জ্বালানি তেল নিয়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলায় তেল পাচার, কালোবাজারি ও মজুদদারির খবর পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় তেল মজুদের ঘটনায় অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের জরিমানার পাশাপাশি কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পেট্রোল পাম্প বা ফিলিং স্টেশনগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সারা দেশে জেলা ও পুলিশ সুপারদের মনিটর করার নির্দেশনা এবং মজুদ ঠেকাতে ৯টি জেলায় তেলের ১৯টি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
পাশাপাশি দেশের ভেতরে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে ও তেল পাচার ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি ও চোরাচালান রোধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
অন্যদিকে রাজধানীতে সরবরাহ ঘাটতির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক পেট্রোল পাম্প। যেসব পাম্পে সীমিত পরিমাণে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন। বিভিন্ন এলাকায় এ সংকটের কারণে পরিবহনসহ প্রায় সব খাতে প্রভাব পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সারা বিশ্বে জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। বাংলাদেশেও কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে দেশে চাহিদার তুলনায় বেশি তেল নেওয়ার কারণে সংকট চরমে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, তেল পর্যাপ্ত থাকলেও একটি চক্র সরকারের ঘোষণাকে পুঁজি করে সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। যেখানে একটি তেল পাম্পের অকটেনের চাহিদা প্রতিদিন হাজার লিটার, সেখানে তারা নিচ্ছে কয়েক হাজার লিটার। এই তেলের অধিকাংশ নিচ্ছেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকরা। তারা ট্যাঙ্কি পূর্ণ করে বাসায় বা অন্য কোথাও নিয়ে তা মজুদ করছেন। ফলে তেল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পসংশ্লিষ্টরা। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ না কমলেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের যে তীব্র সংকট দেখা যাচ্ছে তার জন্য মজুদদারিকেই বেশি সন্দেহ করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় পাম্পে বিজিবি মোতায়েন ও ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
গত শুক্রবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক অনলাইন সভায় ট্যাগ অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করবে। এই দুই মেট্রোপলিটন এলাকা বাদে জেলা ও বিভাগীয় শহরে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ট্যাগ অফিসার হিসেবে নিয়োগ করবেন। ট্যাগ অফিসাররা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ অথবা বিপিসি নির্ধারিত পদ্ধতিতে কাজ করবেন ও দৈনিক প্রতিবেদন দেবেন বলে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে শনিবার বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, জ্বালানি তেল মজুদ ঠেকাতে দেশের ৯টি জেলায় ১৯টি ডিপোতে বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সারা দেশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ডিপোগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে পরিকল্পিত কাঠামোর আওতায় ইউনিট সদর দফতর থেকে দূরে অস্থায়ী বেজক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যাম্পে একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে তদারকি, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কঠোর বাস্তবায়নে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। অবৈধ জ্বালানি মজুদ ও বিক্রি প্রতিরোধ এবং নাশকতা ঠেকাতে ডিপো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার ঠেকাতে অতিরিক্ত টহল, নৌ টহল, চেকপোস্টে তল্লাশি ও সীমান্তবর্তী এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আমদানি-রফতানিতে ব্যবহৃত ট্রাক এবং লরিসহ বিভিন্ন যানবাহনেও নিয়মিত তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
তবে রাজধানীতে সরবরাহ ঘাটতির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক পেট্রোল পাম্প। যেসব পাম্পে সীমিত পরিমাণে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে সেখানেও দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় এ সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহনসহ প্রায় সব খাতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক সময় মিলছে না কাক্সিক্ষত জ্বালানি। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।
শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন তেলের পাম্প ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ পাম্পই বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক পাম্প খোলা থাকলেও কাক্সিক্ষত তেল মিলছে না। ভোর থেকেই অনেকে দীর্ঘ সারি করে তেল নিতে আসছেন কিন্তু কেউই তেল পাচ্ছেন না। পরিবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা যায় রেশন পদ্ধতিতে তেল দেওয়া হচ্ছে। যারা রাইডার রয়েছেন, তারা তেল পাচ্ছেন ৫ লিটার এবং যারা ব্যক্তিগত বাইক নিয়ে এসেছেন তারা পাচ্ছেন ২ লিটার। যারা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন তাদের সর্বোচ্চ ১০ লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে। তবে কতক্ষণে তেলের জন্য মানুষের দাঁড়ানো লাইন শেষ হবে অথবা কতক্ষণে তেল মিলবে এটি বলা যাচ্ছে না।
জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে সরকার প্রত্যেক মেট্রোপলিটনে এবং ঢাকাসহ চট্টগ্রামে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়ার কথা জানালেও বাস্তব চিত্রে সেটার কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনে কোনো ট্যাগ অফিসারের দেখা পাওয়া যায়নি। পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছেন, তারা এ বিষয়ে কিছু জানেন না। তবে পাম্পে পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি দেখা গেছে।
পরিবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনের সামনে কথা হয় তেলের জন্য অপেক্ষমাণ সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এই ভোগান্তির শেষ কবে হবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েই চলে যাচ্ছে। আমাদের তো কাজ আছে। এভাবে চলতে থাকলে তো সব কাজ রেখে শুধু লাইনেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
আসাদগেট মোড়ে জ্বালানি তেলের পাম্পগুলোতে অস্বাভাবিক চাপ ও দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। শনিবার পাশাপাশি দুটি পেট্রোল পাম্পের মধ্যে সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি পুরোদমে চললেও তালুকদার ফিলিং স্টেশন দুপুর পর্যন্ত বন্ধ ছিল। ডিপো থেকে তেল না আসায় এই পাম্পটি বিক্রি শুরু করতে পারছিল না।
সোনার বাংলা পাম্পে ছিল তেলের জন্য মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ লাইন। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা কোনো রেশনিং করছে না। গ্রাহক যতটুকু চান ততটুকুই দিচ্ছেন। তবে অন্যান্য পাম্প বন্ধ থাকায় এখানে চাপ অনেক বেড়েছে বলে মনে করছেন তারা।
পাম্পের ম্যানেজার শঙ্কর বলেন, যথেষ্ট পরিমাণে তেল দিচ্ছি। কোনো রেশনিং নেই। যা চায় সেটিই দিচ্ছি। কিন্তু ঢাকার অন্য পাম্পগুলো বন্ধ থাকায় এবং গ্রাহকরা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে রিউমার শুনে স্টক করার চেষ্টা করায় এখানে জট লেগেছে। তিনি আরও জানান, তাদের ছোট পাম্প হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল পান, বর্তমানেও সেই একই পরিমাণ পাচ্ছেন। কিন্তু গ্রাহকের সংখ্যা অনেক বেশি। অনেকে ৫ লিটারের জায়গায় ১৫ থেকে ২০ লিটার করে নিয়ে যাচ্ছেন, ফলে তেল দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তখন ডিপো থেকে নতুন করে তেল আনতে হয়।
সোনার বাংলা পাম্পের সামনে তেলের জন্য অপেক্ষমাণ সামশুল হক বলেন, আমি ১২টা ৪০ মিনিটে লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখন আড়াইটা বেজে গেছে। প্রায় দুই ঘণ্টা। রোববার থেকে অফিস, তাই পাঁচ দিন চলার মতো তেল নিতে এসেছি। লাইনে দাঁড়িয়ে খুব বিরক্ত লাগছে, সহ্য করা যাচ্ছে না। কিন্তু অফিস তো যেতে হবে। গ্রামের অবস্থা আরও খারাপ। তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ১০০ টাকার তেল পাওয়া যায়।
মোকাব্বির খান নামে তেল সংগ্রহ করতে আসা আরেকজন জানান, তিনি ৩ থেকে ৪টি স্টেশন ঘুরেছেন। এখানে দেড় ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, মিনিমাম ১৫০ গাড়ির পেছনে ছিলেন। সময় কাটাতে একটু পর পর চা-বিড়ি খাচ্ছেন, মাথায় পানি দিচ্ছেন, পানি পান করছেন, যাতে শান্ত থাকা যায়।
অনেক গ্রাহক জানিয়েছেন, দীর্ঘ লাইনে রোদের মধ্যে দাঁড়ানোর কারণে কেউ কেউ অসুস্থ বোধ করছেন। কিছু গ্রাহক অভিযোগ করেন, পাম্পের লাইনে না দাঁড়িয়ে অনেকে অতিরিক্ত দামে খোলা বাজার থেকেই তেল কিনছেন। তবে লাইনে দাঁড়ানো অনেকেই সেই অতিরিক্ত দাম দিতে রাজি হননি।
অন্যদিকে মোটরসাইকেল চালক ফয়সাল আহমেদ বলেন, এখানে এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। অন্য পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এখন যা অবস্থা, তা মেনে নিতে হবে। সিন্ডিকেটের কারণে এমন হচ্ছে বলে মনে হয়। বাইরে খোলা বাজারে ২০০ টাকা লিটারে তেল পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু আমি লাইনেই নিতে চাই।
বিজয় সরণির ট্রাস্ট পাম্পের সামনে দুপুরের দিকে দেখা যায়, চালক বা ড্রাইভার যারা আছেন, তাদের বড় একটি অংশ একটি আন্দোলনমুখী বা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তবে পরে সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং পাম্পও বন্ধ করা হয়। তবে সকাল থেকে যারা দীর্ঘ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন একটু তেলের আশায় সেই মানুষগুলো তখন পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তারা বলছেন যে এখানকার আগত লোকজন দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছে না। তার অন্যতম কারণ ডিপো থেকে তেলের সরবরাহ কম বা সাপ্লাই কম থাকাতেই এ রকম একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে।
দুপুর পর্যন্ত বিজয় সরণিতে মানুষের ভিড় ও গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। এই লাইনের মাধ্যমেই পরিস্থিতি কতটুকু খারাপ পর্যায়ে গিয়েছে তার আঁচ পাওয়া যায়। শুধু ট্রাস্ট পাম্প না, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের পাম্পই বন্ধ রয়েছে। কেননা তেল স্বল্পতার কারণে ডিপো থেকে সরবরাহ নেই। বিশেষ করে আজ রোববারও ট্রাস্ট পাম্প ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
দেশের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি তেল মজুদের ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের জরিমানার পাশাপাশি কারাদণ্ডও দিয়েছেন। কোথাও কোথাও তেল না পেয়ে সড়ক অবরোধ করা হয়েছে। নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধির পাঠানো খবর
ফরিদপুর : জেলা সদরের কানাইপুর বাজার এলাকায় দুটি পেট্রোল পাম্পে অভিযান চালিয়ে একটি পাম্পকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। শনিবার দুপুর ১২টা থেকে বিকাল পর্যন্ত সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়ার নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
জেলা প্রশাসন জানায়, পেট্রোলিয়াম পণ্য মজুদ রেখে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি বন্ধ রাখার অভিযোগে হোসেন ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালানো হয়। সেখানে প্রায় ২৮ হাজার লিটার পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল মজুদ থাকা সত্ত্বেও পাম্পটি বন্ধ রাখা হয়েছিল। পাম্পের সামনে ‘তেল নেই’ লেখা থাকলেও মজুদের সত্যতা পাওয়ায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর আওতায় পাম্পটির ম্যানেজারকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পরে তাৎক্ষণিকভাবে পাম্প খুলে দিয়ে সব ধরনের যানবাহনে জ্বালানি সরবরাহ চালু করা হয়।
অন্যদিকে পাশের রয়েল ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ থাকলেও মজুদ পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষ যান্ত্রিক ত্রুটির কথা জানালে সতর্ক করে তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে এ ক্ষেত্রে কোনো জরিমানা করা হয়নি। প্রশাসন জানিয়েছে, অভিযানের পর উভয় পাম্পেই স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ চলছে এবং কৃত্রিম সংকট রোধে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
দিনাজপুর : সারা দেশে জ্বালানি তেলের সংকটের মধ্যে জেলার বীরগঞ্জের একটি বাসা থেকে অবৈধভাবে মজুদ করা ৩৮০ লিটার ডিজেল ও অকটেন জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ ঘটনায় পরিতোষ রায় নামে এক ব্যক্তিকে সাত দিনের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। শনিবার দুপুরে উপজেলার শিবরামপুর ইউনিয়নের ধনগাঁও বাজার এলাকায় ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুমা খাতুনের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন পাত্রে রাখা ৩৫০ লিটার ডিজেল ও ৩০ লিটার অকটেন উদ্ধার করা হয়। অবৈধভাবে তেল মজুদের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাৎক্ষণিকভাবে দণ্ড দেন। পরে জব্দ করা তেল সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা হয় এবং বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। ইউএনও সুমা খাতুন জানান, জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট রোধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং মজুদদারি ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ময়মনসিংহ : জেলার ফুলপুরে একটি মিনি ফিলিং স্টেশন থেকে মাটির নিচের ট্যাঙ্কসহ ২৩ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করেছে প্রশাসন। এ ঘটনায় পাম্প মালিককে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। শনিবার দুপুরে পৌরসভার আমুয়াকান্দা পয়ারী রোডের কাড়াহা মোড় এলাকায় মেসার্স পপি ট্রেডার্সে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া ইসলাম সীমার নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়। এ সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শফিকুল ইসলামসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অভিযানে ১৯ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল ও ৪ হাজার ৫০০ লিটার পেট্রোল মজুদ অবস্থায় পাওয়া যায়।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান প্রায় এক মাস আগে এসব জ্বালানি মজুদ করে পাম্পটি বন্ধ রাখেন, ফলে এলাকায় সংকট তৈরি হয়। অবৈধ মজুদের দায়ে তাকে জরিমানা করা হয়। জব্দ করা জ্বালানি জনস্বার্থে এলাকার অন্যান্য ফিলিং স্টেশনের মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
গোপালগঞ্জ : জেলা শহরের পাঁচুড়িয়া এলাকায় অবৈধভাবে তেল মজুদের অভিযোগে মেসার্স গংগা মোটর্সকে ৯ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। শনিবার দুপুরে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফারদীন খান প্রিন্সের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির গুদাম থেকে দেড় হাজার লিটার পেট্রোল ও অকটেন মজুদ পাওয়া যায়। পরে সেগুলো ভোক্তাদের মধ্যে দুই লিটার করে বিতরণ করা হয়। অভিযোগ ছিল, দোকান বন্ধ রেখে বেশি দামে তেল বিক্রির মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছিল। প্রতিষ্ঠান মালিক অসুস্থতার কারণে ব্যবসা বন্ধ থাকার কথা জানান।
কিশোরগঞ্জ : অতিরিক্ত দামে ডিজেল বিক্রির দায়ে জেলার পাকুন্দিয়ায় বুলবুল নামে এক ব্যবসায়ীকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। শনিবার দুপুরে কলাদিয়া বাজারে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত জাহানের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে দণ্ড দেওয়া হয়।
জামালপুর : জেলার পৌর শহরের জিগাতলা এলাকায় জ্বালানি তেল মজুদ রেখে বিক্রি না করায় জুঁই এন্টারপ্রাইজকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। শনিবার সকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিএমএসআর আলিফ এ দণ্ড দেন।
অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে প্রথমে স্টক রেজিস্টারে তেল না থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও পরে গুদাম থেকে প্রায় আড়াই হাজার লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়। এ অপরাধে ২০০৯ সালের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে জরিমানা করা হয় এবং পরে পুলিশি পাহারায় গ্রাহকদের মধ্যে তেল বিতরণ শুরু হয়।
স্থানীয়রা জানান, তারা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাননি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সীমিত মজুদ ও অতিরিক্ত চাপের কারণে বিতরণ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা ছিল। স্থানীয় বিএনপি নেতা মমিনুর রহমান মমিন অতিরিক্ত মজুদ ও চাহিদা বৃদ্ধিকে সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সিরাজগঞ্জ : জেলার তাড়াশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৩৯৫ লিটার পেট্রোল জব্দ করে পরে তা ফিলিং স্টেশনে নিয়ে বিক্রি করেন ইউএনও নুসরাত জাহান। গত শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে উপজেলার বিনসাড়া বাজারে মেসার্স মোল্লা এন্টারপ্রাইজে অভিযান চালিয়ে তা উদ্ধার করা হয়। এ সময় ব্যবসায়ী শাহ আলম মোল্লাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানাও করেন ইউএনও। এরপর জব্দ পেট্রোল বিক্রির জন্য খালকুলা সমবায় ফিলিং স্টেশন ও মান্নাননগর মটর শ্রমিক ফিলিং স্টেশনে নিয়ে জনপ্রতি এক লিটার করে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তাড়াশ ইউএনও নুসরাত জাহান বলেন, অতিরিক্ত দামে বিক্রির অপরাধে ৩৯৫ লিটার পেট্রোল জব্দ করা হয়। একই অপরাধে ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।