পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় নতুন টাকার নোট কেনাবেচা বেড়েছে। বুধবার (১৮ মার্চ) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, ফুটপাতজুড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বাজার, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নতুন নোট কিনতে ভিড় করছেন। ঈদ আসলেই বেড়ে যায় নতুন টাকার চাহিদা। ব্যাংকে না পেলে রাস্তায় বসা দোকানে ভিড় করে মানুষেরা। যদিও নতুন নোট পণ্য হিসেবে বাজারে বিক্রি বেআইনি। তবে, সেই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সবার চোখের সামনেই বিক্রি হতে দেখা যায় নতুন নোট।
রাজধানীর মতিঝিল, গুলিস্তান, সদরঘাট কিংবা নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠেছে ভাসমান নতুন নোটের বাজার। মতিঝিলের ব্যাংক পাড়ায় দেখা যায়, প্রধান সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন বিক্রেতারা। তাদের সামনে ১০, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার ঝকঝকে নতুন নোট সাজানো, কোথাও আবার বান্ডিল আকারে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা নোট দেখে, যাচাই করে দরদাম করছেন এবং পছন্দমতো কিনে নিচ্ছেন।
ঈদ উপলক্ষে নতুন নোটে সালামি দেওয়ার ঐতিহ্য এখনও দেশের পরিবারগুলোতে প্রচলিত। বিশেষ করে শিশুদের কাছে নতুন নোটের আকর্ষণ বেশি থাকায় ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এর চাহিদা বাড়ছে।
বিক্রেতারা জানান, ছোট মূল্যমানের নোটের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। তবে, এসব নোট কিনতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। যেমন ১০০ টাকার নতুন নোট কিনতে অনেক ক্ষেত্রে ১১০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, ব্যাংক থেকে সহজে নতুন নোট পাওয়া যায় না। ফলে, বাধ্য হয়েই তারা বেশি দামে গুলিস্তান থেকে কিনছেন। তবুও ঈদের দিনে নতুন নোট দিয়ে সালামি দেওয়ার আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত হতে চান না।
ঈদ ঘনিয়ে আসতেই এসব এলাকার ফুটপাতজুড়ে গড়ে উঠা বাজার জমে উঠে। ১০ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার টাকার নতুন নোট বান্ডিল করে সাজিয়ে বিক্রি করছেন ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে এসব নোট কিনতে ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ। আইন অনুযায়ী যা স্পষ্টতই দণ্ডনীয় অপরাধ, বাস্তবে সেটিই এখন ‘ওপেন সিক্রেট’।
প্রশ্ন উঠছে-আইন থাকা সত্ত্বেও কেন বন্ধ হচ্ছে না এ বেচাকেনা? আর এর পেছনে কি কোনও নীরব প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্রয় কাজ করছে?
প্রকাশ্যে অবৈধ বাজার
সবচেয়ে বিস্ময়কর চিত্র দেখা যায় মতিঝিলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের আশপাশে। ফুটপাতজুড়ে সারি সারি অস্থায়ী দোকান, টেবিল বা চাটাই বিছিয়ে সাজানো নতুন নোটের বান্ডিল। ১০, ২০, ৫০, ১০০ টাকার নোটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
একটি ১০০ টাকার বান্ডিল কিনতে বাড়তি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। ২০ ও ৫০ টাকার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বিক্রেতাদের যুক্তি, চাহিদা বেশি, তাই দামও বেশি।
গুলিস্তান স্পোর্টস মার্কেট এলাকা, শাঁখারীবাজার মোড়, সদরঘাট-সব জায়গাতেই একই দৃশ্য। কোথাও কোনো গোপনীয়তা নেই। বরং, প্রকাশ্যেই দরদাম করে চলছে কেনাবেচা। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেও এ বেচাকেনা অব্যাহত থাকছে। শুধু রাজধানী নয়, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে এ প্রবণতা।
শতাধিক দোকান, হাজারো ক্রেতা
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, মতিঝিল-গুলিস্তান এলাকায় মিলিয়ে প্রতিদিন শতাধিক অস্থায়ী দোকান এ ব্যবসায় যুক্ত। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে কেনাবেচা।
দোকানের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকছেন ক্রেতারা। কেউ পুরো বান্ডিল কিনছেন, কেউ ছোট নোট খুঁজছেন। দরদাম হচ্ছে খোলামেলাভাবে। পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে, অনেকের কাছেই এটি আর ‘অবৈধ’ বলে মনে হয় না।
একজন ক্রেতার ভাষায়, ‘ব্যাংকে না পেলে এখানে আসতেই হয়। এখন এটা নিয়মিত বাজারের মতো।’
ব্যাংকে সংকট, ফুটপাতে প্রাচুর্য
ক্রেতাদের অভিযোগ, ব্যাংকে নতুন নোট পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ, ফুটপাতের বাজারে রয়েছে বিপুল সরবরাহ। নূরে আলম নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, ‘ব্যাংকে গিয়ে নতুন নোট না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মতিঝিলের ফুটপাত থেকে বাড়তি দামে কিনতে হয়েছে।’
নারায়ণগঞ্জের চিত্রও একই। সেখানে দুই টাকার একটি বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩৫০ টাকায়, ১০ টাকার বান্ডিল ৪০০ টাকায়, ৫০ টাকার বান্ডিল পাঁচ হাজার ৩০০ টাকায়। অর্থাৎ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই বেশি নেওয়া হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রতিবছর নতুন নোট ছাপাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। এ বিপুল ব্যয় সাশ্রয় এবং ধীরে ধীরে ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার নীতির অংশ হিসেবেই চলতি বছর ঈদে নতুন নোটের সরবরাহ কমানো হয়েছে। তবে, ঈদকে ঘিরে নতুন নোটের চাহিদা কমেনি। ফলে সরবরাহের ঘাটতির সুযোগে ফুটপাতে নতুন নোটের বেচাকেনা আগের চেয়ে বেড়ে থাকতে পারে।’
আইনের চোখে অপরাধ, বাস্তবে স্বাভাবিকতা
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, মুদ্রা বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া বা মুদ্রাকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করা বেআইনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘নতুন নোট কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি উৎসবকে ঘিরে নতুন নোটের স্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হয়। তবে, এ চাহিদাকে কেন্দ্র করে যাতে অনৈতিক ব্যবসা গড়ে না ওঠে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। নতুন নোটের প্রতি অতি আকর্ষণ থেকে সরে এসে ধীরে ধীরে ক্যাশলেস বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হওয়াই সময়ের দাবি।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ‘নতুন নোট কোনও পণ্য নয় যে তা বাজারে বিক্রি হবে। এটিকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে কেউ জড়িত থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’ তবুও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই-এই বৈপরীত্যই বাজারটিকে টিকিয়ে রেখেছে।
‘নীরব ভূমিকা’ নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নোট সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন এ বাজার তৈরির অন্যতম কারণ। আগে ঈদ উপলক্ষে ব্যাংকগুলোতে বিশেষ কাউন্টারের মাধ্যমে নতুন নোট বিতরণ করা হতো। এতে সাধারণ মানুষ সহজেই নতুন নোট পেতেন। কিন্তু, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ব্যবস্থা সীমিত হয়ে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে নোট সরবরাহ করলেও সরাসরি জনসাধারণের কাছে বিতরণের কার্যকর ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে, তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘কৃত্রিম সংকটের ধারণা’, যা সুযোগ করে দিয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী চক্রকে।
সংগঠিত নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত
মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এ ব্যবসা বিচ্ছিন্ন নয়-বরং একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। কারণ, বিপুল পরিমাণ নতুন নোটের ধারাবাহিক জোগান, নির্দিষ্ট এলাকায় বাজারের ঘনত্ব ও প্রায় একই হারে মূল্য নির্ধারণ।
এসবই ইঙ্গিত দেয়, এর পেছনে একটি সমন্বিত সরবরাহ চেইন কাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকিং চ্যানেলের ভেতর থেকেই কোনোভাবে নতুন নোট বের হয়ে এ বাজারে আসছে।
চাহিদার অর্থনীতি বনাম নীতিগত দুর্বলতা
ঈদে সালামি দেওয়ার সংস্কৃতি, শিশুদের খুশি করা, সামাজিক মর্যাদা-সব মিলিয়ে নতুন নোটের চাহিদা প্রতি বছরই বাড়ে। অর্থনীতির ভাষায়, এটি একটি মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধি বা ‘সিজনাল ডিমান্ড স্পাইক’। কিন্তু, এ চাহিদা মোকাবিলায় যদি প্রাতিষ্ঠানিক সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই অনানুষ্ঠানিক বাজার গড়ে ওঠে। বর্তমানে সেটিই ঘটছে।
নগর অর্থনীতির বিকল্প রূপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নোটের এ বাজার কেবল অবৈধ লেনদেন নয়-এটি নগর অর্থনীতির একটি বিকল্প চিত্র। এখানে চাহিদা, সরবরাহ ও মুনাফা-সবই কাজ করছে বাজারনীতির নিয়মে, তবে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে।
এই ‘ফুটপাত অর্থনীতি’ মূলত তিনটি কারণে টিকে আছে। সেগুলো হলো- প্রাতিষ্ঠানিক সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, নজরদারির ঘাটতি ও শক্তিশালী সামাজিক চাহিদা।
সময়ের আলো/এনএ