগুলো দৃশ্যমান ভূমিকা রাখছে। ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) প্রথমে উদীয়মান অর্থনীতির আলাপমঞ্চ হিসেবে শুরু হলেও এখন বৃহত্তর দক্ষিণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। সম্প্রসারণের মাধ্যমে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়ার অন্তর্ভুক্তি জোটটির ভৌগোলিক ও জ্বালানি প্রভাব বাড়িয়েছে। জ্বালানি বাজার, ডলার বিকল্প মুদ্রায় লেনদেন (রুবল, ইউয়ান) এবং নিষেধাজ্ঞা-নীতির প্রশ্নে এটি একটি বিকল্প কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করছে। তবে এটিকে সরলভাবে পশ্চিমবিরোধী ব্লক হিসেবে দেখা হলে সত্যের সঙ্গে পুরোটা মেলানো হবে না। 

২০২২ সাল থেকে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধ, ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল-হামাসের যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র পরিহার এবং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করণের লক্ষ্যে মার্কিন উদ্যোগ; আন্তর্জাতিক মেরুকরণকে তীব্র করলেও গ্লোবাল সাউথের বহু দেশ সরাসরি কোনো একক শিবিরে অবস্থান নেয়নি। 

ভারত যেমন পশ্চিমের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রেখে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অটুট রেখেছে। আফ্রিকার অনেক দেশও একইভাবে বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করছে। এই বাস্তববাদী অবস্থানের ফলে সহজেই অনুমেয় হচ্ছে যে, দক্ষিণের দেশগুলো এখন নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক এটিকে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। 

এই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ধারাবাহিকতায় দক্ষিণের দেশগুলো একুশ শতকের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ও সমষ্টিগত স্বার্থ সঠিকভাবে প্রতিফলিত করার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থা ও বৈশ্বিক শাসন সংস্থাগুলোর সংস্কারের জন্য দক্ষিণ দেশগুলো জোরালো দাবি উপস্থাপন করছে। 

তবে এই উত্থানের অন্তরালে গভীর সংকটও রয়েছে। বিশেষকরে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ খাদ্যনিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত ঝুঁকির মুখে। এসব মোকাবিলায় উত্তরের দেশগুলো থেকে যে ধরনের আর্থিক সহায়তা পাওয়ার কথা, তা এখনও পায়নি। 

এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় নানা সভা-সম্মেলনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। একই সঙ্গে, চীন ও ভারত গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাদের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছে। ফলে নেতৃত্ব নিয়ে দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে একধরনের বিভাজন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশও এ বৃহত্তর দক্ষিণের অংশ হিসেবে নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান পুনর্নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছে। আঞ্চলিক সংহতি ও সহযোগিতার ক্ষেত্র যেমন সার্ক ও বিমসটেক বাংলাদেশের জন্য বহুপক্ষীয় কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। রফতানি বৈচিত্র্যকরণ, আঞ্চলিক সংযোগ, ব্লু ইকোনমি এবং জলবায়ু অর্থায়নে সক্রিয় ভূমিকা দেশকে বহুমেরু বাস্তবতায় অধিকতর সক্ষম করে তুলতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, গ্লোবাল সাউথের উত্থান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকশিত মানচিত্রে একটি যুগান্তকারী ও রূপান্তরকারী শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছে। এই দেশগুলো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের নতুন করে প্রকাশ ও জাহির করছে। বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা নতুন করে তৈরি করে দিচ্ছে এবং বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর জন্য দাবি ও চ্যালেঞ্জ করছে। যা বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের দিকে ধাবিত করছে।

শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/এআর


  বিষয়:   গ্লোবাল সাউথ  উত্থান  বার্তা 


Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: