জ্বালানি নিয়ে উৎকণ্ঠায় মানুষ

রফিক রাফি

জাতীয়

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও পাল্টাহামলা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক

2026-03-08T01:13:47+00:00
2026-03-08T01:13:47+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
হুরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা
জ্বালানি নিয়ে উৎকণ্ঠায় মানুষ
রফিক রাফি
প্রকাশ: রোববার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ১:১৩ এএম   (ভিজিট : ১৫৪)
ফাইল ছবি
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও পাল্টাহামলা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ হুরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ও দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কাতারসহ কয়েকটি দেশ থেকে সময়মতো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং হুরমুজ প্রণালিতে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য পূর্বনির্ধারিত কয়েকটি জাহাজের আগমন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকার সংশ্লিষ্টরা। 

পরিস্থিতি সামাল দিতে এরই মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি দামে দুই কার্গো এলএনজি কিনেছে সরকার। পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করতে নাগরিকদের সতর্ক করা হয়েছে। এদিকে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর এলিট শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিওমার্স হায়দারি শুক্রবার ইরানের আধাসরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজকে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জলপথ হুরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইউরোপীয় দেশগুলো এবং তাদের মিত্র-সমর্থকদের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মিত্র নয়, সেসব দেশের জাহাজ হুরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলে কোনো বাধা নেই। জ্বালানি বিভাগ মনে করছে, এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছুটা ইতিবাচক খবর হতে পারে।

সরকার সংশ্লিষ্ট এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, আইআরজিসির এ সিদ্ধান্তের ফলে সীমিত পরিসরে হলেও জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে। আর তা সম্ভব হলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা অনেকটাই কেটে যাবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু শনিবার বলেছেন, দেশে তেলের কোনো ঘাটতি নেই। তবে আতঙ্কের কারণে অনেক মানুষ অতিরিক্ত তেল মজুদ করার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, আগামী ৯ মার্চ আরও দুটি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তাই তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
মন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি কবে শেষ হবে তা নিশ্চিত নয়। এ কারণে সরকার কিছুটা সরবরাহ কমিয়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান যুদ্ধ এবং হুরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল, পেট্রোল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়েছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহে বড় সমস্যা দেখা যায়নি, তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে মূল্যবৃদ্ধির চাপ। বাংলাদেশের মোট জ্বালানির বড় অংশই আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

দেশে বিদ্যুৎ খাতে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এভাবে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আপৎকালীন জ্বালানি মজুদের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় যেকোনো বাহ্যিক ধাক্কা সরাসরি বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি করতে পারে এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকসের (দায়রা) গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, দেশের বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশই গ্যাসভিত্তিক। রফতানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে টেক্সটাইল খাত গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেড় হাজারের বেশি টেক্সটাইল কারখানা উৎপাদনের জন্য গ্যাস ব্যবহার করে। এসব কারখানায় প্রসেস-হিট ও ক্যাপটিভ জেনারেশনের (নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন) জন্য গ্যাস অপরিহার্য।

তিনি আরও বলেন, শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধানের সেচ প্রায় সম্পূর্ণভাবে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। পণ্য পরিবহনে ডিজেলচালিত ট্রাক এবং যাত্রী পরিবহনে গ্যাসচালিত বাস ব্যবহৃত হয়। নৌপরিবহন সম্পূর্ণভাবে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। শহর ও গ্রামে রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানিতে সংকট দেখা দিলে অন্যান্য খাতেও এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, হুরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ার আগেই গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ অতিক্রম করে আসা ১৫টি পণ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এসব জাহাজে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং শিল্পের কাঁচামাল রয়েছে, যা দেশের শিল্প ও জ্বালানি খাতকে সচল রাখতে সহায়তা করবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৫টি জাহাজের মধ্যে ১২টি ইতিমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। বাকি তিনটি জাহাজ এই সপ্তাহের মধ্যেই পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি জাহাজে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), দুটি জাহাজে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং বাকি নয়টি জাহাজে সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল ক্লিংকারসহ অন্যান্য উপকরণ রয়েছে।

মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই সরকার আগেভাগেই সাশ্রয়ী নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে। প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হতো, তাও কিছুটা কমানো হয়েছে। জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং চালু করা হয়েছে এবং পাচার ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে দুই কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছে। এ ছাড়া চলতি সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দরে আরও কয়েকটি জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। একই সঙ্গে হুরমুজ প্রণালিতেও ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা কমে আসবে।

এদিকে পেট্রোল পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, আতঙ্কের কারণে গত দুই দিনে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তেল বিক্রি হয়েছে। ফলে কিছু পাম্পে মজুদ দ্রুত শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নিয়েছেন। এর ফলে কয়েকটি পাম্পে তেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেছেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তির আওতায় যেসব কার্গো ১৫ তারিখের মধ্যে আসার কথা, সেগুলোর বেশিরভাগই ইতিমধ্যে হুরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ১৫ থেকে ১৮ তারিখের মধ্যে ১-২টি কার্গো নিয়ে সাময়িক সমস্যা তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিকল্প উপায়ে এলএনজি আমদানির জন্য সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছু উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা থেকে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে। তবে বাস্তবে দেশের জ্বালানি তেলের মজুদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

মন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সংকট এড়াতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পরিকল্পনাও প্রস্তুত করে রেখেছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে সেই উৎসগুলো ব্যবহার করা হবে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আগামী ৯ মার্চ দেশে আরও দুটি জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা নেই। তবে গুজব বা আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

মন্ত্রী বলেন, প্যানিক হয়ে কেউ যেন প্রয়োজনের বেশি তেল সংগ্রহ না করেন। এতে অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হয়। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে।



  বিষয়:   হুরমুজ প্রণালি  জ্বালানি  উৎকণ্ঠা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: