এতোদিন একসঙ্গে ছিলাম, এখন কেনো আমরা সরিয়ে দেবে : প্রধানমন্ত্রী

সাব্বির আহমেদ

জাতীয়

বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে শরিক দলের নেতারা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আন্দোলনের সময় প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেও ত্রয়োদশ

2026-07-20T21:43:20+00:00
2026-07-21T10:12:54+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ক্ষোভ ঝাড়লেন শরিকরা
এতোদিন একসঙ্গে ছিলাম, এখন কেনো আমরা সরিয়ে দেবে : প্রধানমন্ত্রী
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ৯:৪৩ পিএম  আপডেট: ২১.০৭.২০২৬ ১০:১২ এএম
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংগৃহীত ছবি
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে শরিক দলের নেতারা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আন্দোলনের সময় প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে বিএনপি তার মিত্রদের মূল্যায়ন করছে না বলে অভিযোগ করেন নেতারা। সেইসঙ্গে বিএনপি ‘একলা চলো নীতি’ অবলম্বন করছে কিনা সেই প্রশ্নও জোরালো কণ্ঠে সামনে এনেছেন ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে থাকা মিত্ররা৷ জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবাইকে সঙ্গে নিয়ে পথচলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন৷  

সোমবার (২০ জুলাই) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় শরিক নেতাদের সন্মানে নৈশ ভোজের আগে মতবিনিময়ে এসব কথা উঠে আসে। দীর্ঘ সময় রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিএনপির সঙ্গে আন্দোলন করেছে যুগপৎ শরিকরা। সরকার গঠনের পর সোমবার প্রথমবারের মতো মিত্রদের সঙ্গে বৈঠক ও নৈশভোজ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় যুমনার অনুষ্ঠানস্থলে এসে প্রধানমন্ত্রী শরিক নেতাদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে শরিক দলের নেতাদের সাথে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজ-খরর নেন। কুশল বিনিয়ম পর্বের পর  নেতাদের নিয়ে রাতে খাবার টেবিলে বসেন প্রধানমন্ত্রী। 

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, শতাধিক শরিক নেতা উপিস্থিত থাকলেও মাত্র হাতেগোনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছেন। 

বৈঠকে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, প্রথমত আপনারা আমাদেরকে যেভাবে দাওয়াত দিয়েছেন, তা মর্যাদার হয়নি। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের উচিত ছিল যোগাযোগ করে দাওয়াত দেওয়া। সরকার গঠনের ৫ মাস পর বসলেন, কিন্তু শরিকদের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সরকার একলা চলো নীতি নিয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে। এই ৫ মাসে আপনারা বেশ কিছু নিয়োগ দিয়েছেন। বিশেষ করে জেলা পরিষদগুলোর প্রশাসক নিয়োগে আপনারা যুগপৎ শরিকদের সঙ্গে কোনো পর্যায়ে আলাপ করেননি। এমনকি সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী চূড়ান্তের বিষয়েও পরামর্শ করার প্রয়োজন মনে করেননি। অথচ জামায়াতে ইসলামী অল্প কিছু আসনেও তাদের শরিকদের সঙ্গে সমন্বয় করেছে। এতে বন্ধুত্বের কোনো নমুনা দেখা যাচ্ছে না। সবাইকে নিয়ে চলতে গেলে এটার ধরন কী, তা স্পষ্ট করা উচিত।

তিনি বলেন, আমরা কোনো দেনদরবার করতে আসিনি। আপনাদের বিলম্বে হলেও উপলব্ধি হয়েছে যে শরিকদের সঙ্গে বসা দরকার, এই আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ। সরকার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটা জনগণের বাহবা পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, অর্থাৎ জুলাই সনদ ও সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি পিছিয়ে পড়ছে। এগুলো পর্যালোচনা করা দরকার। দেশব্যাপী সরকারকে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু বিএনপি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

কবি শামসুর রহমানের একটি কবিতার পঙক্তি টেনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমি এমন সরকার চাই, যাকে সবাই সমালোচনা করতে পারবে। এত রক্ত দিয়েছে মানুষ ভালো একটি দেশ পাওয়ার জন্য। ভালো যেটা করছেন, সেটার জন্য বাহবা পাবেন। খারাপ যা করছেন, তার দায় আপনাদের। আমি আপনাদের অংশীদার কিংবা ক্ষমতার ভাগাভাগি চাই না।

পরে সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আমি সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছি। তারা সফল হোক, সেটা আমরা চাই। প্রধানমন্ত্রী আমার বক্তব্যের চমৎকার জবাবও দিয়েছেন। তিনি জনগণের ভাষায় দেশ পরিচালনা করতে চান। সেই সঙ্গে সংকটের বিষয়টিও মনে করিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী কয়েক মাস পরপর শরিকদের সঙ্গে বসার কথা জানিয়েছেন।

গণ অধিকার পরিষদের সিনিয়র নেতা আবু হানিফ সময়ের আলোকে বলেন, ৫ মাস হয়ে গেল বিএনপি সরকার কিংবা দলের কেউ শরিকদের সঙ্গে বৈঠক করেনি কিংবা তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। সরকারের বিভিন্ন স্তরে জোটের নেতাদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। কাউকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সবার গুরুত্ব প্রায় সমান ছিল। শরিক নেতারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অতীত ও বর্তমান বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনেছেন এবং শরিকদের মূল্যায়নের বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন।

ক্ষমতায় আসার পর এর আগে শরিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বসেনি বিএনপি। যদিও নির্বাচনের আগে যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীদের নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠক করেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলটির শীর্ষ নেতারা।

তিন বছর আগে বিএনপির নেতৃত্বে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে প্রায় অর্ধশত দল যুক্ত ছিল। সংসদ নির্বাচনে শরিকদের বিভিন্নভাবে ডজনখানেক আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। এর মধ্যে সরকারের মন্ত্রিসভায় রয়েছে গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) প্রতিনিধি।

জানা গেছে, প্রায় দেড়শ শরিক ও সমমনা নেতাকে চিঠি দেয় বিএনপি। তবে নৈশভোজে অংশ নেয়নি বিএনপির দুই গুরুত্বপূর্ণ মিত্র জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)।

শরিক নেতাদের যা বললেন প্রধানমন্ত্রী 

ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের যুগপৎ আন্দোলনে শরিক দলগুলোর মধ্যে ‘মতভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু কোনো বিভেদ নেই’ বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সবার বক্তব্য শুনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এতদিন একসঙ্গে ছিলাম। এখন কেন আমরা সরে যাব? আমরা একসঙ্গেই থাকব। আমাদের মধ্যে ডিফারেন্স অব ওপিনিয়ন হতে পারে, কিন্তু ভুল–বোঝাবুঝির কোনো কারণ আমাদের মধ্যে আছে বলে আমি মনে করি না। ৩১ দফার মাধ্যমে আমরা একটি জায়গায় একত্রিত হয়েছিলাম। ইয়েস, আমাদের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য এক। চলতে গেলে এদিক-ওদিক হতেই পারে। এত সমস্যা, ২ কোটি মানুষের দেশ। আপনি দেখেন, এই ঢাকা শহর এখন পরিষ্কার করতেই সমস্যা। যেদিকে তাকাবেন, ময়লা। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকদিন বসার সুযোগ হয়নি, সেজন্য আজকে এই আয়োজনটি করেছি। আমি জানি, উনাদের (শরিকদের) মনে এই কষ্টের কথাগুলো আছে। এটা স্বাভাবিক। বয়সে উনারা আমার থেকে বড়। আমি ছোট ভাই হিসেবে বড় ভাইদের সব বিষয়ই মেনে নিই। আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি শুধু এতটুকুই অনুরোধ করব, আমাদের সবাইকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ কিছু সময় আগে মান্না (মাহমুদুর রহমান মান্না) ভাই তার বক্তব্যে বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আসুন, আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করি জনগণের প্রত্যাশাটাকে আগে আমরা অ্যাড্রেস করি।

অতীতের আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটু পিছনে নিয়ে যাই। আমরা যখন আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম, আজকে অনেকেই দাবি করে—কারও নাম আমি উল্লেখ করতে চাই না—যাদের ক্ষেত্রে ‘গুপ্ত’ একটি শব্দ ব্যবহার করলেই সাধারণ মানুষও তাদের চিনে। ওই সময়ে আমরা তাদের অনেক খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। আমি দূরে থেকেও পাইনি। আপনারা কি কেউ তাদের রাজপথে পেয়েছিলেন? তাদের কিন্তু রাজপথে আমরা দেখিনি। 

ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৬/১৭ বছরের রেখে যাওয়া বিধ্বস্ত অর্থনীতি, বিধ্বস্ত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি এসব সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগের কথাও বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে শরিক নেতাদের পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সহসভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

পরে প্রধানমন্ত্রী বুফে থেকে খাবার নিয়ে শরিক নেতাদের সঙ্গে একটি টেবিলে নৈশভোজে অংশ নেন। ওই টেবিলে ছিলেন নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর)-এর মোস্তফা জামাল হায়দার, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু।

জোটশরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া  হবে

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়াসহ সব বিষয়ে জোটসঙ্গীদের সাথে পারস্পরিক আলোচনা করে ঠিক  করা হবে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জোটসঙ্গীদের আলোচনা ও রাতের ভোজের ফাঁকে এক প্রশ্নের জবাবে গণমাধ্যমকে এ কথা জানান তিনি।  

মির্জা ফখরুল বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ে আইন হয়েছে, সে আইনে কিন্তু দলীয়ভাবে নির্বাচন করার কোন সুযোগ নেই। সুতরাং আমার মনে হয় সে বিষয়টা আমরা আলোচনা এখন না করতেও পারি। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা পরস্পর আলোচনা করব।

তিনি বলেন,  প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ৩১ দফা কর্মসূচি, যেটা আমরা একসাথে দিয়েছিলাম, সেই কর্মসূচি সর্বশক্তি দিয়ে বাস্তবায়িত হবে এবং  এটাও বলেছেন, আবারো জোর দিয়েই বলেছেন যে, জুলাই সনদ— যেটা আমরা সবাই স্বাক্ষর করেছি, সেই জুলাই সনদ, আমি আবার রিপিট করছি যে স্বাক্ষর করেছি, সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে।

সময়ের আলো/ইউএমএইচ 



  বিষয়:   প্রধানমন্ত্রী  তারেক রহমান  বিএনপি  শরিক দল  ক্ষোভ 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: