গ্যাস্ট্রিক আলসার অবহেলায় ক্যানসারের ঝুঁকি

ডা. শাওন সিংহ

বিবিধ

আমাদের দেশে পেটের সমস্যা যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। বুকজ্বালা, বদহজম, পেট ফাঁপা এসবকে অনেকেই সাধারণ ‘গ্যাস্ট্রিক’ ভেবে হালকাভাবে নেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের

2026-03-02T04:27:55+00:00
2026-03-02T04:27:55+00:00
 
  রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬
বিবিধ
গ্যাস্ট্রিক আলসার অবহেলায় ক্যানসারের ঝুঁকি
ডা. শাওন সিংহ
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ৪:২৭ এএম 
প্রতীকী ছবি
আমাদের দেশে পেটের সমস্যা যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। বুকজ্বালা, বদহজম, পেট ফাঁপা  এসবকে অনেকেই সাধারণ ‘গ্যাস্ট্রিক’ ভেবে হালকাভাবে নেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের এসব অবহেলা যে গ্যাস্ট্রিক আলসারের মতো জটিল রোগে রূপ নিতে পারে, তা অনেকেরই জানা নেই। গ্যাস্ট্রিক আলসার আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে খুব অবহেলিত একটি রোগ। কারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাকে আমরা খুব সহজভাবে নেই। কিন্তু সঠিক সময়ে গ্যাস্ট্রিকের চিকিৎসা না নিলে সেটি যে কতটা মরণঘাতী ক্যানসারে রূপ নিতে পারে সেটি অনেকেরই অজানা। আর এই রমজান মাসে আমরা প্রচুর গ্যাস্ট্রাইটিসের রোগী পেয়ে থাকি, যাদের দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে গ্যাস্ট্রাইটিস ও আলসারের উপসর্গ বেড়ে যায়। তাই রোজাদারদের জন্য এ সময় সতর্ক থাকা জরুরি।

গ্যাস্ট্রিক আলসার কী এবং কোথায় হয়? 
গ্যাস্ট্রিক আলসার মূলত পাকস্থলীতে সৃষ্টি হওয়া একটি ক্ষত। পাকস্থলীর ভেতরের মিউকোসাল স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ক্ষত যখন গভীর হয়ে মাসকুলারিস মিউকোসা স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন তাকে গ্যাস্ট্রিক আলসার বলা হয়। একই ধরনের ক্ষত ক্ষুদ্রান্ত্রেও অনেক সময় হয়ে থাকে, সেটিও আলসারে রূপ নেয় যাকে ডিউডেনাল আলসার বলে। যদিও দুই ধরনের আলসারই প্রায় দেখা যায়। তবে আমাদের দেশে গ্যাস্ট্রিক আলসার তুলনামূলক বেশি।

কেন হয় আলসার?
আলসারের পেছনে বেশ কিছু পরিচিত কারণ রয়েছে।
প্রথমত অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, তৈলাক্ত খাবার, ঝালমসলাদার পদ, ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় নিয়মিত খেলে পাকস্থলীর আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।

দ্বিতীয়ত ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ও স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবন। অনেকেই মাথাব্যথা বা জয়েন্টের ব্যথায় নিয়মিত পেইনকিলার খান, যা পাকস্থলীতে ক্ষত তৈরি করতে পারে। তৃতীয়ত ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান। এগুলো পাকস্থলীর রক্তসঞ্চালন ও সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। চতুর্থত এইচ পাইলোরি নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। 

এটি পাকস্থলীর ভেতরের স্তরে সংক্রমণ ঘটিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আলসার তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া অনেকেই বছরের পর বছর গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ নিজের মতো করে খেয়ে যান। এতে সাময়িক আরাম মিললেও মূল রোগ ধরা পড়ে না, বরং জটিলতা বাড়তে পারে।
কী লক্ষণ দেখা দেয়?

গ্যাস্ট্রিক আলসারের উপসর্গ অনেক সময় সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের মতোই মনে হয়। বুকের মাঝখানে জ্বালাপোড়া অনুভূতি, পেট ফেঁপে থাকা, বদহজম, বমিভাবÑ এসবই সাধারণ লক্ষণ। পেটের উপরিভাগে হালকা থেকে মাঝারি ব্যথা হতে পারে, যা খাবারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কারও ক্ষেত্রে খালি পেটে ব্যথা বাড়ে, কারও ক্ষেত্রে খাবারের পর বাড়ে। কয়েক দিন ভালো থেকে আবার কয়েক সপ্তাহ পর একই সমস্যা ফিরে আসা এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন আলসার থাকলে রক্তশূন্যতাও দেখা দিতে পারে।

দেরিতে ধরা পড়ে কেন?
মূল কারণ সচেতনতার অভাব। অধিকাংশ রোগী পেট ব্যথা, বদহজমকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা মনে করে ডাক্তার না দেখিয়ে ফার্মেসি থেকে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ কিনে খেয়ে থাকেন। এতে সাময়িকভাবে আরাম মিললে তারা আর চিকিৎসকের কাছে যান না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষত গভীর হতে থাকে। এভাবে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে আলসার জটিল রূপ নিতে পারে। আলসার দিন দিন জটিল পর্যায়ে পৌঁছে গ্যাস্ট্রিক ক্যানসারে রূপ নেয়। তাই দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ফিরে আসা উপসর্গকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

রোজায় বাড়তি সতর্কতা কেন?
রমজানে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও ঝাল খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি না পান করা এসব কারণে গ্যাস্ট্রাইটিস ও আলসারের উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে। যারা আগে থেকেই বুকজ্বালা বা পেটব্যথায় ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা তীব্র হতে পারে।
রোজাদারদের উচিত সেহরি ও ইফতারে পরিমিত ও সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ করা, অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা এবং কোনো উপসর্গ বাড়লে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?
প্রতিরোধের প্রথম ধাপ খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন। ঘন ঘন ফাস্টফুড, কোমল পানীয় ও ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি। দ্বিতীয়ত ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্যথার ওষুধ বা স্টেরয়েড সেবন না করা। তৃতীয়ত গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ মাসের পর মাস নিজে নিজে খাওয়া বন্ধ করা।
যদি ঘন ঘন বুকজ্বালা, পেটব্যথা বা বদহজমের সমস্যা থাকে, তা হলে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজন হলে এন্ডোস্কোপি করে আলসার হয়েছে কি না চেক করে নেওয়া।। এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে সরাসরি পাকস্থলী দেখে আলসার নির্ণয় করা যায়, যা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

যারা এন্ডোস্কোপি করতে চান না, তাদের জন্য এইচ. পাইলোরির সংক্রমণ নির্ণয়ে আইসিটি , ইউরিয়া ব্রেথ টেস্ট, ফিকাল অ্যান্টিজেন টেস্ট করেও রোগ নির্ণয় করা যায়। তবে আলসার নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে এন্ডোস্কোপিই সবচেয়ে কার্যকর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যত দ্রুত গ্যাস্ট্রিক আলসার ধরা পড়বে তত সহজে ও কম খরচে চিকিৎসা সম্ভব হবে। অবহেলা নয়, সচেতনতাই পারে এই নীরব কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ রোগ থেকে আমাদের সুরক্ষিত করতে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে।

লেখক : পিজিটি, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ


  বিষয়:   গ্যাস্ট্রিক আলসার  ক্যানসার  ঝুঁকি 


Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: