মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ২০১১ সালের ২০ মার্চ থেকে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিবের পদে অধিষ্ঠিত হয়ে দলের নীতি, কৌশল ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন। রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধেও রেখেছেন সক্রিয় অংশগ্রহণ।
শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি ও তৃণমূল রাজনীতি থেকে উঠে আসার অভিজ্ঞতা তাকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। তিনি কখনো রাজনীতিকে জীবিকা হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কারাবরণ, গণআন্দোলন, নির্বাচন, বাংলাদেশের গত চার দশকের উত্তাল রাজনৈতিক সময়ে তার নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ছিলেন প্রথম সারির নেতৃত্বের কাতারে।
মানবিক ও সংযত নেতৃত্বের কারণে তিনি রাজনৈতিক সহমর্মিতা ও সংযমের একটি বিরল প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। বর্তমান রাজনীতি, সংসদ, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এনসিপিসহ সমসাময়িক নানা বিষয়ে গুলশানে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সম্প্রতি তিনি বিস্তারিত কথা বলেছেন সময়ের আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি মুনিফ আম্মার ও রফিক রাফি
সময়ের আলো : কতদিন পরে সংসদের চেয়ারে বসলেন?
মির্জা ফখরুল : অনেক দিন পরে। ২০০৬ সালে শেষ অর্থাৎ তারপর তো আর সংসদে বসার কোনো সুযোগ হয়নি আমাদের। কারণ নির্বাচনই হয়নি ঠিকমতো। ওই নির্বাচনগুলোকে আমরা কখনোই গ্রহণ করিনি, জনগণও গ্রহণ করেনি। জনগণ ভোট দিতেও যায়নি। যার ফলে এখন হিসাব করে বের করুন- প্রায় ২০ বছর। ২০০৬ আর ২০২৬।
এই ২০ বছর আপনি পুরোদমে মাঠে ছিলেন। এরপর সংসদে আসা...
এটি আমাদের জন্য একটা আবেগঘন মুহূর্ত। দুটো কারণে। একটি হচ্ছে ২০ বছর পরে সেই সংসদে আবার যাওয়ার সুযোগ হওয়া। দ্বিতীয়ত হচ্ছে আমাদের নেত্রী, যিনি আমাদের অনুপ্রেরণা ছিলেন এবং এই দীর্ঘ সংগ্রাম যার অনুপ্রেরণায় আমরা করতে পেরেছি, আমাদের সেই নেত্রী, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া সংসদে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে। সবচেয়ে বেশি আমার কাছে মনে হয় আরও বেশি আবেগঘন ব্যাপার, ঠিক সংসদের উত্তর পাশেই তার স্বামীর সঙ্গে তিনি শুয়ে আছেন। আর মানুষের জীবনে কিছু ব্যাপার থাকে। ‘ডেসটিনি’ বলে একটা কথা আছে, ভবিতব্য। আসলে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জনগণের এত বেশি ভালোবাসা পেয়েছিলেন, সারা দেশের মানুষ তার জন্য সবসময় এত বেশি দোয়া করেছে। যে কারণে হয়তো আল্লাহ তায়ালা তাকে সেই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন, যে জায়গাটা এ দেশের যেকোনো মানুষের জন্য ঈর্ষণীয়। তিনি ঠিক একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই শায়িত আছেন। আমরা কয়েক দিন আগেও ভাবতে পারিনি যদি তিনি চলে যান, তা হলে তাকে কোথায় কবর দেব। এ নিয়ে আমরা চিন্তা করতাম।
৫ আগস্টের আগের কথা বলছেন?
কয়েক দিন আগের কথাই বলছি। আল্লাহ তায়ালার কী অশেষ রহমত। পুরো পরিস্থিতি বদলে গিয়ে এমনভাবে সবকিছু হলো যে মনে হলো যেন আল্লাহই সাহায্য করলেন, যাতে তাকে ওই জায়গাতেই দাফন করার ব্যবস্থা হয়। কত সম্মানের সঙ্গে, কোটি কোটি মানুষের চোখের জল নিয়ে, কান্না নিয়ে তাকে বিদায় জানানো হলো।
বাংলাদেশে এমন জানাজা কিংবা এমন বিদায় আসলে বিরল...
আমাদের জীবদ্দশায় আমরা এখন পর্যন্ত দেখিনি এবং পৃথিবীতেও আমার মনে হয় খুব কম- আই ডোন্ট নো বাট আমার কাছে মনে হয় যে এমনটা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
খালেদা জিয়া ছাড়া এই সংসদটা খানিকটা অপূর্ণই রয়ে গেল মনে করেন?
হ্যাঁ, ওটা তো বটেই। আমাদের কাছে তো বটেই। যারা আমরা তাকে সামনে রেখে, তার নেতৃত্বে সংগ্রাম করেছি, লড়াই করেছি। প্রতি মুহূর্তে তার কথা মনে হয় আমাদের।
বড় রাজনৈতিক দল ছাড়া সংসদে খানিকটা কি অপূর্ণতা মনে হচ্ছে না?
এখন বিরোধী দল হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাই না? আর নতুন ছেলেরা যে নতুন এনসিপি করেছে, তারা কয়েকজন আছে। এখন জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি আর আমাদের রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কমপ্লিটলি ডিফারেন্ট। তারা বলে যে তারা সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং সেভাবেই তারা কাজ করে। জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারে আমাদের সবচেয়ে বড় যে বক্তব্য- দলটি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। শুধু বিরোধিতা করেনি, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেছে- গণহত্যার জন্য, আমাদের মা-বোনদের সম্ভ্রমহানির জন্য। আমাদের সবচেয়ে মেধাবী মানুষদের, আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ব্যাপারেও তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই জায়গাটা তো আমি মেনে নিতে পারি না। তার জন্য তারা একবারের জন্য সরি পর্যন্ত বলেনি। যে আমরা সরি, আমরা ভুল করেছি, সেটাও তারা বলেনি।
গুলশানে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যালয়ে গত ১৩ মার্চ মির্জা ফখরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন মুনিফ আম্মার। ছবি : আবদুল হালিম
সরাসরি না বললেও একটু ইনিয়ে বিনিয়ে বিভিন্ন সময় তো বলেছে।
না, সেটা ভিন্ন বিষয়। বাট ইউ হ্যাভ টু বি ভেরি ক্লিয়ার ইন দিস অ্যাসপেক্ট। যে ১৯৭১ আমরা যা করেছি ভুল করেছি। জনগণ যেন আমাদেরকে ক্ষমা করে। এটা তাদের বলা উচিত ছিল। তা হলে আজকে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে সেই সমস্যাগুলো তো সেভাবে থাকত না। এটা হচ্ছে এক নম্বর কথা।
দুই নম্বর হচ্ছে যে তাদের সুস্পষ্টভাবে বলতে হবে যে জামায়াতের মূল যে বই সে বইয়ের মধ্যে তো তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। তারা তো ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তারা যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়- তারা সেটা ঘোষণা দিয়ে বলবে। জনগণ যদি চায় এটাই করবে। তাই না? এই যে এগুলো হচ্ছে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, এনোমেলিস।
যেমন সংসদ চেয়েছিলেন, তেমনটা কি পেয়েছেন?
না, এটা এখনই বলা যাবে না। এটা হচ্ছে যে, ধরেন সংসদের সবচেয়ে বড় যে একটা গ্যাপ আছে, যে শূন্যতা আছে, আমি মনে করি তা হচ্ছে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল তাদের অপকর্মের জন্য সংসদে নেই। তারা যেহেতু তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে নিষিদ্ধ, তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। সেই জায়গাটা তো নিঃসন্দেহে আমি একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে এবং দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এই জায়গাটাকে একটা শূন্যতাই মনে করি। আওয়ামী লীগ দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার নিজস্ব চরিত্র বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছিল। ইনফ্যাক্ট, ১৯৭২ সালের পরেই সে তার চরিত্র হারিয়ে ফেলেছিল।
১৯৭২ সালের পরেই হারিয়ে ফেলেছে?
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। কারণ ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পরে পাঁচ বছর তাদের যে ভূমিকা, এটা তো আমরা ভুলতে পারি না। আমরা তো তখন একেবারেই তরুণ ছিলাম। ছাত্র রাজনীতি শেষ করেছি। আমার ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে ৬৯-এ। তারপর যুদ্ধ হয়েছে, যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধের পরে সরকারি কলেজে চাকরিতে যোগ দিয়েছি। এই চিন্তায় যে দেশে এখন সমাজতন্ত্র আসবে, দেশের মানুষের কোনো সমস্যা থাকবে না।
এটা বহুবার বলেছেন যে আপনি দেশে সমাজতন্ত্র দেখতে চেয়েছিলেন বা আপনার মনে এই আকাঙ্ক্ষাটা ছিল...
সমাজতন্ত্র চেয়েছি আমি। আমি তো একসময় বাম রাজনীতি করতাম। সবাই জানে। এখানে লুকানোর কিছু নেই। অ্যান্ড আই ফিল প্রাউড ফর দ্যাট। এখন সেটাই হচ্ছে। তো ওই জায়গা থেকে আমরা তখন দেখেছি কীভাবে আওয়ামী লীগ তার চরিত্র হারিয়ে ফেলল। বিরোধী দলের ওপর কীভাবে নির্যাতন, নিপীড়ন করেছে। বিশেষ করে যারা তখন সমাজ পরিবর্তনের কথা বলছিল, জাসদ থেকে শুরু করে বামপন্থি দলগুলো, তোয়াহা সাহেবের দল, হক সাহেবের দল, কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর ওপর কীভাবে অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে, কীভাবে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। সেটা আমরা দেখেছি, নিজের চোখে দেখেছি। এরপরে কীভাবে তারা রক্ষীবাহিনী নিয়ে এসেছে, রক্ষীবাহিনী দিয়ে কীভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তারা নির্মূল করেছে, এগুলো আমাদের দেখা।
তা হলে কি ১৯৭২ সালের আওয়ামী লীগ আর ২৪-এর আওয়ামী লীগের মধ্যে কি আসলে কোনো তফাৎ ছিল?
না, খুব বেশি তফাত ছিল না। ছিলই না বলা যায়। আমাদের বুঝতে হবে বাংলাদেশের মানুষের যে মনমানসিকতা, তাতে আমরা যতগুলো নির্বাচন দেখেছি, সেখানে আওয়ামী লীগের একটা সুনির্দিষ্ট ভোট আছে। নির্দিষ্ট ২০-৩০ শতাংশ মানুষের, যদিও এটি নির্ভর করে, এরকম একটা ভোট তাদের সবসময় আছে। অ্যান্ড দ্যাট ইজ বিকজ অব দেয়ার স্ট্রাগল বিফোর সেভেন্টি ওয়ান।
সেখানে তো তাদের মুখ্য ভূমিকা ছিল। সেখানে জাতীয়তাবাদের সংগ্রাম, স্বাধিকারের সংগ্রামের যে মুখ্য ভূমিকা তারা পালন করেছে, সে কারণে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তাদের একটা অবস্থান তৈরি হয়ে গেছে। ওটা বাস্তবতা। কিন্তু দুর্ভাগ্য, যখন নেতৃত্ব এমনভাবে ব্যর্থ হয়েছে যে সেই জনমত, জনগণের ভালোবাসা, জনগণের সমর্থন, এটা তারা হারিয়ে ফেলেছে। একই ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৫ সালে। শেখ মুজিবুর রহমান যখন খুন হলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটা সত্য কথা যে একজন মানুষও এনার জন্য কাঁদেনি। দ্যাটস দ্য রিয়েলিটি। তো এটা কিন্তু আওয়ামী লীগ রিভিউ করেনি, কেন এমন হলো। শেখ মুজিবের মতো একজন অবিসংবাদিত নেতা, যার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। সেই লোক যেদিন নিহত হলেন, সেদিন আপনার একটা লোকেরও এনার জন্য চোখে পানি পড়েনি। তো এটা তো রিভিউ করা দরকার ছিল।
উচিত ছিল কিন্তু আওয়ামী লীগ সেটা করেনি। যাই হোক, আওয়ামী লীগ ২১ বছর পরে যখন ক্ষমতায় এসেছে, আবার সেই আগের চেহারায় ফিরে এসেছে। সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে ফিরে এসেছে ২০০৮-০৯ সালের নির্বাচনের পরে। মানে এমনভাবে আওয়ামী লীগ নিজেকে ধ্বংস করেছে, আমি বলি, আওয়ামী লীগ আসলে একটা ‘প্রোসেস অব সেলফ অ্যানাইহিলেশন’ বেছে নিয়েছে। একবারের জন্য রাজনৈতিক চিন্তা করেনি, রাজনৈতিকভাবে বিষয়গুলো অ্যানালাইজ করেনি। মনে করেছে ক্ষমতায় বসে থাকাটাই হচ্ছে শেষ কথা। কিন্তু তার পরিণতি কী হলো? কত ভয়াবহ পরিণতি যে আজকে আওয়ামী লীগ কোথায় দাঁড়াতেই পারছে না।
এখানে কি বিএনপির কোথাও কোনো দায় আছে বলে মনে করেন?
আমি বিএনপির কোনো দায় দেখি না। এ জন্য বিএনপির দায় কেন হবে? বিএনপির তো জন্মই হয়েছে আপনার ৭৫-এর পরে।
রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জায়গা থেকে কি এমন কিছু ছিল কি না?
না, আমি মনে করি না। আওয়ামী লীগ যেটা করেছে এটা তো পৃথিবীর গণতান্ত্রিক ইতিহাসে কোনো দেশে ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। একটি এত জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল নিজেকে নিজেই শেষ করে ফেলে, এটা আমি দেখিনি। দে হ্যাভ ডেসট্রয়েড দেমসেলভস। কাউকে লাগেনি। নিজেরা নিজেদের শেষ করে ফেলেছে।
আপনি তো কারাগারে বেশ কয়েকবার অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন এবং আপনাকে বেশ কষ্ট পোহাতে হয়েছে। ওখানে গিয়ে বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে তো আপনাদের একসঙ্গে দেখা হয়েছে। হ্যাঁ, আমার সবচেয়ে বেশি দেখা-সাক্ষাৎ ছিল কাশিমপুরে। তখন তো মেইনলি আপনার জামায়াতে ইসলামীর যারা বড় নেতা মাওলানা নিজামী সাহেব থেকে শুরু করে কাশেম সাহেব সবাই কাশিমপুর জেলে ছিলেন। ফলে তাদের সঙ্গে আমাদের একটা খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক। আমরা একসঙ্গে নাশতা করতাম, নামাজ পড়তাম। একসঙ্গেই হতো সব। ফলে পারসোনালি তখন তাদের আমাদের দেখার সুযোগ আরও বেশি হয়েছে। যদিও মাওলানা নিজামী সাহেবের সঙ্গে আমি...তিনি মন্ত্রী ছিলেন, আমি প্রতিমন্ত্রী ছিলাম। একই মন্ত্রণালয়ে ছিলাম। ফলে তাকে ওখানেও আমার ভালো করে দেখার সুযোগ হয়েছে। অ্যাজ এ পারসন হি ওয়াজ ওয়ান্ডারফুল। সৎ, বিজ্ঞ এবং পণ্ডিত মানুষ। অনেক পড়াশোনা করতেন, জানতেন। উনি বইও লিখতেন প্রচুর। কামরুজ্জামান সাহেব আরেকজন পণ্ডিত লোক ছিলেন। উনি সাংবাদিকতাও করেছেন কিছু দিন। তো সব মিলিয়ে কারাগার কিন্তু একটা বিচিত্র জায়গা। ‘টিটি’ বলত ওদের।
মির্জা ফখরুল জেলের স্মৃতিরোমন্থন করে বলেন, জেলে থাকতে সত্যিই বলছি, আমার মন খারাপ হয়নি। মন খারাপ হয়নি কারণ আমি বেশিরভাগ সময় বই পড়েই কাটাতাম। এ ছাড়া আমাদের কিছু খেলাধুলারও ব্যবস্থা ছিল নিচে। আমরা ক্রিকেট খেলতাম, অনেক সময় হাঁটতাম, গল্প করতাম। সময়গুলো ওভাবেই কাটত।
২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি ঢাকায় আয়োজিত এক সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসন ও প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বর্জনের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে সমাবশটির আয়োজন করেছিল। ফাইল ছবি
আপনার খারাপ লাগল কবে....
এই শেষের দিকে আমাকে আর মির্জা আব্বাসকে তুলে নিয়ে গেল রাতে। নিয়ে তার পরের দিন ডিবি অফিসে রেখে, তারপর সন্ধ্যার পরে আমাদের কেরানীগঞ্জে নিয়ে গেল। খুব শীত ছিল ডিসেম্বর মাস, প্রচণ্ড শীত। তো একজন অফিসার ঢুকে বলছে, স্যার আপনাদের তো কোয়ারেন্টাইনে যেতে হবে। বললাম, কোয়ারেন্টাইন কেন? কোভিড কবে শেষ হয়ে গেছে। এখন আবার কোয়ারেন্টাইন কেন? ওরা বলল, না স্যার, আমাদের তো ওই নিয়মটা এখনও ওঠেনি। যেতে হবে। আমি বললাম, নো ওয়ে, আমাকে সোজা ডিভিশনে নেবেন। ডিভিশনে না নিলে এখান থেকে এক পাও নড়ব না। অনেকক্ষণ ওরা চেষ্টা করল, শেষের দিকে ওখানে একজন মহিলা ডেপুটি জেলার ছিল। সে এসে বলল, স্যার, চিন্তা করবেন না, ওটা অলমোস্ট লাইক ডিভিশন। ভালো স্যার, খুব ভালো। এসব বলে বুঝিয়ে আমাদের নিয়ে গেল। এই জেলে যাওয়ার সময়গুলো আমার জন্য বড় সম্পদ। জেলে গিয়ে কিন্তু কখনো আমার মন খারাপ হয়নি।
নতুন সংসদ তো হলো। এখন কী হবে? গণপরিষদ গঠন বা জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনা কি শুরু হতে পারে?
কিছু আলোচনার সুযোগ তো আছে। আলোচনা করতেই হবে। আলোচনা ছাড়া তো গণতন্ত্র চলবে না। যে বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সঙ্গে মতভেদ আছে সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে শেষ করা যাবে। কেন করা যাবে না? কথা বলেই শেষ করা যাবে।
গণরায় বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক দলের অনেক অভিযোগ আছে। বিএনপি এটা নিয়ে কী ভাবছে?
গণভোটের গণরায় নিয়ে যেটি বলছেন, আমরা তো বলিনি- এটা আমরা মানব না। আমরা বলেছি না এটা হবে এবং আইনগত যে বিষয় আছে অর্থাৎ সংবিধানের মধ্য দিয়ে সেটা হবে এবং এরপরে সংবিধান পরিবর্তন যা হওয়ার তাই হবে।
আপনার ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় একসঙ্গে আছে। দ্বিতীয় প্রজন্মের রাজনীতিবিদ, তৃণমূল থেকে উঠে আসা, সরকারি চাকরি, মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্ররাজনীতি এসব মিলিয়ে আপনার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা আলাদা...
বলা যায় আমার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছি। সেদিক থেকে আমার জীবনটা বৈচিত্র্যময় এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও বৈচিত্র্যময়।
বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে কবে যুক্ত হলেন এবং কীভাবে?
জিয়াউর রহমান সাহেবের রাজনীতিতে আসার পর থেকেই। আমি তখন এস এ বারী সাহেবের প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলাম। তাকে কাছ থেকে দেখি। তাকে দেখে মনে হয় তিনি সত্যিকার অর্থেই পরিবর্তন আনতে পারবেন। তার সততা, কর্মক্ষমতা, ভিশন, দূরদৃষ্টি আমাকে আকৃষ্ট করে। পরে যখন আমি পৌরসভা চেয়ারম্যান হই এবং জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরে খালেদা জিয়া আমাকে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে বলেন।
দীর্ঘদিন শিক্ষকতার পেশায় ছিলেন...
প্রায় ১৬ বছর। এর মধ্যে ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর নতুন সরকার আসে- জিয়াউর রহমানের সরকার। যখন তিনি রাজনীতিতে আসেন এবং ফ্রন্ট তৈরি করেন তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি ফ্রন্ট গঠন করা হয়। তার মধ্যে ন্যাপও ছিল। আমার যেহেতু ন্যাপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, সে কারণে তৎকালীন ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার এস এ বারী এটি আমাকে তার প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়ে যান।
মানে আপনি শিক্ষা ক্যাডারে থাকার পরে চলে গেলেন ওদিকে?
হ্যাঁ, আমি তার সঙ্গে কাজ করেছি রাষ্ট্রপতি জিয়ার হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত। এরপর আমি নিজেই চাকরিতে ফিরে যাই। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও কলেজ গভর্নমেন্ট কলেজ হয়ে যায়। আমি সেখানে যোগ দিই। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর সেখানে ছিলাম। পরে আবার ঢাকায় চলে আসি। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডেপুটেশনে কাজ করি। ১৯৮৮ সালে আমান উল্লাহ ও আরও দুজন আমাকে রাজনীতিতে যাওয়ার জন্য খুব চাপ দিতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত আমি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের জন্য চাকরি থেকে পদত্যাগ করি এবং নির্বাচন করি। নির্বাচনের পরে তিন বছর সেখানে কাজ করেছি।
সেই অর্থে আপনি একদম তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন...
একেবারেই। সে জন্যই তো আমার অভিজ্ঞতা অনেকের চাইতে বেশি।
আপনার গুরুত্বপূর্ণ সময় সময়ের আলোকে দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
সময়ের আলোর পাঠক এবং সংবাদকর্মীদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ।