সম্প্রতি হয়ে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৪৩ আসনে প্রার্থী দিয়ে একটি আসনও পায়নি জাতীয় পার্টি (জাপা)। এমন ভরাডুবির হতাশা কাটিয়ে উঠতে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে জাপা। দলটির এখন প্রধান নজর আগামী ১২টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ওপর।
সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর ইতিহাসে ত্রয়োদশ নির্বাচনে এমন পরাজয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোই দলটির প্রধান লক্ষ্য। তাই আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে রাজনীতিতে অস্তিত্ব জিইয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছে দলটি।
জাতীয় পার্টির নেতারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার যথেচ্ছা নাজেহাল বা অপমান করতে ছাড়েনি জাতীয় পার্টিকে। অন্তর্বর্তী সরকারের ছত্রছায়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীসহ হঠাৎ গজিয়ে উঠা কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন দলের প্রধান কার্যালয়ে কয়েক দফায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে। আওয়ামী লীগের মতো জাপাকেও নিষিদ্ধ করতে সরকারকে চাপ দেওয়া হয় নানাভাবে। এমনকি জাপাকে দলীয় কোনো সভা-সমাবেশও করতে দেয়নি। বরং ঘরোয়া বৈঠকে অংশ নিতে গেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা তা করতে দেয়নি। সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২৪৩টি আসনে দলীয় মনোনয়ন দিলেও ম্যাটিকুলাস ডিজাইনে একজনকেও নির্বাচিত হতে দেওয়া হয়নি। এটি জাতীয় পার্টির ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। তবে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও হতাশা কাটিয়ে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় পার্টি অংশ নেবে।
দেশের ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে এ বছর নির্বাচন উপযোগী হবে ৩ হাজার ৭৫৫টি। আগামী বছরে আরও ৩৪৯টি। এ ছাড়া ভেঙে দেওয়া ৩৩০ পৌরসভা, ৪৯৫ উপজেলা, ১২টি সিটি করপোরেশন ও ৬১ জেলা পরিষদ এখনই নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে জাপা দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নিতে দলীয়ভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে আসন্ন ঈদের আগেই সারা দেশের জেলা, উপজেলার নেতাদের নিয়ে একটি বর্ধিত সভা করা হবে। ওই বর্ধিত সভার পরেও মূলত স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে তোড়জোড় আরও বাড়বে।
জাপা নেতারা বলছেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে স্মরণকালের সবচেয়ে বিপর্যয়ের পর এবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে জাতীয় পার্টি। আগামীতে অনুষ্ঠিতব্য ১২টি সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে দল। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও জাপা নেতাকর্মীরা নির্বাচনে অংশ নেবেন। কারণ জাতীয় পার্টি সবসময়ই নির্বাচনমুখী দল। আর দেশে এখন একটি রাজনৈতিক সরকার রয়েছে। ফলে এই সরকার কোনোভাবেই অন্তর্বর্তী সরকারের পথে হাঁটবে না। তা হলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে, তার সঙ্গে এই সরকারের পার্থক্যটা কী থাকবে।
অন্যদিকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর থেকে জাতীয় পার্টির (জাপা) রাজনীতি ছিল বেকায়দায়। দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া কয়েকটি রাজনৈতিক দল। এমনকি দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ না থাকলেও তেমন কোনো কর্মসূচিই পালন করতে পারেনি জাপা। এরই মধ্য দিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয় জাপা। কিন্তু নির্বাচনে ২৪৩ আসনে প্রার্থীরা অংশ নিলেও একটি আসনেও জিততে পারেনি দলটি। যদিও ত্রয়োদশ নির্বাচনে এইচ এম এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি (জাপা) অংশগ্রহণ করবে কী করবে না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে। পরে অবশ্য ২৪৩ আসনে প্রার্থী দিয়ে আশায় বুক বেঁধেছিল জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসার। কিন্তু সেই আশা ধোপে টেকেনি। বরং জাতীয় পার্টির লাঙ্গলের দুর্গে হানা দেয় জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা। এমনকি জাপার চেয়ারম্যান জিএম কাদেরও পরাজিত হন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর কাছে। তিনি রংপুর-৩ আসনে তৃতীয় হয়েছেন। এ ছাড়া দলটির সাধারণ সম্পাদক শামীম হায়দার পাটওয়ারি গাইবান্ধার দুটি আসনে নির্বাচন করলেও তিনি একটিতে তৃতীয় হয়েছেন। আরেকটি আসনে জামানত হারান। দলটি রংপুর বিভাগে একটি বাদ দিয়ে ৩৩টি আসনে প্রার্থী দেয়। কিন্তু এই আসনগুলোর কোনোটিতেই জিততে পারেনি দলটি। বিশেষ করে রংপুরের ৬টি আসনে জাপার দুর্গ ভেঙে দেয় জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লার কাছে ধরাশায়ী হয় লাঙ্গল। মূলত সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর এই প্রথম দলটির কোনো প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। নির্বাচনে দলটির কোনো প্রার্থী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও আসতে পারেননি।
এরমধ্যে দলটির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুরের দুর্গেও হানা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সংগত কারণে এ অবস্থাকে কেউ কেউ জাতীয় পার্টির ‘রাজনৈতিক মৃত্যু’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটও ছিল ভোটের বাইরে। আওয়ামী লীগ সরকারের গত সাড়ে ১৫ বছরের সুবিধা নেওয়া একমাত্র জাতীয় পার্টিই ভোটের মাঠে ছিল। কিন্তু ভোটের মাঠে এমন পরাজয়ের পর হতাশায় নিমজ্জিত হয় জাপা। এই হতাশা কাটিয়ে উঠতেই আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপা।
জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের ম্যাটিকুলাস ডিজাইনের নির্বাচন। ম্যাটিকুলাস ডিজাইনে জাতীয় পার্টিকে একটি আসনেও নির্বাচিত হতে দেয়নি। তবে এখন দেশে রাজনৈতিক সরকার আছে। একটি গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে। এ সরকারের আমলে আমরা আশা করছি এমন কোনো ম্যাটিকুলাস ডিজাইন হবে না। ফলে আগামীতে অনুষ্ঠিতব্য সব সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে জাতীয় পার্টি। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা নির্বাচনে অংশ নেবেন। ইতিমধ্যে দেশের সব স্তরের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের এখন থেকেই সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে যা হয়েছে, তা দেশবাসী দেখেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ম্যাটিকুলাস ডিজাইনের নির্বাচন। এতে জাতীয় পার্টির মতো একটি নির্বাচনমুখী দলকে ম্যাটিকুলাস ডিজাইনে প্রতিটি আসনে পরাজিত করা হয়েছেÑ যা এইচ এম এরশাদের হাতে গড়া দলটির রাজনীতির ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে আর কখনো ঘটেনি। সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর এই প্রথম দলটির কোনো প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। ড. ইউনূসের এই ম্যাটিকুলাস ডিজাইনের কথা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে একটি আসন না পেলেও আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে জাতীয় পার্টি। ইতিমধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঈদুল ফিতরের আগেই সারা দেশের নেতাকর্মীদের নিয়ে একটি বর্ধিত সভা আহ্বান করা হবে। এ বর্ধিত সভা থেকেই দলীয়ভাবে নেতাকর্মীদের আরও নির্দেশনা দেওয়া হবে।
এএডি/