জীবন নিয়ে শঙ্কায় তরুণরা

গোলাম মোস্তফা

জাতীয়

ঈদের পরের দিন বিকালে তিন বছরের মেয়ে জিন্নাতকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিলেন জাবেদুল ইসলাম। কিছু দূর যাওয়ার পরই একটি অটোরিকশার

2026-03-25T02:07:07+00:00
2026-03-25T02:07:07+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
জীবন নিয়ে শঙ্কায় তরুণরা
গোলাম মোস্তফা
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ২:০৭ এএম   (ভিজিট : ৬১)
প্রতীকী ছবি
ঈদের পরের দিন বিকালে তিন বছরের মেয়ে জিন্নাতকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিলেন জাবেদুল ইসলাম। কিছু দূর যাওয়ার পরই একটি অটোরিকশার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। তাতে মোটরসাইকেল উল্টে রাস্তায় পড়ে যান বাবা-মেয়ে। ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কেউ মারা না গেলেও গুরুতর আহত হন বাবা-মেয়ে দুজনই। মেয়ে কিছুটা কম আঘাত পেলেও বাবা জাবেদুলের ডান পায়ের হাড় পুরোপুরি ভেঙে গেছে। এ ছাড়া মাথা, হাত ও পেটে আঘাত পেয়েছেন। 

প্রথমে তাদের স্থানীয় চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দুজনকে ভর্তি করা হলেও অবস্থা খারাপ হওয়ার জাবেদুলকে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) বা পঙ্গু হাসপাতাল পাঠানো হয়। ঈদের পরের থেকেই তিনি হাসপাতালের ক্যাজুয়াল ব্লকের এক নম্বর ফ্লোরে শুয়ে কাতরাচ্ছেন। তার পায়ে লোহার রড লাগানো হয়েছে। পাশেই বসা মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন স্ত্রী রোজিনা আক্তার।

স্বামীর জন্য দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ডাক্তার জানিয়েছেন, আমার স্বামীর পায়ের হাড় ভেঙে গেছে। এরই মধ্যে ডাক্তার এক্স-রেসহ বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছেন। পা কেটে ফেলতে হবে কি না পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা।

এ সময় রোজিনা আক্ষেপ করে বলেন, জানি না কপালে কী আছে। আমার স্বামীর সামান্য আয়েই আমাদের সংসার চলে। এখন যদি পা কেটেই ফেলতে হয় তা হলে পঙ্গু হয়ে সারাজীবন কাটাতে হবে। একজন স্ত্রীর জীবনে এর চেয়ে কষ্ট আর কী হতে পারে?

তাদের পাশেই শুয়ে আছে নরসিংদীর ১৮ বছরের তরুণ জুবায়ের হোসেন। সে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ঈদের দিন বড় ভাইয়ের মোটরসাইকেল নিয়ে বেড়াতে বের হয়ে দুর্ঘটনা হয়েছে। তার ডান পা ভেঙে গেছে। এ ছাড়া মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পেয়েছে। তার পুরো শরীরে ব্যান্ডেজ। শরীরের অসহ্য ব্যথা নিয়ে জোরে কান্না করছিল। তার চিৎকারে যেন হাসপাতালের চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। 

শুধু এ দুই রোগী কিংবা স্বজন নয়, ঈদের ছুটিতে শিশু থেকে বয়স্ক সব বয়সি মানুষ এসেছেন নানা ধরনের আঘাত পেয়ে, আহত হয়ে। কারও হাত ভাঙা, কারও পা। আবার কেউ এসেছেন ছোটখাটো আঘাত নিয়ে। আহতদের বেশিরভাগই মোটরবাইক দুর্ঘটনার শিকার, আবার কেউ কেউ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, গাড়ি দুর্ঘটনায় বা অন্য কোনো কারণে আহত হয়েছেন। কোনো কোনো রোগীর হাত-পা কেটে ফেলার মতো অবস্থাও রয়েছে। আহতদের বেশিরভাগই বয়সে তরুণ।

মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের ছুটি শেষ হলেও জরুরি বিভাগে প্রতি ঘণ্টায় এমন বহু রোগী আসছেন হাসপাতালে। 

এ ছাড়া ঈদের ছুটিতে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে পা ফেলার মতো কোনো জায়গা নেই। 

হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে এক্স-রে রুম, টিকেট কাউন্টার, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ডাক্তারের রুমের সামনেও দীর্ঘ লাইন। যাদের অনেকে ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। এক হাজার শয্যার হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি নেই। আবার শয্যা না পেয়ে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝেতে থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে রোগীদের। তাদের সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা।

পঙ্গু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদের আগে ও পরে গত সাত দিনে ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এক হাজার ৭৩৮ জন রোগী জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন, যা দৈনিক গড়ে প্রতিদিন প্রায় আড়াইশ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে গত সাত দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৪৬ জন। আর মোট দুর্ঘটনার মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ৩০০ জন। অর্থাৎ মোট আহতের মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশই মোটরবাইক দুর্ঘটনায় আহত।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ঈদের আগে ও পরে গত ১৭ মার্চ জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন ২৩৯ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ৬১ জনকে, ১৮ মার্চ আসা ২৩৭ জনের মধ্যে ভর্তি করা হয় ৬৮ জনকে, ১৯ মার্চ ২৪০ জনের মধ্যে ভর্তি হন ৭২ জন, ২০ মার্চ ২১৩ জনের মধ্যে ভর্তি হন ৬৫ জন, ২১ মার্চ ২৬৬ জনের মধ্যে ভর্তি হন ৯১ জন, ২২ মার্চ ২৯০ জনের মধ্যে ভর্তি হন ৯৬ জন এবং ২৩ মার্চ ২৫৩ জনের মধ্যে ভর্তি হন ৯৩ জন রোগীকে।

হাসপাতালে ক্যাজুয়াল ব্লক-২-এ বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছিলেন মন্টু সরকার। তার বাড়ি রাজবাড়ীতে। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ঈদের আগের দিন একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পেছন থেকে আমার বাইকে ধাক্কা দেয়। এতে পড়ে গিয়ে ডান পা ভেঙে গেছে। এ ছাড়া থুঁতনি ও ঠোঁট কেটে গেছে, হাতেও আঘাত লেগেছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রড লাগাতে হবে। তবে তার পা কেটে ফেলতে হবে কি না তা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে তার পরিবার। কারণ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় ভবিষ্যতে তার পরিবার কীভাবে চলবে দুঃশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।

প্রাণে বাঁচলেও সারাজীবনের মতো পঙ্গু হওয়ার শঙ্কায় ভুগছেন আরেক রোগী জাহেদা খাতুন। তিনি ঈদের দিন মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার সময় শেওড়াপাড়া এলাকায় বাংলাদেশের ‘টেসলা’ খ্যাত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে পড়ে যান। ঈদের দিন থেকেই কাটছে হাসপাতালের শয্যায়। পরিচিত মানুষ দেখলে তিনি শুধু কাঁদেন।

মঙ্গলবার জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন মোজাম্মেল হোসেন নামের এক তরুণ। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, বনানী এলাকায় আমি মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলাম। উল্টো দিক থেকে আসা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা আমার মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। পড়ে গিয়ে আমার হাত ভেঙে যায়। তিনি দাবি করেন, দোষ ওই অটোরিকশাচালকেরই ছিল। কিন্তু হাত ভাঙল আমার। এখন এর দায় কে নেবে? 

নিটোরের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. তানভীর আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, ঈদের সময় প্রতি বছরই বিভিন্ন দুর্ঘটনায় রোগীর চাপ বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। 

দেখা গেছে, বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে মোটরসাইকেল কিংবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজি কিংবা টমটমের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালানোর কারণেই দুর্ঘটনাগুলো হচ্ছে। কিছু প্রাইভেটকার দুর্ঘটনাও রয়েছে। রোগীর আঘাতের ধরন অনুযায়ী কাউকে কাউকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অন্যদের চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে এখন তো ঈদের ছুটি শেষ। তাই রোগীর চাপও কমেছে।

জানা গেছে, ঈদের ছুটির কারণে হাসপাতালের বহির্বিভাগ ২২ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ছিল। কিন্তু জরুরি বিভাগ চালু ছিল। ঈদের ছুটির সময় প্রতি শিফটে ১৮ জন করে মোট ৩৬ জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করেন। 

ঈদের সময় দুর্ঘটনায় বিষয়ে নিটোরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান সময়ের আলোকে বলেন, ঈদ ও ঈদ-পরবর্তী সময়ে এই হাসপাতালে রোগীর এমনই চাপ থাকে। এবারও রোগীর চাপ প্রচুর ছিল। আমরাও সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছি। সাধারণত ঈদের ছুটির সময়ে বেপরোয়া গতি, অদক্ষতা, অতিরিক্ত আরোহী নিয়ে প্রতিযোগিতা বা মহাসড়কে ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ এসবই দুর্ঘটনার মূল কারণ।

তিনি বলেন, গত বছর ঈদের ছুটিতে আমরা যেসব রোগী পেয়েছিলাম তার বেশিরভাগেই তিন চাকার যানে দুর্ঘটনায় আহত রোগী। কিন্তু এবার মোটরসাইকেল চালকরাই সংখ্যায় বেশি। যাদের বেশিরভাগই বয়সে তরুণ। রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকায় বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর কারণে তরুণরা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সবার অবস্থা গুরুতর। অনেকের পা কেটে ফেলতে হয়েছে। এমন অনেক তরুণ আছেন, যারা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাই বেপরোয়া গতিতে বাইক না চালাতে তরুণদের আহ্বান জানান এ চিকিৎসক।



  বিষয়:   দুর্ঘটনা  নিহত  আহত 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: