ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিএনপিকে যে কয়টি বিষয় মোকাবিলা করতে হয়েছে, তার মধ্যে চাঁদাবাজি সংক্রান্ত ন্যারেটিভ অন্যতম। অনলাইন-অফলাইনসহ প্রতিপক্ষ নির্বাচনের ক্যাম্পেইনে পর্যন্ত এ নেগেটিভ ন্যারিটিভ দলটির বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। এনসিপির এক নেতা বিএনপির শীর্ষ এক নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিকে রীতিমতো নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে পুরো নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়েছেন।
যদিও চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২ আসনে ভূমিধস জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সরকার গঠনের পর ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য শেখ রবিউল আলমকে সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নির্বাচনের ফলাফলের পর নানা কারণে চাঁদাবাজির ন্যারেটিভটি হালকা হয়ে আসে। কিন্তু সড়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিনের বক্তব্য আবারও বিরোধীদের হাতে যেন সেই অস্ত্র তুলে দিয়েছে।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী রবিউল আলম জানান, পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে তোলা টাকাকে চাঁদাবাজি বলে মনে করেন না তিনি।
তার এই অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেছেন, তারা এই টাকাটা সমঝোতার ভিত্তিতে তুলছে। জোর করে আদায় করছে না। এ জন্য চাঁদা বলা যাচ্ছে না।
পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়। মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটুকু ব্যবহার হয়, সেটা নিয়ে হয়তো বিতর্ক আছে। কিন্তু তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটা করে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তার এই বক্তব্য তাৎক্ষণিক সমালোচনা ঝড় উঠলেও মন্ত্রীর ব্যাখ্যায় যুক্তি আছে। এই উপমহাদেশে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ পরিবহন খাতে রাজনৈতিক একটা যুগসূত্র থাকে। হয়তো তিনি সরলতা থেকে এ রকম একটা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বলেছেন।
রবিউল আলম আরও বলেন, ‘শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ অনেক সংস্থা আছে। তারা এটা সমঝোতার ভিত্তিতে করে (টাকা তোলে)। সেখানে আবার প্রাধান্য পায় যখন যার প্রভাব থাকে, এমন মালিকদের বা দলের প্রভাব থাকে। যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের শ্রমিক সংগঠনের একটা আধিপত্য থাকে। কিন্তু এটা চাঁদা আকারে আমাদের কাছে দেখার সুযোগ হচ্ছে না। কারণ, তারা সমঝোতার ভিত্তিতে করছে।’
তবে সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা চাঁদাটা বাড়তি কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখবে বলে জানান সড়ক পরিবহনমন্ত্রী রবিউল আলম।
মন্ত্রীর এ বক্তব্যের পরেই ‘সমঝোতার চাঁদাবাজি’ হ্যাশট্যাগ আর স্ট্যাটাসে ফেসবুক ভরে যেতে দেখা যায়। জামায়াত, এনসিপিসহ বিরোধী দলের নেতাদের মন্ত্রীর এ বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করতে দেখা যায়। তাছাড়া মন্ত্রীর এ বক্তব্যে বড় ধরনের বেকায়দায় পড়ে বিএনপি। হাস্যরস আর মিম-ট্রলে সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যায়।
পরে অবশ্য নিজের কথার পেছনে যুক্তি তুলে ধরেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী রবিউল আলম। ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজি হচ্ছে সেটি, যা মানুষকে বাধ্য করে, জোর করে নেওয়া হয়। এটি তাদের (মালিক সমিতির) নির্ধারিত প্রক্রিয়া নয়। কোনো অবৈধ শক্তি সেটা (চাঁদাবাজি) করতে চায়, সেটা করার কোনো সুযোগ আর থাকবে না। এটা আমাদের অঙ্গীকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘চাঁদা ও চাঁদাবাজি দুটি জিনিস, এতে পার্থক্য আছে। চাঁদাটা কোনো কোনো সময়ে শ্রমিক এবং মালিকদের স্বার্থে তারা নির্ধারণ করে। আমি বোঝাচ্ছি, সমঝোতা করে তারা তাদের কল্যাণে কালেক্ট করে এবং তাদের মতো ব্যয় করে। তাদের যে প্রক্রিয়া আছে ,সেটা তারা অনুসরণ করে। এটাকে চাঁদাবাজি বলাটা কঠিন।’
সড়ক মন্ত্রী নিজের পক্ষে যতই সাফাই গান না কেন, তার এ বক্তব্যের কারণে খোদ বিএনপি যে ভালো রকমের বিব্রত হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এতকিছুর পরেও চলতি মাসের ৫ তারিখ তিনি বিতর্কিত বক্তব্যের পক্ষে একই দাবি করে আবারও বক্তব্য দেন।
ওইদিন সচিবালয়ে ঈদযাত্রার প্রস্তুতি নিয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘মালিক সমিতি তাদের কল্যাণে নির্ধারিত হারে ঐক্যবদ্ধভাবে অথবা সর্বসম্মতিতে তারা তাদের কল্যাণে একটা চাঁদা গ্রহণ করে বা নিয়মিত নেন। সেটা শ্রমিকদের কল্যাণে শ্রমিকরা এবং মালিকদের কল্যাণের মালিক সমিতি সেটা গ্রহণ করে। এটাকে আমি বলছি চাঁদাবাজি নয়।’
ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘একটা সমিতির রেজিস্ট্রেশন হয়েছে, সেই সমিতি তাদের কল্যাণে একটি অর্থ কালেক্ট করার যদি বৈধতা থাকে সেটাকে আপনি চাঁদাবাজি কেন বলবেন। যে সমিতির বা সংগঠনের বৈধতা নেই বা রেজিস্টেশন নেই তারা যদি স্বেচ্ছাচারীভাবে কোনো জায়গা থেকে মালিকদের কাছ থেকে বা শ্রমিকদের কাছ থেকে বা পরিবহন সেক্টর থেকে চাঁদা নেয়, এমন তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।’
দল ও সরকারে যারা দায়িত্বশীল জায়গায় আছেন, তাদের বুঝে-শুনে বক্তব্য দেওয়া প্রয়োজন। বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়, সমালোচনা তৈরি হয়—এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কৌশলী ও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
/এমএইচআর