প্রান্তিক কোনো ব্যবহারকারী বিকাশের মাধ্যমে ফোনে সর্বনিম্ন ২০ টাকা রিচার্জ করলে ১ টাকা কেটে রেখে দেওয়া হয় ১৯ টাকা। এখান থেকেই শুরু হয় কাটাকাটির প্রথম ধাপ। এরপর গ্রাহক বিশেষ কোনো প্যাকেজের আওতায় না থাকলে বেস বা ফ্লাট কলরেট মিনিটপ্রতি দুই টাকা করে কেটে নেয় মোবাইল ফোন অপারেটররা।
সেই সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারের সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি ৪০ পয়সা, ৩৬ পয়সা ভ্যাট ও ২ পয়সা সারচার্জসহ মোট আরও ৭৮ পয়সা। অর্থাৎ মিনিটপ্রতি ২.৭৮ পয়সা বা প্রায় তিন টাকা কলরেট কাটছে অপারেটররা। সেই হিসাবে গ্রাহক সর্বনিম্ন ২০ টাকা রিচার্জ করে কথা বলতে পারছেন মাত্র ৬.৮৩ সেকেন্ড। এর মধ্যে নেটওয়ার্ক সমস্যা ও কলড্রপ হলে মিনিটের এই হিসাবটা আরও কমে আসে।
মোটামুটি সব অপারেটরের ক্ষেত্রে চিত্র একই। ফলে মোবাইল ফোনের কলরেট নিয়ে গ্রাহকদের চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে। একদিকে মোবাইল অপারেটদের ভঙ্গুর নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ও অতিরিক্ত কলড্রপ, অন্যদিকে মাত্রাতিরিক্ত কলরেট সবমিলিয়ে গ্রাহকরা যেন দিশাহারা। তারা বলছেন, ফোনে টাকা ভরলেই হাওয়া হয়ে যায়।
তাদের অভিযোগ, এক মিনিট কথা বললে প্রায় তিন টাকা কলরেট কাটে। প্রায় সব অপারেটরে একই অবস্থা। এ ছাড়া মিনিট কিনে কারও সঙ্গে ১০ সেকেন্ড কথা বললেও পুরো মিনিট কেটে নেওয়া হয়। মিনিট কিংবা ব্যালেন্স কোনো মাধ্যমেই কথা বলে শান্তি নেই। ব্যালেন্সে টাকা ভরলেই হাওয়া।
গ্রামীণফোন ব্যবহারকারী আবির হোসেন বলেন, মোবাইলে এক মিনিট কথা বললে প্রায় তিন টাকা কাটে। গ্রামে বৃদ্ধ বাবা-মাকে ২০ টাকা রিচার্জ করে ফোন দিলে ছয়-সাত মিনিটের বেশি কথা বলা যায় না। টাকা ভরলেই হাওয়া। আমাদের মতো নিম্নআয়ের গ্রাহকের সঙ্গে এটা খুব বেশি জুলুম হয়ে যাচ্ছে।
রবি সিম ব্যবহারকারী রফিকুল ইসলাম সবুজ বলেন, এক মিনিট ফোন করলে ২.৮০ পয়সার মতো কেটে নেয়। সরকার ভ্যাট-ট্যাক্স কাটলেও কলরেট দুই টাকা অনেক বেশি। এই দুই টাকার মধ্যেই ভ্যাট-ট্যাক্স যুক্ত করলে সেবাটি মানুষের নাগালে থাকত।
এয়ারটেল ব্যবহারকারী শফিকুর রহমান বলেন, একটা সময় এক মিনিট কথা বললে ২৫ পয়সা কাটত। এখন কোথাও কথা বললে আড়াই টাকার ওপরে কাটে। তাই বাধ্য হয়ে মিনিট কিনে ব্যবহার শুরু করলাম। কিন্তু সেখানেও একই সমস্যা দেখছি। কারও সঙ্গে দশ সেকেন্ড বা বিশ সেকেন্ড কথা বললেও ব্যালেন্স থেকে পুরো এক মিনিট কেটে নেওয়া হয়। অপারেটর বাংলালিংকের বিরুদ্ধেও রয়েছে একই অভিযোগ।
২০১৮ সালের আগস্টের মাঝামাঝি মোবাইলে আগের অন-নেট বা একই অপারেটরের ক্ষেত্রে ২৫ পয়সা ও অফ-নেট বা ভিন্ন অপারেটরের ক্ষেত্রে ৬০ পয়সা ছিল। এই বৈষম্য দূর করে সব অপারেটরের জন্য অভিন্ন কলরেট কার্যকর করে নীতিমালা করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সব অপারেটরের জন্য কলরেটের ফ্লোর প্রাইজ ৪৫ পয়সা ও সেলিং প্রাইজ মিনিটপ্রতি দুই টাকা করা হয়। এই নির্দেশনার ফলে অন-নেট এবং অফ-নেট কলরেটের পার্থক্য দূর হয়। এরপর থেকে একই নিয়মে চলছে কলরেট ব্যবস্থা। তবে এর মধ্যে প্রতি অর্থবছরে কয়েক দফা ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে মোবাইল ফোন ও কলরেটের ওপর। এর চাপ পড়েছে গ্রাহকের ঘাড়ে।
যেমন সেলিং প্রাইজ দুই টাকা হলেও কলরেটপ্রতি কাটা হচ্ছে ২.৭৮ পয়সা। এর মধ্যে সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি (এসডি) ২০ শতাংশ (৪০ পয়সা), ভ্যাট ১৫ শতাংশ (৩৬ পয়সা) ও সারচার্জ কাটা হচ্ছে ১ শতাংশ (২ পয়সা)। সবমিলিয়ে বেস কলরেট দুই টাকা, এর সঙ্গে এসডি ৪০ পয়সা, ভ্যাট ৩৬ পয়সা ও সারচার্জ ২ পয়সাসহ মোট ২ টাকা ৭৮ পয়সা। এতে চাপে পড়েছেন গ্রাহকরা।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক জিপির এক কর্মকর্তা বলেন, গ্রাহক যদি কোনো প্যাকেজ ব্যবহার না করেন তা হলে অপারেটররা একটা ফ্লাট রেট কাটে। কেউ ২ টাকা, কেউ ১ টাকা ৯০ পয়সা। কোনো অপারেটর ১ টাকা ৯৯ পয়সা, অর্থাৎ যে যার বিজনেস পলিসি অনুযায়ী কাটে। তবে কেউ ২ টাকার বেশি কাটতে পারে না। এই সেলিং প্রাইজের সঙ্গে ভ্যাট-ট্যাক্স যুক্ত হয়ে ২.৭৮ পয়সা কাটা হয়। গ্রাহক যে তিন টাকা কাটার অভিযোগ করছেন সেটি মিথ্যা নয়। তবে অতিরিক্ত ৭৮ পয়সা অপারেটর পায় না, এটি নেয় সরকার। গ্রাহক ১০০ টাকা রিচার্জ করলে ৩৯ টাকা যায় সরকারের কাছে।
মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার সময়ের আলোকে বলেন, অপারেটর ভেদে কলের প্যাকেজের ট্যারিফ বা রেট ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত প্যাকেজে ঘোষিত কলরেটের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ভ্যাট-ট্যাক্স ও সম্পূরক শুল্ক যুক্ত হয়। এ কারণে গ্রাহকের ব্যালেন্স থেকে কাটা মোট অর্থ ঘোষিত বেস কলরেটের চেয়ে বেশি মনে হতে পারে।
তিনি বলেন, বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী অপারেটররা নির্দিষ্ট পালস রেট অনুসরণ করে কলচার্জ নির্ধারণ করে। এই পালস রেটের ভিত্তিতেই কলের সময় গণনা হয়। এর বাইরে অতিরিক্ত কোনো চার্জ যুক্ত করার সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে মোবাইল সেবার ওপর প্রায় ৪০ শতাংশ কর আরোপিত হয়, যা কলরেটের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এই করের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, যখন ভয়েস কলের ফ্লোর প্রাইজ ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৫ পয়সা করা হয়েছিল তখনই আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু বিটিআরসি বা সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। বর্তমানে কোনো কোনো অপারেটর মিনিটে ২ টাকার সঙ্গে আবার ভ্যাট সার্ভিস যুক্ত করে কলরেট আদায় করছে। এ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে ভয়েস কল যেখানে ফ্রি, সেখানে বাংলাদেশে ফ্লোর প্রাইজ ৪৫ পয়সা এবং ২ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এটি বৈষম্য তৈরি করছে।
অপারেটররা বলছে, নীতিমালায় এমন কোনো বাধ্যবাধকতা উল্লেখ নেই যে দুই টাকা সেলিং প্রাইজের সঙ্গে ভ্যাট আদায় করা যাবে না। আমরা গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন মনে করি এ ধরনের অতিরিক্ত মূল্য আদায় গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা। দুঃখের বিষয় হলো, নিয়ন্ত্রক কমিশনের চোখের সামনে এ ধরনের অপকর্ম হলেও তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
সাশ্রয়ী কলরেট নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ফ্লোর প্রাইজ অনেক গ্রাহকের কাছে ব্যয়বহুল। সে জন্য ফ্লোর প্রাইজ কমিয়ে বা তুলে নিয়ে সবার জন্য সহজলভ্য কলরেট নির্ধারণ করতে হবে। এ ছাড়া প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে ফ্লোর প্রাইজের সীমাও কমানো প্রয়োজন। গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা চালু করা যেতে পারে। আবার প্রতি সেকেন্ডভিত্তিক চার্জিং সিস্টেম আরও ব্যাপকভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন। এতে গ্রাহকরা ব্যবহার অনুযায়ী ন্যায্য বিল দিতে পারবেন।
এ বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারীকে সোমবার সন্ধ্যায় ফোন করলে তিনি রিসিভ করেননি। সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগে লিখিত প্রশ্ন পাঠালে, দুদিনেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।