অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে চ্যালেঞ্জ বাড়ল নতুন সরকারের

এসএম আলমগীর

জাতীয়

একরকম ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেছে বিএনপি সরকার। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এ ভঙ্গুর অর্থনীতি মেরামত করতে যখনই ঘর গোছানো

2026-03-02T01:39:03+00:00
2026-03-02T01:39:03+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে চ্যালেঞ্জ বাড়ল নতুন সরকারের
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ১:৩৯ এএম   (ভিজিট : ১৫৭)
প্রতীকী ছবি
একরকম ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেছে বিএনপি সরকার। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এ ভঙ্গুর অর্থনীতি মেরামত করতে যখনই ঘর গোছানো শুরু করেছে নতুন সরকার, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দেখা দিল; বেঁধে গেল ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল ত্রিমুখী যুদ্ধ। এ যুদ্ধের কারণে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে চ্যালেঞ্জ আরও বেড়ে গেল। এমনটিই মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা এবং বিশ্লেষকরা।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অর্থনীতির বেশ কয়েকটি খাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের রফতানি বাণিজ্য। দেশে তৈরি পণ্য রফতানি যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, তেমনি বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্যের কাঁচামাল আমদানিও বাধাগ্রস্ত হবে। দ্বিতীয়ত যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাবে, ইতিমধ্যেই আভাস পাওয়া যাচ্ছে আজ সোমবারের মধ্যে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ২০ ডলার বেড়ে যেতে পারে। এভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে দেশের বাজারেও বাড়বে। ফলে একদিকে যেমন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে, তেমনি কৃষকের সেচ ব্যয়সহ আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাবে।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত রেমিট্যান্স। প্রবাসী আয়ের সিংহভাগই আসে এ দেশগুলো থেকে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েতসহ আশপাশের আরও কয়েকটি দেশে হামলা চালিয়েছে ইরান। ইতিমধ্যে একজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। ওই অঞ্চলে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি যেমন চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন, তেমনি তাদের জীবনও ঝুঁকিতে পড়েছে। তাই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে মাত্র কয়েক দিন হলো। এই সরকার এমনিতেই উত্তরাধিকারসূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। সরকার গঠন করার পরপরই ফ্যামিলি কার্ডের মতো জনবান্ধব বেশ কিছু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও মাঠে নেমে গেছে। সরকার ঘর গুছিয়ে যখনই ভঙ্গুর অর্থনীতি মেরামতে হাত দেবে, ঠিক সেসময় শুরু হলো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তা হলে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অনেক কঠিন হয়ে পড়বে, সরকারের পথচলা অনেক চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাবে। সুতরাং সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে। তা হলে হয়তো ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম হবে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। প্রথমত মধ্যপ্রাচ্যই হলো বাংলাদেশের প্রধান আমদানির উৎস। তাই এ যুদ্ধ চলতে থাকলে দেশের জন্য জ্বালানির দাম ও সরবরাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) ও রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত এশিয়া ও ইউরোপ এবং আংশিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানোর প্রধান নৌপথ সুয়েজ খাল ইরানের খুব কাছাকাছি। সেখানে এ যুদ্ধের প্রভাব পড়লে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি পণ্য পরিবহন ব্যাহত হবে। তৃতীয়ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার। সুতরাং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি সেখানে নতুন শ্রমিক নিয়োগে অনাগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে।

এ বিষয়ে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা কার্যকরভাবে কাজ না করায় বাংলাদেশ এখন মূলত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে তা তেলের দাম, এলপিজি পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির সরবরাহের ওপর অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যুদ্ধ চলতে থাকলে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ব।

তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বাংলাদেশের পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে হুথি হামলার কারণে লোহিত সাগর দিয়ে পণ্য পরিবহন কমিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। তিনি আরও বলেন, যদি রাশিয়া ও চীন এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তা হলে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আর বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যুদ্ধের কারণে ভোক্তাদের সক্ষমতা কমবে, ফলে তারা পোশাকের মতো পণ্যে কম ব্যয় করবেন। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে দেশের বাজারে উৎপাদন খরচ বাড়বে, কারণ বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের যদি বিকল্প নৌপথ বেছে নিতে হয়, তা হলে সামগ্রিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে বাংলাদেশি পোশাক ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন ইউক্রেন যুদ্ধ দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে, কিন্তু সেই যুদ্ধ এখন চার বছর ধরে চলমান। তাই যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হয়, তা হলে কুয়েত, ইরাক, ইরান, বাহরাইন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রফতানি বাজারগুলো মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য কত
বাংলাদেশ ব্যাংক ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ-ইরানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এক কোটি ডলারের সামান্য বেশি। তার মধ্যে বড় অংশ বাংলাদেশের পণ্য রফতানি। এর বিপরীতে ইরান থেকে আমদানি হয় সামান্য। মাঝেমধ্যেই সেই আমদানি আবার শূন্য হয়।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, বিদায়ি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১ কোটি ৯ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি মার্কিন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৮ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৮ ডলারের পাটের সুতা, ৯৫ হাজার ৩১০ ডলারের নিট পোশাক এবং ৯ হাজার ৩৫১ ডলারের ওভেন পোশাক রফতানি হয়েছে।
তার আগে গত ২০২০-২১ অর্থবছরেও ইরানে পণ্য রফতানি ছিল ১ কোটি ৫৯ লাখ ডলারের। পরের বছর সেই রফতানি কমে ১ কোটি ১৯ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রফতানি বেড়ে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। পরের বছর রফতানি কমে হয় ১ কোটি ৫৪ লাখ ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইরান থেকে বাংলাদেশে ৫ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়। তার আগের তিন বছর দেশটি থেকে কোনো আমদানি হয়নি। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশটি থেকে আমদানি হয়েছিল ৩ লাখ ডলারের পণ্য।
অবশ্য ইরান থেকে পণ্য আমদানি বছর দশেক আগে কিছুটা বেশি ছিল। গত ২০১০-১১ অর্থবছরে ৪৪৯ কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়। তার পরের বছর থেকে সেই আমদানি কমতে থাকে। ২০১১-১২ অর্থবছরে ৯৯ কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়।

জানতে চাইলে নিট পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের মিত্রদেশের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে ব্যাংকিং করা জটিল। এ ছাড়া ইরান থেকে আমাদের দেশে ক্রেতারাও সেভাবে আসেনি। সে কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি তৈরি পোশাক কম যায়। তবে দুবাই থেকে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক ইরানে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য কম হলেও বর্তমান যুদ্ধে পরোক্ষ ক্ষতি অনেক বেশি। আমরা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধকল এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এরই মধ্যে আবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। হরমুজ খাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাহাজে পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়বে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেসব জাহাজ যায়, সেগুলো হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে। এখন সেই জাহাজ ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক ঘুরে যেতে হবে।


  বিষয়:   অর্থনীতি  পুনরুদ্ধার  সরকার 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: