২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজার যুদ্ধে কতজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেখানে ৭২ হাজারের কিছু বেশি মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে, সেখানে সাম্প্রতিক একাডেমিক গবেষণাগুলো বলছে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
বিশেষ করে চিকিৎসাবিষয়ক জার্নাল দ্য ল্যানচেট গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত গবেষণা ইঙ্গিত দিয়েছে, সরকারি হিসাব আসলে ন্যূনতম সংখ্যা। তা হলে প্রকৃত চিত্র কী? বিভিন্ন গবেষণা, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য মিলিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।
সরকারি হিসাব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য : গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭২ হাজার ৭২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও চলমান হামলায় ৬১৪ জন নিহত হয়েছে। আহতের সংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজার ৭৪১।
মন্ত্রণালয় জানায়, নিহতদের তালিকায় নাম, বয়স, লিঙ্গ ও পরিচয় নম্বর যুক্ত করা হয়। প্রতিটি ফিলিস্তিনির একটি নির্দিষ্ট পরিচয় নম্বর রয়েছে, যা ইসরাইল-নিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা নিবন্ধনের আওতায়। ফলে তালিকাটি বাহ্যিকভাবে যাচাইযোগ্য। তবে এই হিসাব কেবল হাসপাতাল-নিবন্ধিত মৃত্যুকে অন্তর্ভুক্ত করে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া বা অপ্রবেশযোগ্য এলাকায় থাকা মরদেহের সংখ্যা এতে ধরা পড়ে না।
কেন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এটিকে নির্ভরযোগ্য মনে করে : জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় দফতর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নিয়মিত তাদের প্রতিবেদনে এই মন্ত্রণালয়ের তথ্য ব্যবহার করে। অতীতের ২০০৮-০৯ ও ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধেও মন্ত্রণালয়ের হিসাব জাতিসংঘের স্বতন্ত্র গণনার সঙ্গে প্রায় মিলে গিয়েছিল।
রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিশেল স্প্যাগাট বলেন, পরিচয় নম্বর যুক্ত থাকায় তথ্য যাচাই সম্ভব। তার মতে, এত বড় ডেটাসেটে ছোটখাটো ত্রুটি থাকলেও বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া যায়নি। তবে তিনি এটিকে ‘ন্যূনতম হিসাব’ হিসেবে দেখার পরামর্শ দেন।
ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথের নতুন গবেষণা : ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ প্রকাশিত দ্য ল্যানচেট গ্লোবাল হেলথের গবেষণা বলছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৫ হাজার ২০০। একই সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব ছিল ৪৯ হাজার ৯০, অর্থাৎ প্রায় ৩৫ শতাংশ কম।
গবেষণাটি আরও বলছে, সংঘাতের পরোক্ষ প্রভাবে যেমন অনাহার, ওষুধের অভাবে অতিরিক্ত ৮ হাজার ৫৪০ জন মারা গেছে। এ ছাড়া প্রায় ১২ হাজার মানুষ নিখোঁজ, যাদের অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা। ফলে ২০২৫ সালের জানুয়ারি-নাগাদ মোট মৃত্যুসংখ্যা ৯৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
গবেষণার পদ্ধতি কী ছিল : গবেষকরা গাজায় ২ হাজারের বেশি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরিবারগুলোর সদস্যদের মৃত্যুর তথ্য নিয়ে জনসংখ্যা-প্রতিনিধিত্বমূলক একটি হিসাব দাঁড় করানো হয়। তবে সীমাবদ্ধতা ছিল। অনেক ক্ষেত্রে পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় কেউ তথ্য দেওয়ার মতো জীবিত ছিলেন না। এই গবেষণায় অংশ নেন স্ট্যানফোর্ড, প্রিন্সটন, রয়্যাল হলোওয়ে এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা।
অধ্যাপক স্পাগাট বলেন, ফলাফল প্রমাণ করে যে সরকারি হিসাব অতিরঞ্জিত নয়, বরং প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
আগের গবেষণাগুলোর চিত্র : ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ল্যানচেটে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রথম ৯ মাসে ৬৪ হাজার ২৬০ জন নিহত হয়েছে, যা একই সময়ের সরকারি হিসাবের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি।
এ ছাড়া ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ও বার্সেলোনার সেন্টার ফর ডেমোগ্রাফিক স্টাডিজের গবেষণায় ২০২৪ সালের শেষ-নাগাদ নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজার ৬১৪ থেকে ৮৭ হাজার ৫০৪-এর মধ্যে বলে অনুমান করা হয়। পরবর্তী বিশ্লেষণে তারা বলেন, ২০২৫ সালের অক্টোবর-নাগাদ সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে।
নারী ও শিশুদের অনুপাত : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ তালিকা অনুযায়ী, নিহতদের অর্ধেকের বেশি নারী, ১৮ বছরের নিচের শিশু ও ৬৫ বছরের ঊর্ধ্ব প্রবীণ। ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথের গবেষণা বলছে, এই অনুপাত ৫৬ শতাংশ, সরকারি হিসাবের চেয়ে দুই শতাংশ বেশি।
ইসরাইলের অবস্থান : শুরুর দিকে ইসরাইলি কর্মকর্তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যকে অবিশ্বস্ত বলে দাবি করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেন মারমরস্টেইন ২০২৪ সালে বলেন, এসব সংখ্যা সঠিক নয়।
তবে ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি এক জ্যেষ্ঠ ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধে ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যা পূর্বে বিতর্কিত সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এফআর