৮৮ দিনে গ্রেফতার ১ লাখ ৪২ হাজার

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

ডাকাত সর্দার তৈয়ব আলী। হত্যা, ডাকাতি ও দস্যুতাসহ তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৪৫টি। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে ফের

2026-09-05T00:48:51+00:00
2026-09-05T00:48:51+00:00
 
  শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২১ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
৮৮ দিনে গ্রেফতার ১ লাখ ৪২ হাজার
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৮ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
ডাকাত সর্দার তৈয়ব আলী। হত্যা, ডাকাতি ও দস্যুতাসহ তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৪৫টি। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সম্প্রতি দলের ৭ সদস্যসহ আবারও গ্রেফতার হয়েছেন তৈয়ব।

গত বৃহস্পতিবার নরসিংদীর শিবপুরে ঘুমিয়ে থাকা আব্দুল বাছেদ মিয়াকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠে তার বড় ছেলে শাকিল চৌধুরীর বিরুদ্ধে। পাঁচ মাস আগে সে জামিনে বের হয়। একাধিক মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

Advertisement
শুধু তৈয়ব আলী কিংবা শাকিলই নয়, বারবার অপরাধ করে জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে অনেক অপরাধী। রাজধানীতে দৈনিক প্রায় অর্ধ সহস্রাধিককে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার করছে পুলিশ। আর সারা দেশে এই সংখ্যা দেড় সহস্রাধিক। কিন্তু তারপরও নিয়ন্ত্রণে আসছে না দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।

অপরাধীদের সহজ জামিন প্রাপ্তিতে হতাশা পুলিশ সদস্যরাও। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু গ্রেফতারেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব না। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। কারাগারে সংশোধনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা, অপরাধ বিশ্লেষণ না করাসহ বিবিধ প্রতিবন্ধকতা ও গাফিলতির কারণে একজন সাধারণ অপরাধীও বারবার কারাভোগের পর একপর্যায়ে পেশাদার অপরাধী হয়ে উঠছে।

গত ২৯ এপ্রিল রাজধানীতে আয়োজিত এক প্রেস কনফারেন্সে র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক খালিদুল হক হাওলাদার বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে শুধু র‌্যাবের হাতেই প্রায় দেড় হাজার অপরাধী ধরা পড়েছে। তাদের অনেকে পরবর্তী সময়ে ‘আইনের মারপ্যাঁচে’ জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার অপরাধে জড়ায়। 

তার ভাষ্য, গ্রেফতার ব্যক্তিরা মোহাম্মদপুর অঞ্চলের মাদক, ছিনতাইকারী, কিশোরগ্যাংয়ের সদস্য। আইনি মারপ্যাঁচে তারা ফিরে এসে আবার অপরাধ করছে। এমনকি একই অপরাধীকে দুবার, তিনবার করে গ্রেফতার করা হয়েছে; কিন্তু তারা ছাড়া পেয়ে আবার অপরাধে জড়াচ্ছে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মে থেকে ২৭ জুলাই ’২৬ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৩৯ হাজার ২৬৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য মামলা ও অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৭২২ জন। বিশেষ অভিযান ও অন্যান্য মামলায় মোট গ্রেফতার হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৮৯ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে ১ হাজার ৬১৩ জনকে।

পুলিশ সদর দফতর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে সারা দেশে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৬টি, ডাকাতির ঘটনায় ৩১৭টি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১ হাজার ৬৭টি এবং চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫ হাজার ৬৩৬টি। তবে মামলার তুলনায় সংঘটিত অপরাধ আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাজধানীতেও পুলিশের নিয়মিত অভিযানে দৈনিক গড়ে প্রায় অর্ধ সহস্রজনকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসের প্রথম ৪ দিনে ১ হাজার ৮৪৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ সেপ্টেম্বর ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার করা হয় ৪৪২ জনকে, ২ সেপ্টেম্বর ৪৩৮, ৩ সেপ্টেম্বর ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার করা হয় ৫৩৪ জনকে।

প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক গ্রেফতারের পরও আশানুরূপ উন্নতি হচ্ছে না দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। কারাগারগুলোয় দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ।


সদ্য বিদায়ি কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন গত মাসে তার শেষ প্রেস বিফিংয়ে জানিয়েছিলেন, দেশের কারাগারগুলোতে বর্তমানে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি রয়েছে। বর্তমানে ৪৫ হাজার বন্দির ধারণক্ষমতার বিপরীতে কারাগারগুলোতে প্রায় ৯৮ হাজার বন্দি রয়েছে বলে জানান তিনি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভুত্থানের পর ভেঙে পড়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। সেই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে এখনও পুরোপুরি দাঁড়াতে পারেনি পুলিশ। সাম্প্রতিক সময় রাজধানীতে বেশ কিছু ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বৈশ্বিক তথ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘নাম্বিও’র ২০২৬ সালের ক্রাইম অ্যান্ড সেফটি ইনডেক্সে দক্ষিণ এশিয়ার তালিকাভুক্ত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অপরাধ সূচক সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই উন্নতি করছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন ভালো আছে। গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান লক্ষ করলেও দেখা যাবে পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে উন্নতির দিকেই যাচ্ছে। অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণসহ আইনশঙ্খলার উন্নয়নে এবং জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে সব ধরনের কার্যক্রমই জোরদার করা হয়েছে। তবে অপরাধ কখনোই পুরোপুরি নির্মুল করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশের সুযোগ নেই। এটি একটি চলমান কার্যক্রম।

তবে গ্রেফতারের সংখ্যা দিয়েই অপরাধ পরিস্থিতির উন্নতি নির্দেশ করে না বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, শুধু গ্রেফতার করেই সমাজে অপরাধ হ্রাস করা যায় না। গ্রেফতারের পর পুলিশ, বিচার বিভাগ ও কারা কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সমন্বিতভাবে এসব কাজ না করলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সময়ের আলোকে বলেন, শুধু গ্রেফতার করলেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না। গ্রেফতার-পরবর্তী কার্যক্রমগুলোও এ ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিচার বিভাগ ও কারাগার— এই তিনটি পক্ষই খুব গুরুত্বপূর্ণ। গ্রেফতারের পর আসামিরা কারাগারে কাদের সংস্পর্শে আসছে, কী করছে তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি অপরাধের ধরন ও কারণ বিশ্লেষণ করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব কিছু না করলে শুধু গ্রেফতার করেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। 

বারবার একই অপরাধে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের বিশেষ নজর প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণিত অপরাধ করেও অনেকে সহজে জামিন পেয়ে যায়। এভাবে ছোট অপরাধ করে জেল খেটে বের হয়ে বারবার জামিন লাভের পর তারাই একসময় পেশাদার অপরাধীতে পরিণত হয়। 

একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অপরাধীদের পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপরও জোর দেন তিনি। সমন্বয়হীনতার অভাবে বড় অপরাধীরাও অনেক ক্ষেত্রে সহজে জামিন লাভ করছে। তাই শুধু গ্রেফতার করলেই সমাজ থেকে অপরাধ নির্মুল করা যাবে না বলে মনে মন্তব্য করেন তিনি।
  বিষয়:   গ্রেফতার  লাখ  হাজার  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: