প্রায় চার বছর ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন গাজীপুরের বাসিন্দা ফারুক হোসেন। তার দুটি কিডনির একটিও পুরোপুরি সুস্থ নেই। তাকে ঢাকার সরকারি একটি হাসপাতাল থেকে প্রতি সপ্তাহে দুইবার ডায়ালাইসিস করতে হয়। শুধু ডায়ালাইসিসেই তার প্রতি সেশনে খরচ হয় ৬২১ টাকা। দুই শিডিউলে খরচ ১২শর বেশি।
গাজীপুর থেকে ঢাকায় আসা খরচ দুই হাজার টাকা। প্রতি সপ্তাহে ওষুধপত্রসহ খরচ আরও পাঁচ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে প্রতি সপ্তাহে খরচ প্রায় ১৫ হাজার টাকা এবং মাসে খরচ হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। এক সময়ে সচ্ছল এই পরিবারটি এখন প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছে। নিজের জায়গাজমি যা ছিল সবই বিক্রি করতে হয়েছে চিকিৎসার খরচ মেটাতে। এখন আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে কোনোভাবে চিকিৎসা চলছে।
ফারুক হোসেনের স্ত্রী আলেয়া বেগম জানান, টাকা অভাবে মাঝে মধ্যেই ডায়ালাইসিস করাতে পারি না। কিন্তু ডায়ালাইসিস বন্ধ থাকলে শরীরের জটিলতা আরও বাড়ে। আর এভাবে কতদিন চিকিৎসা চালিয়ে নিতে পারব জানি না।
বেবি খাতুন নামের আরেক রোগী জানান, রাজধানীর কিডনি হাসপাতাল থেকে প্রতিবার ডায়ালাইসিসেই আমার খরচ হয় ১৬শ টাকা। সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস, বাসা থেকে আসা-যাওয়া এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ খরচ হয় ৩০ টাকার বেশি। আবার রক্তের হিমোগ্লোবিন কমে গেলে রক্ত ভরতে লাগে ৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ আমার প্রতি মাসে খরচ দেড় লাখ টাকার বেশি। এখন চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য আমার পরিবারের নেই।
অক্ষেপ করে তিনি বলেন, আমার জমি-জায়গা, বাড়ি-গাড়ি যা ছিল সবই শেষ শুধু এই রোগের কারণে। আত্মীয়স্বজনরাও এখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তারাই আর কত দেবে? তাই পারতপক্ষে এখন আর ডায়ালাইসিস করাই না। পুরো পরিবার এখন ঋণের ভারে জর্জরিত। শুধু উপরের ডাকের অপেক্ষায় আছি।
শুধু এই দুই রোগী নয়, রাজধানীর জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটে (এনআইকেডিউ) ও কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অন্তত ২০ জন রোগীর ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে সব পরিবারেই একই অবস্থা। চিকিৎসার লাগামহীন ব্যয়ে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।
অর্থের অভাবে মাঝপথে থমকে যাচ্ছে তাদের চিকিৎসা। তবে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস হয় এমন কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ডায়ালাইসিসের জন্য সরকারি হাসপাতালের ফি কিছুটা কম হলেও বেসরকারি হাসপাতালে তা কয়েক গুণ বেশি। আবার বেসরকারি কোনো কোনো হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের ফি ৮ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হয়ে এ খরচ দাঁড়ায় মোটা অঙ্কে। ফলে কিডনি রোগের ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন আরও অনেক পরিবার।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ডায়ালাইসিসের খরচ জোগাতে গিয়ে কিডনি রোগীদের ৯২ শতাংশ পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। এর মধ্যে রোগীদের গড়ে মাসিক ব্যয় হয় ৪৬ হাজার ৪২৬ টাকা। এই ব্যয় সর্বনিম্ন ৬ হাজার ৬৯০ থেকে সর্বোচ্চ ব্যয় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ডায়ালাইসিসের খরচ জোগাতে প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এ ছাড়া প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ রোগী প্রয়োজনীয়-সংখ্যক সেশনে ডায়ালাইসিস নিতে পারেন না।
হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় ওই সময় চিকিৎসাধীন মোট ৪৭৭ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যারা সরকারি, বেসরকারি ও এনজিও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ভর্তি ছিলেন।
দেশে মোট কিডনি রোগীর সংখ্যা কত সে ব্যাপারে সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। তবে দেশের বৃহত্তম সরকারি কিডনি হাসপাতালের তথ্য বলছে, কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকের ধারণা দেশে মোট কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৮২ লাখ। আর এই রোগে প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার রোগীর কিডনি বিকল হচ্ছে। নতুন রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে অথবা বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করছে। বর্তমানে এই রোগে দেশে মৃত্যুর স্থান অষ্টম।
এনআইকেডিউর প্রকাশিত হেলথ বুলেটিন অনুযায়ী, ৫০০ শয্যার কিডনি হাসপাতালটিতে ২০২৪ সালে মোট চিকিৎসা নিয়েছেন ২ লাখ ৬ হাজার রোগী, যা আগের বছরে ছিল ১ লাখ ৯০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরে রোগী বেড়েছে ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। ২০২২ সালে রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে আজ বৃহস্পতিবার বিশ্ব কিডনি দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ কিডনি সকলের তরে, মানুষের যত্নে বাঁচাও ধরণিরে’
জানা গেছে, দেশে প্রায় ৩৫টি সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হয়, যেখানে একই সেবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এ ছাড়া বেশিরভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামের অনেক রোগী স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন জানায়, বিশ্বের প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। আর বিশ্বে প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে ১ জন ক্রনিক কিডস বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে ভুগছেন। তবে বয়স্কদের মধ্যে এই হার আরও বেশি। যাদের বয়স ৬৫ থেকে ৭৫ বছর তাদের মাঝে প্রতি ৫ জনে ১ জন পুরুষ ও প্রতি ৪ জনে ১ জন নারী কিডনি রোগে ভুগছেন। আর যাদের বয়স ৭৫ বছর বা তদূর্ধ্বে তাদের অর্ধেক সংখ্যক মানুষ কিডনি রোগে ভুগছেন। আর ডায়ালাইসিস সুবিধা পায় মাত্র ২৫ শতাংশ রোগী। ৭৫ শতাংশই ডায়ালাইসিস সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসকরা জানান, কিডনি রোগের ভয়াবহতা ক্রমাগত বেড়েই চলছে। ৮০ শতাংশ বিকল না হওয়া পর্যন্ত কিনডি রোগের কোনো উপসর্গ থাকে না। এতে বেশিরভাগ রোগী চিকিৎসার জন্য আসছেন শেষ সময়ে। যখন তাদের প্রয়োজন হচ্ছে ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন। কিন্তু এ চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে না পেরে চিকিৎসার বাইরে থাকছেন ৮০ শতাংশ রোগী। তাদের মধ্যে প্রতি বছর মৃত্যু হচ্ছে ১০ হাজারের বেশি মানুষের। যা মানুষের সুস্থ জীবন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও জানান তারা।
দেশে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের কারণ হিসেবে চিকিৎসকরা জানান, ৪০ শতাংশ মানুষের কিডনি জটিলতা হচ্ছে কিডনি প্রদাহের কারণে, আর ডায়াবেটিস ৩৪ শতাংশ, উচ্চরক্ত চাপ ১৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ১১ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে কিডনিতে পাথর, সিস্ট, মূত্রনালির প্রতিবন্ধকতা আকস্মিক কিডনি রোগের কারণ, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, আকস্মিক রক্তক্ষরণ, ইনফেকশন, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, আকস্মিক হৃদরোগ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, কিডনি নীরবঘাতক। গত এক দশকে কিডনি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দিগুণ হয়েছে। কিডনি রোগের উপসর্গ নিয়ে যখন রোগী চিকিৎসকের কাছে যান তখন তার কিডনি তিন ভাগের এক ভাগ অকার্যকর হয়ে যায়। তখন রোগ নিরাময়, নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই উপসর্গ দেখার আগেই কিডনির নিয়মিত পরীক্ষা করানো উচিত। বছরে অন্তত একবার হলেও কিডনি রোগের পরীক্ষা করা উচিত।
তিনি বলেন, একটি পরিবারে কিডনি চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা। শুধু কিডনি রোগের চিকিৎসা নয় যেমন ডায়ালাইসিস, ট্রান্সপ্লান্ট অনেক ব্যয়বহুল। তাই কিডনি রোগ প্রতিরোধে ভেজাল খাবার খাওয়া যাবে না। ওজন নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কিডনি রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনা সৃষ্টির বিকল্প নাই।
কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ও কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ডা. হারুন-অর-রশীদ সময়ের আলো বলেন, মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো কিডনি। রক্ত পরিশোধন করা যার প্রধান কাজ এবং উৎপাদিত বর্জ্য মূত্রাকারে শরীর থেকে বের করে দেওয়া। তবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, শরীরে লবণ ও পানির ভারসাম্য রক্ষা এবং রক্ত উৎপাদনে কিডনির প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ বা ক্রনিক কিডনি থ্রিজিজের অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে ডায়াবেটিস, কিডনি প্রদাহ এবং উচ্চরক্তচাপ অন্যতম ঘাতক। কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক দিন পর্যন্ত উপসর্গবিহীন থাকতে পারে। তাই এই ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, দেশে প্রতি বছর নতুন করে ৪০ হাজার রোগীর ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হচ্ছে। এর মধ্যে ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন ১০ হাজার রোগী। বাকিরা অর্থের অভাবে ডায়ালাইসিস দিতে পারছেন না। আমার ২৫ শতাংশ রোগী ডায়ালাইসিস দিতে পারি। বাকি ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ ডায়ালাইসিস করার আওতার বাইরে থাকে।
ডা. হারুন-অর-রশীদ বলেন, সরকারি হাসপাতালে যারা চিকিৎসা নিতে আসেন তাদের বেশিরভাগেই নিম্নবৃত্ত। দেখা যায়, অনেক সময় ডোনার আছে কিন্তু ট্রান্সপ্লান্ট পরবর্তী মেডিসিনের যে অর্থ ব্যয় হয় সেটা অনেক রোগীর থাকে না। আর যারা উচ্চবিত্ত তার সরকারি হাসপাতালে আগ্রহী হয় না। তারা চলে যান দেশের বাইরে।
এ ছাড়া কিডনি দাতার সংকট যেমন রয়েছে তেমনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, লোকবলসংকট ও যন্ত্রপাতির সমস্যা রয়েছে। আর কিডনি অকেজো রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা ব্যক্তিগত ব্যয়ের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কাজেই এ ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মানুষকে আরও সচেতন করতে হবে। তবে আশার বিষয় হচ্ছে- কিডনি রোগের চিকিৎসা যতটা ব্যয়বহুল কিডনি রোগ নির্ধারণ কিন্তু ততই সহজ একটি প্রক্রিয়া।
সময়ের আলো/আআ