পড়ে আছে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের বিপুল অর্থ

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

বিপুল পরিমাণ তহবিল থাকার পরও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির বাইরে থেকে যাচ্ছেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা। প্রচার কার্যক্রমের অভাবসহ

2026-03-19T07:01:02+00:00
2026-03-19T07:01:02+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
পড়ে আছে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের বিপুল অর্থ
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬, ৭:০১ এএম   (ভিজিট : ৯৬)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বিপুল পরিমাণ তহবিল থাকার পরও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির বাইরে থেকে যাচ্ছেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা। প্রচার কার্যক্রমের অভাবসহ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পুলিশের গাফিলতিকে এ জন্য দায়ী বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সড়ক পরিবহন আইন অনুসারে, আর্থিক সহায়তা পেতে নির্ধারিত ফরমে দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণের দাবি মীমাংসার জন্য গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হয়। অনুসন্ধান কমিটি ৩০ দিনের মধ্যে আবেদনকারীর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রতিবেদন জমা দেবে। প্রতিবেদন দাখিলের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ট্রাস্টি বোর্ড আবেদনকারীর ব্যাংক হিসাবে ‘প্রাপকের হিসাবে প্রদেয়’ চেকের মাধ্যমে টাকা দেবে। 

অর্থাৎ, দুর্ঘটনার দুই মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। অধিকাংশ ভুক্তভোগীই জানেন না এই ক্ষতিপূরণের বিষয়ে। আবার সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণেও যৎসামান্য যে কয়জন ভুক্তভোগী আবেদন করেন নির্ধারিত সময়ে তারাও পান না ক্ষতিপূরণ।

দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণের দাবি মীমাংসার জন্য রয়েছে ১২ সদস্যের একটি ট্রাস্টি বোর্ড। বিআরটিএর চেয়ারম্যান পদাধিকার বলে বোর্ডেরও চেয়ারম্যান। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিকরা বোর্ডের সদস্য।

দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণের বিষয়ে তদন্ত করে সুপারিশের জন্য ১৪ সদস্যের স্থায়ী কমিটি রয়েছে। ঢাকার বাইরে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমিটির প্রধান। বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট সহকারী পরিচালক সদস্য সচিব। পুলিশ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে আছেন।

ভুক্তভোগী ও অধিকার কর্মীদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা শোকের মধ্যে থাকেন। তাদের পক্ষে ৩০ দিনের মধ্যে সব প্রয়োজনীয় কাগজ জোগাড় করে তা জমা দেওয়া কঠিন। এ ছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পর জেলা প্রশাসকেরও অনুমোদন নিতে হয়। এই দুই পদের কর্মকর্তারা নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। ফলে সময়মতো ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা কঠিন হয়।

অধিকার কর্মীদের মতে, অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার পর মামলা হয়। অন্ততপক্ষে পুলিশের নজরে আসে। তাই বিআরটিএ, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন আবেদনের বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে এলে আরও বেশি মানুষ ক্ষতিপূরণ পেতে পারে। তবে বাস্তবে এমনটা হয় না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের (নিসআ) সাধারণ সম্পাদক তানজীদ মো. সোহরাব রেজা বলেন, ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির জন্য ভুক্তভোগীদের ৩০ দিনের মধ্যে আবেদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একইসঙ্গে আইনে বলা আছে এই আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করা হয় না। তিনি এ জন্য বিআরটিএ এবং পুলিশের গাফিলতিকে দায়ী বলে মনে করেন। 

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বুয়েটসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গা থেকে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে বিআরটিএ এবং পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর পরও তাদের স্বাক্ষর পেতে কখনো কখনো এক থেকে দুই সপ্তাহও লেগে যায়। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ দুর্ঘটনার পর খুব দ্রুত অর্থের প্রয়োজন হয়। ট্রাস্টি বোর্ডকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিলে এসব আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তিনি।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে তারা দেখতে পেয়েছেন এক মাসে ক্ষতিপূরণের জন্য ২০টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ১৮টি আবেদনই বিআরটিএ সংশ্লিষ্টদের পরিচিতজন। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বাইরে এই ক্ষতিপূরণের তথ্য অনেকেরই জানা নেই।

বিআরটিএর তথ্যমতে, ক্ষতিপূরণ চালুর পর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশের পরিবারের সদস্যরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ১ দশমিক ৪২ শতাংশ ব্যক্তি।
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের উত্তরাধিকার ও আহতদের অনুকূলে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য তহবিল গঠন করার কথা বলা হয়েছে। এই তহবিল পরিচালনা করে একটি ট্রাস্টি বোর্ড। এ আইনের বিধিমালা ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর কার্যকর হয়।

সড়ক আইনের বিধিমালা কার্যকরের দিন থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের আবেদন জমা নেওয়া শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর ১৬২ জনকে আর্থিক সহায়তার চেক হস্তান্তরের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়া শুরু হয়। বিধিমালায় ট্রাস্টি বোর্ড গঠন, তহবিল সংগ্রহ, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ এবং তা বিতরণের পদ্ধতি সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। নিহত বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা গেলে ভুক্তভোগী ব্যক্তির পরিবার ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা পাবে। 

গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গহানি হলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি পাবেন তিন লাখ টাকা। আহত কারও চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা না থাকলে আর্থিক সহায়তা তিন লাখ টাকা। তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকলে পাবেন এক লাখ টাকা। ট্রাস্টি বোর্ড পরিচালিত হয় বিআরটিএ কার্যালয় থেকে।

ট্রাস্টি বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৬৬৮টি চেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৪০৫ জন নিহতের পরিবার। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন ২৬৩ জন। সব মিলিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে ৭৪ কোটি ২২ লাখ টাকা।  

ট্রাস্টি বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত তহবিলে জমা ছিল ২৫৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এসব টাকা সব ধরনের যানবাহন মালিকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

ঢাকা আহছানিয়া মিশনের রোড সেফটি প্রকল্পের সমন্বয়কারী শারমিন রহমান বলেন, ক্ষতিপূরণ পেতে অন্তত আধা ডজন নথিপত্র (যেমন- জিডির কপি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, চিকিৎসা সনদ ইত্যাদি) জমা দিতে হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।

নিয়ম অনুযায়ী দুর্ঘটনা ঘটার ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হতো। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই সময়ের মধ্যে শোক কাটিয়ে উঠে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। বর্তমানে এই সময়সীমা বাড়িয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে।
অধিকাংশ ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবারের সদস্যরা জানেনই না যে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর অধীনে বিআরটিএ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

২০২৪ ও ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, তহবিলের একটি বড় অংশ এখনও অব্যবহৃত রয়েছে। তহবিলে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বেশি জমা থাকলেও দুর্ঘটনায় নিহতদের মাত্র ৯.৮৬% এবং আহতদের মাত্র ১.৪২% পরিবার এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পেয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তরিকুল ওমরের বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যানুযায়ী, গত বছর ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮১২ জন।

এছাড়া ২০২৫ সালে পবিত্র ঈদুল ফিতরের ১৫ দিনে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৩৪০টি দুর্ঘটনায় ৩৫২ জন নিহত হয়েছেন বলে জানায় যাত্রী কল্যাণ সমিতি। তারা আরও জানায়, দুর্ঘটনায় ৮৩৫ জন আহত হয়েছেন।

সময়ের আলো/আআ




  বিষয়:   সড়ক  দুর্ঘটনা  ক্ষতিপূরণ  অর্থ 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: