আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার থেকে শাড়ি, থ্রি-পিস ও হাজি রুমাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২১৫টি সংসদীয় এলাকায়। তবে বরাদ্দ তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সহায়তার বেশিরভাগই গেছে সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের জোটভুক্ত সংসদ সদস্যদের এলাকায়।
অন্যদিকে সংসদের বাকি আসনগুলোতে থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের নির্বাচনি এলাকায় এ ধরনের কোনো বরাদ্দ না থাকায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ইতিমধ্যে জামায়াত ও এনসিপির কয়েকজন সংসদ সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন।
জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু সময়ের আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার ক্রমান্বয়ে সব এমপিদের সংসদীয় আসনে যাবে। আমি যখন বিরোধী দলে ছিলাম, আমার আসনে ঈদ উপহার পেয়েছিলাম। এটি কারও কাছে না যাওয়ার কোনো কারণ নেই।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (পলিসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি) ডা. জাহেদ উর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার থেকে ঈদ উপহার বিতরণের বিষয়টি জানেন না।
রাষ্ট্রীয় ত্রাণ তহবিলের মূল উদ্দেশ্য দুর্যোগ বা উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হলে তা রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এ ছাড়া সংসদের সব নির্বাচনি এলাকা একই রাষ্ট্রের অংশ হওয়ায় সহায়তা বণ্টনে সমতা থাকা প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন অনেকেই। ঈদকে সামনে রেখে ত্রাণ বিতরণের এ সিদ্ধান্ত এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।
প্রশ্ন উঠছে ত্রাণ কি মানুষের জন্য, নাকি রাজনীতির হিসাবের জন্য?
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার-২ এসএম পারভেজ স্বাক্ষরিত একটি বরাদ্দপত্রে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার ২১৫ নির্বাচনি এলাকায় ৭০০ করে সিনথেটিক শাড়ি, ১০০ করে থ্রি-পিস ও ৫০টি করে হাজি রুমাল বরাদ্দ প্রদান করা হলো।
২১৫ নির্বাচনি এলাকা ঘেঁটে দেখা গেছে, এসব আসন সরকারি দলের (বিএনপি ও জোট) সংসদ সদস্যদের। এখানে জামায়েত ইসলামী-এনসিপি জোটসহ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের জন্য এ বরাদ্দ রাখা হয়নি। বরাদ্দপত্রের নির্দেশনায় বলা হয়েছে— ‘বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রী (শাড়ি, থ্রি-পিস ও হাজি রুমাল) সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার, তেজগাঁও, ঢাকা থেকে সংগ্রহপূর্বক নির্বাচনি এলাকার সংসদ সদস্যের পরামর্শক্রমে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার অসহায়, গরিব ও দুস্থ জনসাধারণের মাঝে বিতরণ ও হিসাব সংরক্ষণ করবেন; বিশেষ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসকদের পক্ষে ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে বিলম্বের আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যরা নিজ দায়িত্বে ত্রাণসামগ্রী প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার, তেজগাঁও, ঢাকা থেকে তা সংগ্রহপূর্বক সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে বিতরণ করতে পারবেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর সদয় সম্মতি রয়েছে।’
পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন ফেসবুকে লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে শুধু সরকারদলীয় এমপিদের নির্বাচনি এলাকায় ঈদ উপহার হিসেবে কাপড় বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধীদলীয় এমপিদের নির্বাচনি এলাকায় সেই বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। কেন এই বৈষম্য? সরকার কি দেশের জন্য নাকি দলের জন্য?’
পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার থেকে ঈদ উপলক্ষে দরিদ্র অসহায় মানুষদের জন্য কাপড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শুধু সরকারদলীয় এমপিদের নির্বাচনি এলাকায়। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল মূলত দেশের সব অসহায় মানুষের জন্য। কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন তোলে তেমনি দেশের অন্য সব এলাকার দরিদ্র অসহায় মানুষের সঙ্গে তামাশার শামিল। এর মাধ্যমে দেশে আবারও বৈষম্যের একটি চিত্র ফুটে উঠেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটি মোটেও প্রত্যাশিত নয়। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছি।’
বিষয়টি কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ও ১১ দলীয় জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ ফেসবুকে লেখেন, ‘আমরা কি তা হলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর পরিবর্তে ‘সবার আগে বিএনপি নীতিতে’ যাচ্ছি। স্লোগান কি শুধু রেটরিক? প্রধানমন্ত্রী কি শুধু ৫০ শতাংশ লোকের? আমাদের এলাকার মানুষ মনে হয় ট্যাক্স-ভ্যাট দেয় না? জাতি এই বৈষম্য মনে রাখবে।’
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল কোনো দলীয় তহবিল নয় মন্তব্য করে ক্ষোভ প্রকাশ করে গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়ারেছ ফেসবুকে লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ঈদ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন নির্বাচনি এলাকায় অসহায় ও দুস্থ মানুষের জন্য কাপড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, এই বরাদ্দ শুধু সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের নির্বাচনি এলাকায় প্রদান করা হয়েছে; বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের নির্বাচনি এলাকায় এ ধরনের কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।’
তিনি লেখেন ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল কোনো দলীয় তহবিল নয়; এটি রাষ্ট্রের একটি মানবিক সহায়তা তহবিল, যা দেশের সব নাগরিকের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং এ তহবিল থেকে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য সৃষ্টি করা সমীচীন নয়। আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী সমগ্র বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়। দেশের সব জনগণ সমানভাবে রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে।’
এই সংসদ সদস্য আরও লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভাজন পরিহার করে দেশের সব নির্বাচনি এলাকার অসহায় ও দুস্থ মানুষের জন্য সমানভাবে বরাদ্দ নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে। দেশের মানুষ আর এ ধরনের বৈষম্য দেখতে চায় না।’
বিএনপির এক সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ত্রাণসামগ্রী সরাসরি তাদের কাছে আসার কথা নয়। নিজ নিজ উপজেলা প্রশাসন সেটি দেখছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুধু সরকারদলীয় এমপিদের সংসদীয় আসনে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার দেওয়াকে দুঃখজনক হিসেবে উল্লেখ করে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াত ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সময়ের আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংসদের লিডার। পুরো দেশের প্রধানমন্ত্রী। প্রত্যেক এমপির সংসদীয় আসনে এই সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার পৌঁছানো হবে।
নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ সময়ের আলোকে জানান, তিনি তার সংসদীয় আসনে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার পাননি।
এফআর