ভোল পাল্টে দেশে ফিরতে মরিয়া ডা. জোনাইদ শফিক

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগ মাথায় নিয়ে দুবাইয়ে বিলাসী জীবনযাপন করছেন অধ্যাপক ডা. জোনাইদ শফিক। ২০২৪

2026-03-19T16:18:30+00:00
2026-03-19T16:18:30+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
ভোল পাল্টে দেশে ফিরতে মরিয়া ডা. জোনাইদ শফিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬, ৪:১৮ পিএম   (ভিজিট : ১১০)
অধ্যাপক ডা. জোনাইদ শফিক। সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের আর্থিক খাতে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগ মাথায় নিয়ে দুবাইয়ে বিলাসী জীবনযাপন করছেন অধ্যাপক ডা. জোনাইদ শফিক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে জোনাইদ শফিকের শত শত কোটি টাকার আর্থিক অপরাধের তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। শুধু এক নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের নামে পুঁজিবাজার এবং ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। 

নির্বাচনে বিএনপির সরকার গঠনের পর ভোল পাল্টে জোনাইদ এখন নিজেকে ‘বিএনপিপন্থি’ চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে দেশে ফিরতে মরিয়ে হয়ে উঠেছেন। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের যোগসাজশে দেশে ফিরে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলায় আত্মসমর্পণ করে দ্রুত জামিন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন তিনি।

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আপন মামাতো ভাই এবং এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের আপন খালাতো ভাই ডা. জোনাইদ শফিক। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির অন্যতম হোতা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান শিবলি রুবাইয়াত এবং শেয়ার কারসাজির অন্যতম হোতা আবুল খায়ের হিরুরও ঘনিষ্ঠ ছিলেন জোনাইদ। 

এই দুজনের সঙ্গে যোগসূত্র করে আওয়ামী আমলে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, পিপলস ব্যাংক এবং ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মতো বিভিন্ন আর্থিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়ে আওয়ামী অলিগার্কে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। এদের মধ্যে শিবলি রুবাইয়াত বর্তমানে কারাগারে এবং আবুল খায়ের হিরু পলাতক। এক সময় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবিএল) চেয়ারম্যান ছিলেন সাইফুজ্জামানের স্ত্রী রুকমীলা জামান এবং পরিচালক ছিলেন জোনাইদ নিজে।

অভিযোগ রয়েছে, মেডিকেল প্র্যাকটিসের আড়ালে ব্যাংকিং খাতের এই পরিচয় এবং দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বজন হিসেবে আওয়ামী আমলে দেশের আর্থিক খাত স্রেফ লুটেপুটে খেয়েছেন জোনাইদ। ইউসিবিএল থেকে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) করা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি ডা. জোনাইদ। নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) থাকাকালে দেশের পুঁজিবাজার এবং ব্যাংকিং খাত থেকে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি উঠিয়েছিলেন জোনাইদ। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর দুবাইয়ে পালিয়ে যাওয়ার পূর্বে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের ৫৪০ কোটি টাকা ঋণ রেখে যান জোনাইদ।

এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হসপিটাল এবং জাপান-বাংলাদেশ রিটায়ারমেন্ট হোমেরও এমডি ডা. জোনাইদ। প্রতিষ্ঠান দুটির মূল উদ্যোক্তা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক সরদার এ নাঈমের অগোচরে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১২০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়েছেন তিনি। একটি প্রকল্পের কার্যাদেশের বিপরীতে পরিচালক পদে থাকা নিজের ইউসিবিএলসহ অন্তত তিনটি ব্যাংক থেকে এই ঋণ নেন। এর মধ্যে এনআরবিসি থেকে নেওয়া ৭০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে অন্তত ১৯ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। অথচ কার্যাদেশের মূলকাজ সম্পন্ন না করেই লোনের সিংহভাগ অর্থ ব্যক্তিগত খাতে খরচ করেছেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় বসবাসরত দুই মেয়ের কাছে প্রায় দেড় মিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন।

এ বিষয়ে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এবং জাপান-বাংলাদেশ রিটায়ারমেন্ট হোমের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সরদার বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে তার মাঝে অসততা দেখিনি। তিনি একজন ভালো চিকিৎসক, কিন্তু কতিপয় ব্যক্তির প্ররোচনায় আর্থিক খাতে জড়িয়ে ভিন্ন ধারায় চলে যান। আমরা সবাই সেই ব্যক্তিদের পরিচয় জানি।’

এমন অসংখ্য অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ডা. জোনাইদসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে তদন্তে নামে দুদক। এমন দুটি মামলায় অপরাধের সঙ্গে শফিকের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ায় আদালতে চার্জশিট জমা হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন ওই দুই মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে শফিকের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে জোনাইদ শফিক, তার স্ত্রী মাসুমা পারভীন এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটি (বিএফআইইউ)। 

এছাড়া আরও অন্তত ২৬টি মামলার তদন্ত চলছে শফিকের বিরুদ্ধে। অবশ্য আইনের হাতে ধরা পড়ার আগেই ৫ আগস্টের পর সুবিধাজনক সময়ে দেশ ছেড়ে পালান ডা. জোনাইদ। জোনাইদের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রের দাবি, দেশে এসে এখন বিএনপিপন্থি সেজে পূর্বের মতো আবারও আর্থিক খাতের অলিগার্ক হতে চাইছেন তিনি।

জানা গেছে, জোনাইদ ইতিমধ্যে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) উচ্চ পর্যায়ের নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। গত ৩০ জানুয়ারি হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া এক বার্তায় নিজেকে বিএনপিপন্থি জাহির করতে ১৫ পয়েন্টের ফিরিস্তি দিয়েছেন জোনাইদ। এরগুলোর মধ্যে ১৯৯৩ সালে বিএনপি শাসনামলে পিজি হাসপাতালে যোগদান, ১৯৯৫ সালে ড্যাবে যোগদান, ১৯৯৭ সালে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে চিকিৎসা দেওয়া, ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী জিয়াকে চিকিৎসা দেওয়া অন্যতম। 

এছাড়া ১৫টি ফিরিস্তিতে বিএনপির পক্ষে কাজ করার কিছু মিথ্যা ও ভুল তথ্যও দিয়েছেন ডা. জোনাইদ। তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এসব ফিরিস্তির মাধ্যমে বিএনপিপন্থি চিকিৎসক পরিচয়ে দেশে ফেরার সবুজ সংকেত প্রত্যাশা করছেন ডা. জোনাইদ।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে দেশের বাইরে পলাতক ডা. জোনাইদ শফিকের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   ডা. জোনাইদ শফিক  দুর্নীতি  ব্যাংক  পুঁজিবাজার 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: