নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ দিনটি শুধু আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের নয়; বরং নারীর অবদানকে সম্মান জানানো, তাদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বাংলাদেশেও বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের কর্মব্যস্ত পরিবেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। দৈনিক সময়ের আলো পরিবার তাদের নারী সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানিয়ে আয়োজন করে অনাড়ম্বর শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান, যেখানে কর্মক্ষেত্রে নারীর অবদানকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি সমাজে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।
রোববার সময়ের আলোর কার্যালয়ে অনাড়ম্বর আয়োজনে নারী সহকর্মীদের হাতে ফুল ও চকলেট তুলে দিয়ে শুভেচ্ছা জানান সময়ের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বার্তা সম্পাদক হাসসান আতিক, সিটি এডিটর এস এম আলমগীর, চিফ রিপোর্টার এম মামুন হোসেন, সহকারী সম্পাদক বাঁধন অধিকারী, ডেপুটি বার্তা সম্পাদক মাহফুজ খান, হেড অব ডিজিটাল সাইদ রহমান, হেড অব অনলাইন জাকির উসমান এবং সার্কুলেশন ম্যানেজার মোকাদ্দেস হোসাইন। এ ছাড়া রিপোর্টিং, বার্তা বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের সহকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
শাহনেওয়াজ করিম বলেন, সংবাদপত্রের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীরা এখন সমানতালে কাজ করছেন। রিপোর্টিং, সম্পাদনা, অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া- প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের সক্রিয় উপস্থিতি দৃশ্যমান। দক্ষতা, দায়িত্ববোধ ও নিষ্ঠা দিয়ে তারা প্রতিদিন সংবাদপত্রকে এগিয়ে নিচ্ছেন এবং সংবাদ জগতের গতিশীলতাকে আরও সমৃদ্ধ করছেন।
হাসি-আনন্দ আর আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে পালিত হয় দিনটি। কর্মব্যস্ত সংবাদকক্ষেও এদিন ছিল ভিন্ন এক উচ্ছ্বাসের আবহ। নারী সহকর্মীদের হাতে ফুল তুলে দেওয়ার সেই ছোট্ট আয়োজন মুহূর্তেই প্রাণবন্ত করে তোলে পুরো কার্যালয়কে। পরে সবাই মিলে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং এ মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ক্যামেরাবন্দি করা হয়। এ আয়োজন স্মরণ করিয়ে দেয়- সংবাদপত্রের প্রতিটি পাতার পেছনেও রয়েছে নারীর শ্রম, মেধা ও নিবেদনের উজ্জ্বল উপস্থিতি।

এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার : সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনটি পালন করা হয় নানা আয়োজনে।
বাংলাদেশে জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নারীর অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও নিরাপত্তা ও সমঅধিকার এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ঘর-বাইরে, পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে এবং জনপরিসরে নারীরা প্রায়ই সহিংসতা, বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে যৌন হয়রানি, বাল্যবিয়ে, পারিবারিক নির্যাতন ও মব সহিংসতার মতো ঘটনা সমাজে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংগঠন ‘অদম্য নারী’ সম্মাননা প্রদান, আলোচনা সভা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করে।
এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ‘গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। রোববার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান এ সম্মাননা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়ার পুত্রবধূ জুবাইদা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।

আপসহীন সংগ্রামের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব এবং গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠায় অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য আরও কয়েকজন নারীকে ‘অদম্য নারী’ হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য নুরুন নাহার আক্তার, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে অবদানের জন্য মোছা. ববিতা খাতুন, সফল জননী ক্যাটাগরিতে নুরবানু কবীর, নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জীবনযুদ্ধে জয়ী নারী হিসেবে মোছা. শমলা বেগম এবং সমাজ উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য মোছা. আফরোজা ইয়াসমিন সম্মাননা লাভ করেন।
নারীর অধিকার, সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে দেশজুড়ে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় সব তফসিলি ব্যাংকেও যথাযথ মর্যাদায় নারী দিবস পালন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবও আলোচনা সভা, সম্মাননা প্রদান ও প্রদীপ প্রজ্বালন কর্মসূচির আয়োজন করে। একইভাবে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিও (ডিআরইউ) র্যালি ও নারী সদস্যদের সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে দিবসটি পালিত হয়।
র্যালির আগে ডিআরইউর নারীবিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস পান্নার সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ। তিনি বলেন, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও আশঙ্কাজনকভাবে কম। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। কর্মক্ষেত্রসহ সব ক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা যেন আর দেখতে না হয়- সেটাই হোক নারী দিবসের অঙ্গীকার।
সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবস পালন করে আসছে। এর পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসÑ যে ইতিহাস আজও নারীর সমতা ও মর্যাদার লড়াইকে প্রেরণা জোগায়।
সময়ের আলো/জেডআই