তেল প্যানিকে লম্বা লাইন

এম মামুন হোসেন

জাতীয়

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেবে। ভবিষ্যতে তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে এমন

2026-03-25T00:23:24+00:00
2026-03-25T00:23:24+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
তেল প্যানিকে লম্বা লাইন
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ১২:২৩ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেবে। ভবিষ্যতে তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে এমন প্যানিকে আগেভাগে তেল সংগ্রহ করতে পাম্পে ছুটছেন অনেকেই। এই আকস্মিক চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পাম্পগুলো। অতিরিক্ত তেল সংগ্রহে দেশের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। 

পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের সরবরাহ না থাকায় বহু ফিলিং স্টেশন বন্ধ হয়ে পড়েছে, ফলে যানবাহন চালক ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে হাতাহাতি, মারামারি করছেন চালকরা। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক পাম্পে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন গাড়িচালক ও মোটরসাইকেল আরোহীরা।

পাম্প মালিকদের দাবি, দেশে তেলের কোনো ঘাটতি নেই কিন্তু গুজবের কারণে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গেছে। অতিরিক্ত চাহিদার তেল ডিপো থেকে দেওয়া হচ্ছে না, তাই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশে তেল প্যানিক ছড়িয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

পেট্রোল পাম্পগুলোতে অযথা দীর্ঘ লাইন না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। 

তিনি বলেন, ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল আছে। পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী তেল নেওয়ার জন্য জনগণকে আহ্বান জানান মন্ত্রী।

ঈদের ছুটি শেষে মঙ্গলবার রাজধানীতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরতেই তেল নিয়ে বিপাকে পড়েন নগরবাসী। সরকারি-বেসরকারি সব অফিস-আদালত খোলার দিনে রাজধানীর তেজগাঁও, মহাখালী ও বিজয় সরণি এলাকার এলাকায় একাধিক পেট্রোল পাম্প বন্ধ ছিল। ফলে জ্বালানি নিতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকরা।

সকাল থেকে এসব এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পে তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কোথাও কোথাও পাম্প খোলা থাকলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। এতে অফিসগামী মানুষসহ সাধারণ চালকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে।

পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের অপেক্ষায় থাকা মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকরা জানান, ঈদের ছুটির পর হঠাৎ করে গাড়ির চাপ বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানির চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর মতিঝিল, তেজগাঁও, মহাখালী ও বিজয় সরণি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার ফিলিং স্টেশনে তেল দেওয়া বন্ধ রেখেছে। রাজধানীর আরামবাগের এইচ কে ফিলিং স্টেশন মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ঈদের পর থেকেই তেল সরবরাহ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। 

গতকাল বিকালে তেল নেওয়ার আশায় শত শত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালক ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে লাইন ছেড়ে বিকল্প ফিলিং স্টেশনের খোঁজে ছোটেন। 

অকটেনের জন্য লাইনে দাঁড়ানো সজীব আহমেদ বলেন, তেল নিতে এসেছি দুপুরে। এসে শুনি পাম্পে তেল নেই। ডিপো থেকে তেল এলেই বিক্রি করা শুরু হবে। তেলের আশায় দুই ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি।

সময়ের আলোর চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে চলমান জ্বালানি তেল সংকট আরও বেড়েছে। ঈদের আগে শুরু হওয়া সংকট মঙ্গলবারও অব্যাহত ছিল। নগরীর বেশিরভাগ পেট্রোল পাম্প বন্ধ। অনেকে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করে চাহিদা অনুযায়ী পাননি। কোনো কোনো পাম্পে অকটেন থাকলেও নেই ডিজেল। আবার কোনো পাম্পে ডিজেল থাকলেও নেই অকটেন। 

তেল কোম্পানির কর্মকর্তারা বরাবরের মতো দাবি করছেন, তেলের সংকট নেই। 

আর পাম্প মালিকরা বলছেন, ডিপো থেকে জ্বালানি তেল দেওয়া হচ্ছে কম। তাই ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী তেল বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। 

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগে পেট্রোল পাম্প আছে ৩৮৩টি। আর এজেন্ট ডিস্টিবিউটর আছেন ৭৯৯ জন। প্যাকড পয়েন্ট ডিলার আছেন ২৫৫ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে পেট্রোল পাম্প আছে ৪৬টি, যার অধিকাংশই বন্ধ।

তেল কিনতে আসা অনেকে অভিযোগ করেন, সংকটের কারণে তেল ব্যবসায়ীরা কেউ তেল মজুদ করছেন। তাই পেট্রোল পাম্পগুলো থেকে চাহিদার সমান তেল দেওয়া হচ্ছে না। যাতে সংকটকে পুঁজি করে চড়া দামে বিক্রি করা যায়।

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বিভাগের সাবেক সভাপতি এহসানুর রহমান চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, জ্বালানি তেল চাহিদা অনুযায়ী মিলছে না। এ জন্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মজুদ করার তো কোনো সুযোগ নেই। পাম্পে সিসি ক্যামেরা আছে। তেল ট্যাঙ্কে ভর্তি করে পরে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কি না তা ক্যামেরা যাচাই করলে বোঝা যাবে।

পঞ্চগড়-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ৯৩ কিলোমিটারজুড়ে থাকা ৪৬টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৪৩টিই বন্ধ রয়েছে। একই চিত্র কুড়িগ্রামে। এ জেলার ২০টি স্টেশন সম্পূর্ণ তেলশূন্য দাবি করে বন্ধ রাখা হয়েছে। তেল না পেয়ে হাজার হাজার গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করে ফিরছেন। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরে যেসব পাম্প খোলা আছে, সেখানে তেল নিতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কোথাও কোথাও উত্তেজনা, হট্টগোল ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। 

অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি দামে বিক্রির আশায় তেল মজুদ করছেন।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, টানা কয়েক দিনের জ্বালানি সংকটের পর গাইবান্ধায় অবশেষে সীমিত পরিসরে তেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। তবে স্বস্তির বদলে নতুন শর্তে ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে মোটরসাইকেলে জ্বালানি নিতে এখন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে হেলমেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির বৈধ কাগজপত্র। এসবের কোনো একটি না থাকলেই মিলছে না তেল উলটো গুনতে হচ্ছে জরিমানাও।

তেল সংকটের কারণে অনেক জায়গায় পাম্পে উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। কুড়িগ্রামে একটি পাম্পে হামলার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিছু এলাকায় প্রশাসন নজরদারি বাড়িয়েছে এবং মজুদ যাচাইয়ে অভিযান চালাচ্ছে। 

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহীতে ৪৪টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি বন্ধ রয়েছে। বাকিগুলোতেও তেলের তীব্র সংকট চলছে। পাম্প মালিক সমিতির নেতারা জানান, ঈদের আগেই মজুদ শেষ হয়ে গেছে। ডিপো থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

ময়মনসিংহ, বগুড়া, রংপুর ও খুলনায় অধিকাংশ পাম্প বন্ধ। ময়মনসিংহে ঈদের দিন থেকেই অধিকাংশ পাম্প বন্ধ। বগুড়ায় ৭২টির মধ্যে অন্তত ৩৫টি পাম্প বন্ধ রয়েছে। রংপুরে ৪০টির মধ্যে প্রায় ২০টি এবং খুলনায় ৩৬টির সবগুলোই সংকটে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দিনে কয়েক ঘণ্টা পাম্প চালু রেখে সীমিত তেল বিক্রি করা হচ্ছে। 

বরিশাল ব্যুরো জানায়, জ্বালানি সংকটের কারণে অধিকাংশ পাম্প দিনে দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা হচ্ছে। পর্যাপ্ত তেল না থাকায় খোলা রাখলেও দ্রুত মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক সময়ের আলোকে বলেন, দেশে পেট্রোল ও অকটেনের সংকট নেই। তবে গত দুদিনে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ট্যাঙ্ক ভরে তেল নেওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারের তিনটি ডিপো বাড়তি চাহিদার জোগান দিতে পারছে না। 

তিনি বলেন, মানুষ প্যানিকড হয়ে ভিড় করে তেল কিনছে। আসলে কিন্তু পেট্রোল-অকটেনের সংকট আগামী এক মাসের মধ্যে হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। যথেষ্ট তেল আছে। আর এটা লোকালি প্রডিউস হয়। 

তিনি বলেন, আগে ৫ শতাংশ মোটরসাইকেল ট্যাঙ্ক ফুল করে তেল নিত না। আর এখন শতভাগ মোটরসাইকেল ট্যাঙ্ক ফুল করে নিচ্ছে। গাড়ি ঢুকলেই ট্যাঙ্কি ফুল। একেকটা গাড়ির ট্যাঙ্ক ফুল করতে ৫০ থেকে ৫২ লিটার তেল লাগে। পাম্পের মজুদ দ্রুত ফুরানোর কারণে তাদের তেল আনতে ছুটতে হচ্ছে সরকারি ডিপোতে। কিন্তু বাড়তি চাহিদার কারণে সেখানে ট্যাঙ্ক লরির লাইন পড়ে গেছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়। পাম্পগুলো নিরাপত্তা দেওয়ার জোর দাবি জানান তিনি। 

 
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি এবং সরবরাহও কমায়নি। তাই পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন ধরে জ্বালানি তেল সংগ্রহের কোনো যৌক্তিকতা নেই। 

ইকবাল হাসান মাহমুদ আরও বলেন, আমি সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে আহ্বান জানাব যে আপনারা প্যানিক হবেন না এবং আপনারা প্রয়োজনের বেশি তেল ক্রয় করে অযথা অস্থিরতা তৈরি করবেন না। প্রয়োজনের বেশি তেল নিয়ে স্টক করলে ভিড় বাড়বে, লাইন বাড়বে। তেল নিয়ে কোনো সংকট হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   ইরান  ইসরায়েল  সংঘাত  যুক্তরাষ্ট্র  তেল 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: