তিন মাসে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ১১২টি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় ১৬২ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, হামলা, হুমকি ও আইনি হয়রানির মুখে পড়েছেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘মিডিয়া ইনিশিয়েটিভ ফর ডেভেলপমেন্ট’ (মিড)-এর পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে আগস্ট মাসে।
মিডের পরিসংখ্যান বলছে, জুলাই মাসে সারা দেশে ৩৯টি ঘটনায় ৫০ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হন। এরপর আগস্ট মাসে সহিংসতার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে ১২.৮ শতাংশ বেড়ে ৪৪টি ঘটনায় পৌঁছায় এবং এতে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ জনে। তবে সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে যায়; ওই মাসে ২৯টি ঘটনায় ৪৫ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হন। আগস্ট মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মোট ঘটনার সংখ্যা ৩৪.১ শতাংশ এবং আক্রান্ত সাংবাদিকের সংখ্যা ৩২.৮ শতাংশ কমেছে।
গত তিন মাসের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যায়, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করতে মূলত শারীরিক হামলা ও প্রাণনাশের হুমকিকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রায় ৪৮.৭ শতাংশ ছিল প্রাণনাশের হুমকি এবং ২৮.২ শতাংশ ছিল শারীরিক হামলা। তবে আগস্ট মাসে শারীরিক হামলার ঘটনা ব্যাপক হারে বেড়ে মোট ঘটনার ৬৩.৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। অন্যদিকে, সেপ্টেম্বর মাসে শারীরিক হামলা ও হুমকি—উভয় ধরনের নির্যাতনের হারই সমানভাবে ৩৭.৯ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি, এই তিন মাসের মধ্যে সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ, বাসা ও কার্যালয়ে ভাঙচুর, মামলা দায়ের এবং অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধও সংঘটিত হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের ধরন অনুযায়ী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মফস্বল ও মাঠপর্যায়ে কর্মরত প্রিন্ট মিডিয়ার কর্মীরা। এই তিন মাসে মোট ১৬২ জন আক্রান্ত সাংবাদিকদের অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৮৯ জনই ছিলেন দৈনিক পত্রিকার প্রতিনিধি। এ ছাড়া ৫৩ জন টেলিভিশন চ্যানেল এবং ২০ জন অনলাইন পোর্টালের সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের হামলার শিকার হয়েছেন। ভৌগোলিক দিক থেকে দেশের ৩০টিরও বেশি জেলায় এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, বরিশাল এবং সিলেট অঞ্চলে এসব ঘটনার হার ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি।
প্রতিবেদনে আরও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকির বিচার বা কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের হার অত্যন্ত হতাশাজনক। জুলাই মাসে ৪৬.২ শতাংশ এবং আগস্ট মাসে ৫৪.৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও, আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা করার হার ছিল খুবই নগণ্য। এমনকি সেপ্টেম্বর মাসে অন্তত ৪১.৪ শতাংশ ঘটনার ক্ষেত্রেই কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে মিডের নির্বাহী পরিচালক রাশেদুল হাসান জানান, সাংবাদিকদের ওপর যেকোনো নির্যাতন মানেই মুক্ত গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় সরকারকে সর্বান্তকরণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সময়ের আলো/আতা