আকাশে বিমান উড়ার বিকট শব্দ শুনলেই আতঙ্কে এখনো আঁতকে ওঠেন মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা। দেখতে দেখতে কেটে গেছে একটি পুরো বছর, কিন্তু কালবৈশাখীর মতো এসে নিমেষেই সবকিছু ওলটপালট করে দেওয়া সেই অভিশপ্ত বিমান দুর্ঘটনার স্মৃতি এতটুকুও ফিকে হয়নি। সময়ের স্রোতে ৩৬৫টি দিন পার হয়ে গেলেও, ট্রাজেডির সেই দুঃসহ যন্ত্রণা ও ট্রমা আজও তাড়া করে ফিরছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের।
গত বছরের এই দিনে (২১ জুলাই) বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলের ৭ নম্বর ভবনে এসে আছড়ে পড়ে। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জন প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে ২৮ জনই ছিলেন অবোধ শিশু-শিক্ষার্থী।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় বিমানের বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও নিহত হন এবং আহত হন আরও বহু মানুষ। পরবর্তীতে গঠিত ৯ সদস্যের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উড্ডয়নজনিত ত্রুটিকেই এই দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ভয়াবহ সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারছেন না প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাইমুল হাসান আদিত সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, দুর্ঘটনার মুহূর্তে তিনি ওই ভবনের মাত্র ১০০ মিটার দূরে ছিলেন। চোখের সামনে বিকট শব্দে ভবনটি বিধ্বস্ত হতে এবং সহপাঠীদের অঙ্গার হয়ে যেতে দেখেছেন তিনি। ওই ঘটনার পর দীর্ঘদিন রাতে ঘুমের ঘোরে আঁতকে উঠতেন আদিত। সন্তানের মানসিক অবস্থা দেখে অভিভাবকরা তাকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে চাইলেও সহপাঠীদের স্মৃতির টানে তিনি এই স্কুলেই থেকে গেছেন।
দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো পিতামাতাদের জীবনে প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটি দীর্ঘ যুগের সমান। সকালে যখন আশপাশের শিশুরা কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে রওয়ানা হয়, তখন সন্তানহারা মা-বাবারা ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে অশ্রু ফেলেন। স্বজনদের মতে, সরকার ঘোষিত ২০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতিপূরণ তাদের সন্তানের অভাব কোনোদিনই পূরণ করতে পারবে না। তাই অনেক পরিবারই সরকারের দেওয়া সেই অর্থ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, ঘটনার পর স্বাভাবিক পাঠদান শুরু হলেও শিক্ষার্থীদের মনের ভেতরের সেই আগের মতো চঞ্চলতা আর ফেরেনি। আকাশে কোনো উড়োজাহাজ বা হেলিকপ্টারের শব্দ শুনলেই থমকে যায় পুরো শ্রেণিকক্ষ। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের জন্য একটানা তিন মাস মানসিক কাউন্সেলিং করানো হয়েছে এবং তা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ জিয়াউল আলম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ৭ নম্বর ভবনটি বর্তমানে টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। পুরো ভবনটি ভেঙে ফেলে সেখানে নিহতদের স্মরণে একটি সবুজ উদ্যান ও খেলার মাঠ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভয়াবহ এই ট্রাজেডির এক বছর পূর্তিতে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) প্রতিষ্ঠানটিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সকালে নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় বিশেষ দোয়া, আবেগঘন স্মৃতিচারণ ও মোমবাতি প্রজ্বলনের মাধ্যমে স্মরণ করা হয় ঝরে যাওয়া তাজা প্রাণগুলোকে। পুরো মাইলস্টোন চত্বর আজ শোক, শ্রদ্ধা আর অশ্রুতে সিক্ত।
সময়ের আলো/জেডি