নীরব অথচ বিস্ফোরিত এক মাতমে ভারী হয়ে উঠেছে তেহরানের আকাশ। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় ইরান যেন হঠাৎই এক বিস্তীর্ণ কারবালায় রূপ নিয়েছে। সেখানকার মানুষের যৌথ অবচেতন থেকে বেরিয়ে এসেছে ত্যাগ, বেদনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার এক অনন্ত প্রতীকী তাৎপর্য। ইমাম হোসাইনের প্রতীকী আখ্যানই যেন ভিন্ন পরিসরে আবারও রাস্তায় রাস্তায় প্রতিধ্বনিত। সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মানুষের মুখে যে আর্তি, বুক চাপড়ে যে বিলাপ, কালো পতাকায় ঢাকা যে শহর তা কেবল রাজনৈতিক বিদায়ের শোক নয় বরং এক বিশ্বাস, এক ধারাবাহিকতার ছিন্ন হওয়ার অনুভূতি। তেহরানের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা বহু মানুষের চোখে পানি ছিল কিন্তু সেই পানি কেবল একজন ব্যক্তির জন্য নয় বরং এক যুগের অবসানের জন্য।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছেন। কেউ কালো পোশাক পরেছেন, কেউ হাতে বহন করছেন নেতার ছবি, কেউবা কুরআন উঁচিয়ে প্রার্থনায় মগ্ন। শোক এখানে নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সমষ্টিগত আবেগের উথালপাথাল।
ইউরো নিউজের খবরে বলা হয়েছে তেহরানের বিভিন্ন চত্বরে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমবেত হয়ে বিলাপ করেছেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শোকগাথা উচ্চারণ করেছেন। কারও কারও মুখে শোনা গেছে স্লোগান, যা শোকের পাশাপাশি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
তেহরানের এক নারী শহরের প্রধান বিক্ষোভের ভিড়ে ছিলেন। ‘আমরা কান্না করছি, আমরা গান করছি, আমরা শোক প্রকাশ করছি, এটা আমাদের জন্য একটি গভীর বেদনা।’ মাশহাদশহরের প্রাচীন ধর্মীয় স্থানটির কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তি বলেন, আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারছি না। আমাদের নেতা চলে গেছে। এটা কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয় এটা একটা যুগের শেষ।
এএফপির খবর অনুযায়ী, শোকের আবহ শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; দেশের বিভিন্ন শহরেও মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতার এক মিশ্র রূপ দেখা গেছে সর্বত্র। অনেকে একে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করেছেন।
তেহরানের রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধকে ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, আমরা এতিম হয়ে গেলাম। তার এই উচ্চারণ ব্যক্তিগত বেদনার হলেও, তা যেন বৃহত্তর জাতীয় অনুভূতির প্রতিধ্বনি। অনেক তরুণের চোখে ছিল অনিশ্চয়তার ছাপ। তারা বুঝতে পারছিল, এই মৃত্যু কেবল একজন নেতার প্রয়াণ নয় বরং একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি।
কারবালার মিথে যেমন অবরুদ্ধ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে ছিল একটি ক্ষুদ্র দল, তেমনি আজকের ইরানে বহু মানুষ নিজেদের এক প্রতীকী সংগ্রামের অংশ বলে অনুভব করছেন। অবশ্য এই তুলনা কেবল আবেগের স্তরে; বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবু শোকের ভাষা, বুক চাপড়ে বিলাপের দৃশ্য, কালো পতাকার সারি; এসব মিলিয়ে কারবালার স্মৃতিচিহ্ন যেন নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
ইউরো নিউজ আরও জানিয়েছে, বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, তবে বিক্ষোভ বা সহিংসতার বড় কোনো ঘটনা সঙ্গে সঙ্গে জানা যায়নি। মানুষের সমাগম ছিল বিপুল কিন্তু তা ছিল মূলত শোক প্রকাশের জন্য। এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর খবর প্রচার করার পর থেকেই জনতার ঢল নামে। অনেকে রাতভর রাস্তায় অবস্থান করেন। শোকগাথা, ধর্মীয় সংগীত এবং সমবেত প্রার্থনা সব মিলিয়ে এক গভীর আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগোচ্ছেন। কেউ মোবাইল ফোনে মুহূর্তটি ধারণ করছেন, কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন। এক তরুণীকে বলতে শোনা যায় আমাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। এই বাক্যটি যেন হাজারো অপ্রকাশিত আশঙ্কার প্রতীক।
কারবালার আখ্যান মুসলিম চেতনায় কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি ত্যাগ, অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং আধ্যাত্মিক দৃঢ়তার প্রতীক। তেহরানের শোকযাত্রায় সেই প্রতীকের ছায়া স্পষ্ট, যদিও বাস্তবতার পরিসর ভিন্ন। এখানে শহিদি যুদ্ধক্ষেত্র নেই কিন্তু আছে সমষ্টিগত স্মৃতি ও প্রতীকের আশ্রয় নেওয়া এক জনসমুদ্র।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই শোকের পর ইরানের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হবে। তবে সেই বিশ্লেষণ আপাতত পেছনে পড়ে গেছে; সামনে আছে কেবল শোকের দিনগুলো। এএফপির ভাষ্য অনুযায়ী, জনতার আবেগ ছিল তীব্র কিন্তু সংগঠিত। অনেকে জাতীয় পতাকা ও ধর্মীয় পতাকা হাতে নিয়ে নীরব মিছিল করেছেন। স্লোগানের মধ্যেও ছিল শোকের সুর।
ইউরো নিউজ জানিয়েছে, রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, তবে তারা মূলত শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত ছিলেন। সব মিলিয়ে তেহরান এক অদ্ভুত সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কারবালার মিথ এখানে কেবল তুলনার উপমা, এক গভীর বেদনার ভাষা। সর্বোচ্চ নেতা ঘিরে যে মাতম, তা রাজনৈতিক সীমা অতিক্রম করে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক অনুভূতির সঙ্গে মিশে গেছে।