কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ম্যালেরিয়ার ওষুধ-প্রতিরোধী ধরন শনাক্তে একটি নজরদারি গবেষণা শুরু করতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। বুধবার (১১ মার্চ) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় আইসিডিডিআর,বি।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি ও ব্র্যাকের সহযোগিতায় পরিচালিত এ উদ্যোগে শিবিরে শনাক্ত হওয়া ম্যালেরিয়া রোগীদের নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভাব্য ওষুধ-প্রতিরোধী পরজীবী শনাক্তের চেষ্টা করা হবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে ম্যালেরিয়া পরজীবীর ওষুধ-প্রতিরোধী ধরন ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে এই গবেষণা শুরু করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরজীবী বাংলাদেশে প্রবেশ বা বিস্তার লাভ করলে ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলের জাতীয় লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হতে পারে।
ম্যালেরিয়া একটি প্রাণঘাতী রোগ, যা মশার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এর সবচেয়ে মারাত্মক ধরণ প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপারাম। বর্তমানে কার্যকর ওষুধের মাধ্যমে এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব হলেও পরজীবীর ওষুধ-প্রতিরোধী ধরন তৈরি হলে চিকিৎসার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে এবং ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের (এফডিএমএন) ক্যাম্পে কাজ করা সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
গবেষণাটি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পরিচালিত হবে। এসব ক্যাম্প বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় ওষুধ-প্রতিরোধী ম্যালেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সীমান্তপারের যাতায়াত, ঘনবসতি এবং সীমিত নজরদারি ব্যবস্থাও এ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী ক্যাম্পে ১১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন, যা বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী জনবসতিগুলোর একটি। ব্র্যাকের হালনাগাদ নজরদারি তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব শিবিরে ম্যালেরিয়া শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২১ সালে যেখানে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ছিল সাতজন, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯১ জনে।
শরনার্থী শিবিরগুলোতে শনাক্ত হওয়া অধিকাংশ সংক্রমণই প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপারাম দ্বারা সৃষ্ট। নজরদারি তথ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে বান্দরবানের মতো ম্যালেরিয়া-প্রবণ এলাকায় ভ্রমণ বা মিয়ানমার থেকে সীমান্তপারের যাতায়াতের সঙ্গে সংক্রমণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে অব্যাহত সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কক্সবাজারের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করলে শরণার্থী ও স্থানীয় উভয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে এবং ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা কার্যকর থাকবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির সার্ভেইলেন্স মেডিকেল অফিসার ডা. মো. সিরাজুল ইসলাম সভায় শরনার্থী শিবিরগুলোর বর্তমান ম্যালেরিয়া পরিস্থিতি তুলে ধরে নজরদারি আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
পরে আইসিডিডিআর,বির সিনিয়র রিসার্চ অফিসার আনামুল হাসান প্রস্তাবিত গবেষণা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
তিনি জানান, নির্বাচিত ক্যাম্প ও নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ম্যালেরিয়া রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তাদের কাছ থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরজীবীর জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হবে, যাতে আর্টেমিসিনিন-ভিত্তিক সমন্বিত চিকিৎসার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত মিউটেশন শনাক্ত করা যায়। পাশাপাশি চিকিৎসার পর রোগীর রক্ত থেকে কত দ্রুত পরজীবী দূর হয়, তাও পর্যবেক্ষণ করা হবে। গবেষণাটি গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার অর্থায়নে পরিচালিত হবে এবং আগামী এপ্রিল থেকে রোগী অন্তর্ভুক্তি শুরু হবে।
আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ‘ওষুধ-প্রতিরোধী ম্যালেরিয়া সময়মতো শনাক্ত না হলে তা অজান্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রতিরোধের প্রাথমিক লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ কৌশল নির্ধারণে প্রমাণভিত্তিক তথ্য তৈরি করা বাংলাদেশের ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের অগ্রগতি ধরে রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
বাংলাদেশের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কৌশল (২০২৪-২০৩০) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী নজরদারি এবং ওষুধ-প্রতিরোধ দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সময়ের আলো/এনএ