বেশ কয়েক বছর পর এবার একরকম স্বস্তির পরিবেশে ঈদ উদযাপন হতে যাচ্ছে দেশে। জাতীয় নির্বাচনের পর এখন নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এ জন্য এবারের রোজার শুরু থেকে আজ অবধি ঈদ বাজারকে ঘিরে বেশ উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। আর এই উৎসবের ঈদ বাজারকে ঘিরে দেশের অর্থনীতির পালেও বেশ হাওয়া লেগেছে। বলা যায়, একরকম স্থবির থাকা অর্থনীতির চাকা সচল করে দিল ঈদের বাজার। কেননা, এই ঈদকে ঘিরে রাজধানী থেকে শুরু করে শহর, নগর ও একেবারে গ্রাম পর্যায়ের অর্থনীতিতেও একটা চাঞ্চল্য ভাব চলে এসেছে।
রোজার একেবারে শুরু থেকেই সারা দেশের মার্কেট-বিপণিবিতানে জমে ওঠে বিকিকিনি। এতে অর্থনীতিতে নগদ টাকার প্রবাহ বেড়েছে। রোজা এবং ঈদকে ঘিরে প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন দেদার, ফলে রেমিট্যান্স বাড়ছে তড়িৎ গতিতে। সরকারি-বেসিরকারি চাকরিজীবীদের বেতনের সঙ্গে এ মাসে বাড়তি যুক্ত হয়েছে ঈদ বোনাস। অর্থনীতি চাঙ্গা করতে এটিও অবদান রাখছে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত ৬ বছরের মধ্যে ৩ বছর গেছে করোনার ধাক্কা। এ জন্য ওই ৩ বছরের ঈদ বাজার কেটেছে মন্দায়। কারণ মহামারি করোনা সবকিছু থমকে দিয়েছিল। সর্বশেষ গত বছর ব্যবসায়ীরা মোটামুটি ব্যবসা করেছেন। তবে এবারের ঈদকে ঘিরে বেশ রমরমা বাণিজ্যের প্রত্যাশা ছিল ব্যবসায়ীদের। তার নমুনাও দেখা গেছে এবারের রোজার শুরু থেকেই। কারণ একেবারে প্রথম রোজা থেকেই এবার ঈদ বাজার জমে উঠেছে। আর এই ঈদ বাজারকে ঘিরেই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতি।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা এবারের ঈদ বাজারে আড়াই লাখ থেকে পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে। এর মধ্যে শুধু পোশাকের বাজারেই লেনদেন হতে পারে ৮০-৯০ হাজার কোটি টাকার। এ ছাড়া নিত্যপণ্যের বাজারে লেনদেনের প্রত্যাশা ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকার। এর বাইরে রয়েছে ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী, মিষ্টির বাজার, বিনোদন ও পরিবহন খাতেও বাড়তি অর্থ যোগ হচ্ছে। পাশাপাশি যুক্ত হবে সাড়ে ১২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বোনাস।
শুধু তাই নয়, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আরও প্রায় দেড় কোটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বোনাস যুক্ত হবে ঈদ বাজারে। এ ছাড়া দোকান কর্মচারী, পোশাক ও বস্ত্র খাতের শ্রমিকসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রমজীবীর বোনাসও এই কর্মকাণ্ডে যোগ হয়। উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন খাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঘন ঘন হাতবদল হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন বাড়ে, তেমনি চাঙ্গা হয় গোটা অর্থনীতি।
প্রতি বছর ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়ে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হিসাব মতে রোজা শুরু এক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় ঈদের কেনাকাটা। আর রোজার শুরু থেকে একেবারে ঈদের দিন পর্যন্ত এবং ঈদের পরও প্রায় এক সপ্তাহ ঈদ বাণিজ্যের আবহ থাকে। সব মিলে এই সময়ে অর্থনীতিতে আড়াই থেকে পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্য হবে বলে আশা ব্যবসায়ীদের।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি হেলাল উদ্দিন এফবিসিসিআইর এক সমীক্ষার তথ্য উল্লেখ করে বলেন, রোজার ঈদকে ঘিরে মূলত ২ লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। আর এবারের রোজার ঈদে সেটি ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে শুধু পোশাকের বাজারেই যোগ হবে ৮০ থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা। নিত্যপণ্যের বাজারে বাড়তি যোগ হচ্ছে ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকা।
ধনী মানুষের দেওয়া জাকাত ও ফিতরা বাবদ আসছে প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা। পরিবহন খাতে অতিরিক্ত বাণিজ্য ১ হাজার কোটি টাকা। ঈদকে কেন্দ্র করে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া আয়ের হিসাবে সাড়ে ১২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর, ৬০ লাখ দোকান কর্মচারী, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের বোনাস। যা ঈদ অর্থনীতিতে আসে।
এছাড়া আরও রয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের টাকা। ঈদের সময়ে প্রবাসীরা তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে বাড়তি ব্যয় মেটাতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে থাকেন। এর সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবী ও বেসরকারি খাতের বোনাস যুক্ত হবে অর্থনীতিতে। প্রায় ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিকের বেতন-বোনাস যুক্ত হবে এবার।
ভোগ্যপণ্যের বাজার : ঈদে সব ধরনের নিত্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বিশেষ ভোজ্য তেল, মাংস, চিনি, ডাল, সেমাই এবং পেঁয়াজ উল্লেখযোগ্য। ফলে এসব পণ্যের আমদানিও বাড়ে। রোজা ও ঈদে ভোজ্য তেলের চাহিদা হচ্ছে প্রায় আড়াই লাখ টন, চিনি সোয়া ২ লাখ টন থেকে পৌনে ৩ লাখ টন, ডাল ৬০ হাজার টন, ছোলা ৫০ হাজার টন, খেজুর ১৩ হাজার টন, পেঁয়াজ ৩ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন, রসুনের চাহিদা প্রায় ৮০ হাজার টন। এসব পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের নিজস্ব টাকার পাশাপাশি ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকার জোগান দেওয়া হয়।
দোকান কর্মচারী বোনাস : ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে সারা দেশের দোকান কর্মচারীদের বোনাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে দেশে ২৫ লাখ দোকান, শপিংমল, বাণিজ্য বিতান রয়েছে। গড়ে একটি দোকানে ৩ জন করে ৬৫ লাখ জনবল কাজ করছে। সংগঠনটির হিসাবে নিম্নে একজন কর্মীকে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বোনাস দেওয়া হয়। ওই হিসাবে গড়ে বোনাস ৮ হাজার টাকা ধরে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বোনাস দেওয়া হয়।
দেশে প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদযাপনে লাখো কোটি টাকার নগদ লেনদেন হয় শুধু নতুন পোশাক ও বিশেষ খাদ্যসামগ্রী ক্রয়ে, এক-অষ্টমাংশ মানুষের স্বজনদের সঙ্গে যোগ দিতে যাতায়াতে, গরিব ও অসহায়দের মধ্যে জাকাত বিতরণে এবং বেতনের সমপরিমাণ বোনাস বিতরণে। বাজারে একসঙ্গে নগদ টাকার এত চাহিদা বাড়ে যে গ্রাহকের দাবি মেটাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কল মার্কেট থেকে কঠিন সুদে টাকা জোগাড়ে নামতে হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তার নগদ নতুন নোটের খাজাঞ্চিখানার দুয়ার খুলে দিতে হয়।
বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতিশীলতা আসে। ব্যাংকিং খাতে লেনদেন বাড়ে ব্যাপক হারে। ব্যাংকিং খাতে লেনদেন বেড়েছে ব্যাপক হারে। ঈদের কেনাকাটায় এটিএম বুথে প্রতিদিন শত কোটি টাকার বেশি উত্তোলন করছে গ্রাহকরা। এ ছাড়া মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। মোবাইলে লেনদেন প্রতিদিনই বাড়ছে।
দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা ও যানজটের ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দেশের অনলাইন বাজার। নিত্যনতুন পণ্যের সমাহার, বিভিন্ন ছাড় ও উপহারের কমতি নেই ভার্চুয়াল এই বাজারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, ঈদ সামনে রেখে জমজমাট অনলাইনের ঈদের বাজারও। প্রতি বছরই বাড়ছে ঈদের সময় অনলাইনে কেনাকাটা। তাই এবার শুধু অনলাইনে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রির প্রত্যাশা রয়েছে।
ঈদের বাজারে সবচেয়ে বড় অংশজুড়েই রয়েছে বস্ত্র ও খাদ্যসামগ্রী। বস্ত্রের মধ্যে পায়জামা, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, শাড়ি, লুঙ্গি ও টুপি প্রধান। এরপর রয়েছে জুতা, প্রসাধনী, স্বর্ণালংকার। আর উচ্চবিত্তের জন্য রয়েছে স্বর্ণ, ডায়মন্ডের অলংকার ও গাড়ি। সবার জন্য অপরিহার্য হিসেবে রয়েছে সেমাই, চিনি, ছোলা, ডালসহ অনেক পণ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত এবং ঋণের অংশ হিসেবে গ্রামের অংশ শহরের তুলনায় অনেক কম। গ্রাম থেকে যতটুকু আমানত নেওয়া হচ্ছে, তার অর্ধেক বিনিয়োগ হচ্ছে শহরে। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে এ চিত্র একেবারে উল্টে যায়। শহরের মানুষ হয় গ্রামমুখী। আর সারা বছর স্তিমিত হয়ে থাকা গ্রামের হাট-বাজার কয়েক দিনের জন্য দারুণ চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
ঈদ বাজার সম্পর্কে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, আমরা খুবই আশাবাদী এবারের ঈদকে ঘিরে। কারণ গত কয়েক বছরের অস্থিরতা কাটিয়ে দেশে এখন একটি নির্বাচিত ও স্থিতিশীল সরকার আছে। একটা স্থিতিশীল সরকার আমরা যারা ব্যবসা করি তাদের জন্য খুবই সহায়ক হয়। এ জন্য এবার রোজার একেবারে শুরু থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ছোট-বড় দোকান, শপিংমল থেকে শুরু করে একেবারে ফুটপাথের ব্যবসায়ীদের দোকান পর্যন্ত কেনাকাটায় মুখর হয়ে ওঠে।
ব্যবসায়ীরাও এবার আগে থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন ঈদ বাজারকে ঘিরে। করোনার পর থেকে গত কয়েকটি বছর প্রত্যাশা অনুযায়ী ঈদ বাজার জমেনি, ব্যবসায়ীরাও ভালো ব্যবসা করতে পারেনি। এ বছর একেবারে শুরু থেকে ঈদ বাজার জমে ওঠায় আমরা আশা করছি এবার ঈদ বাজারে আড়াই লাখ কোটি টাকা থেকে প্রায় পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি বাণিজ্য হবে। অর্থনীতিদিরাও মনে করছেন এবারের ঈদ অর্থনীতি অনেক চাঙ্গা এবং ইতিমধ্যেই বেশ জমে উঠেছে।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, বছরের দুটি ঈদ দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কুরবানির ঈদ জমে ওঠে পশুর বাজারকে ঘিরে, আর রোজার ঈদ জমে ওঠে পোশাক, কসমেটিকস থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্য। এতে জাকাত-ফিতরাও অনেক ভূমিকা রাখে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে বাড়ে টাকার প্রবাহ। ঈদকে ঘিরে রেমিট্যান্স চাঙ্গা হয়। গ্রামীণ অর্থনীতিও গতিশীল হয় ঈদকে ঘিরে। সুতরাং বলাই যেতে পারে, ঈদকে ঘিরে বেশ চাঙ্গা হয়েছে দেশের অর্থনীতি।
সময়ের আলো/আআ