ভর্তি পরীক্ষার দৌরাত্ম্য নিয়ে বিতর্ক শোরগোল

এম মামুন হোসেন

জাতীয়

শিশুটির প্রকৃত বয়স ১০ বছর। কিন্তু জন্মনিবন্ধনে বয়স কমিয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষায় বসা রেওয়াজ হয়ে উঠেছিল রাজধানীর ভিকারুননিসা, মতিঝিল

2026-03-18T01:41:30+00:00
2026-03-18T01:44:03+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
ভর্তি পরীক্ষার দৌরাত্ম্য নিয়ে বিতর্ক শোরগোল
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬, ১:৪১ এএম  আপডেট: ১৮.০৩.২০২৬ ১:৪৪ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
শিশুটির প্রকৃত বয়স ১০ বছর। কিন্তু জন্মনিবন্ধনে বয়স কমিয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষায় বসা রেওয়াজ হয়ে উঠেছিল রাজধানীর ভিকারুননিসা, মতিঝিল আইডিয়াল ও রাজউক উত্তরা মডেলসহ দেশের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিকে কেন্দ্র করে শিশুদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা, কোচিং বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য ছিল। 

ভর্তিকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল। শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুকে ভর্তিতে লেনদেন হতো লাখ লাখ টাকা। শিশুর ভর্তিতে অনিয়ম নিয়মে পরিণত হয়ে উঠেছিল। অভিভাবক, শিক্ষাবিদসহ সব মহলের তীব্র সমালোচনার মুখে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে পরিবর্তন আনা হয়। 

২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার বদলে লটারি পদ্ধতিতে ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরের বছর বেসরকারি বিদ্যালয়েও এই পদ্ধতি চালু হয়। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি তখনও পরীক্ষার মাধ্যমেই হতো।

গত সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন জানান, লটারি ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হচ্ছে, এখন থেকে পরীক্ষা নেওয়া হবে। সরকারের দাবি, লটারির ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা কাক্সিক্ষত স্কুলে সুযোগ পাচ্ছে না, যার প্রভাব পড়ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ফলে। মন্ত্রীর এই ঘোষণার পর থেকেই শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। 

শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, লটারির পরিবর্তে আবার পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হলে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ বাড়বে এবং কোচিং-প্রাইভেটের প্রবণতা নতুন করে মাথাচাড়া দেবে। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যও বাড়তে পারে। গ্রামীণ এলাকায় এমন লটারির প্রয়োজন হয় না। এটি মূলত শহরের নামি স্কুলগুলোয় প্রযোজ্য। তাই নতুন করে শিক্ষাব্যবস্থায় জটিলতা বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।

দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর লটারি পদ্ধতি বাতিলের পেছনে প্রধানত মেধা যাচাই ও শিক্ষার মান রক্ষাকে বড় করে দেখা হচ্ছে। গত ১৬ মার্চ সংসদে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বিগত সরকার শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারির ব্যবস্থা চালু করেছিল। 

আমার কাছে এটি খুব যুক্তিসংগত মনে হয়নি। আগামী শিক্ষাবর্ষে ভর্তির পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সবার অভিমত নিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এর এক দিন পর সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী লটারির বদলে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভর্তি পরীক্ষা চালুর আলোচনা শিক্ষা ক্ষেত্রে পুরোনো সমস্যাগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে। তাই অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া নিয়ে ভাবার আগে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। না হলে শিশুদের ওপর চাপ বৃদ্ধি, কোচিং নির্ভরতা এবং ভর্তিকে ঘিরে অনিয়ম এই পুরোনো সমস্যাগুলোর আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

এক সময় বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার নামে অল্প বয়সেই শিশুদের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতো। কোচিং ও প্রাইভেট ছিল সাধারণ ঘটনা। অনেক পরিবার সন্তানদের নামি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে কোচিং সেন্টারের দ্বারস্থ হতো। পাশাপাশি ভর্তিকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও ছিল বিস্তর। ফলে সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য নামকরা বা মোটামুটি ভালো বিদ্যালয়েও ভর্তি হওয়া প্রায় অধরাই থেকে যেত। 


এ পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক সমালোচনা ও আলোচনা হয়। এমন প্রেক্ষাপটে প্রথমে কেবল প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারির পদ্ধতি চালু করা হয়। ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে (যেসব স্কুলে প্রথম শ্রেণি রয়েছে) প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। 

পরের বছর বেসরকারি বিদ্যালয়েও একই পদ্ধতি চালু হয়। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি তখনও পরীক্ষার মাধ্যমেই হতো। পরবর্তী সময় করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত একই পদ্ধতিতে ভর্তি কার্যক্রম চলছে।

শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। যে ধরনের পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাতে যারা কোচিং বা প্রাইভেট পড়ে তারাই মূলত এগিয়ে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতিই তুলনামূলকভাবে ভালো। তবে লটারি যেন স্বচ্ছভাবে হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। 

তিনি বলেন, একই সঙ্গে প্রত্যেক এলাকায় মানসম্মত বিদ্যালয় গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন এই শিক্ষাবিদ। 
তার মতে, সব এলাকায় ভালো বিদ্যালয় থাকলে অল্প বয়সে ভর্তি নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার প্রয়োজনই পড়বে না।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিশু বয়সে মেধার তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না। এই বয়সে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করা শিক্ষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও যৌক্তিক নয়। এতে বরং শিশুদের ওপর অযাচিত প্রতিযোগিতা ও মানসিক চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে কোচিং-নির্ভরতা বাড়ে, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বাণিজ্যিক করে তোলে।

দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী দেশের শিক্ষা খাতকে রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থের বাইরে রাখার আহ্বান জানান।
 
তিনি বলেন, শিক্ষা অবশ্যই রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হতে পারে। তবে তা কোনোভাবেই দলীয় এজেন্ডায় পরিণত হওয়া উচিত নয়। স্কুলে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তিতে বিদ্যমান লটারি ব্যবস্থার বাস্তবতা যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়ে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এ ব্যবস্থা প্রত্যাহারের আগে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করা জরুরি। 

কারণ গ্রামীণ এলাকায় এমন লটারির প্রয়োজন হয় না। এটি মূলত শহরের নামি স্কুলগুলোয় প্রযোজ্য। লটারি ও মেধা দুই পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি ‘মিশ্র ভর্তিব্যবস্থা’ বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।

সময়ের আলো/এআর



  বিষয়:   ভর্তি  পরীক্ষা  বিতর্ক  শোরগোল 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: