রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বারান্দা ও করিডোরজুড়ে উপচেপড়া রোগীর ভিড়, শিশুদের কান্না আর স্বজনদের উদ্বেগ সব মিলিয়ে এক অস্থির চিত্রই ফুটে উঠছে। হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে শিশু রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসাব্যবস্থা।
এদিকে সারা দেশে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যদিও সরকারি ও হাসপাতালভিত্তিক পরিসংখ্যানে রয়েছে নানা গরমিল। টিকা সংকট, মাঠপর্যায়ের সীমাবদ্ধতা এবং টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি এখন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দশ মাস বয়সি বিভার সারা শরীরে লালচে র্যাশ। তার সঙ্গে তীব্রজ্বর, পাতলা পাখয়ানা ও বমি। প্রায় এক ধরনের নিস্তেজ হয়ে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে কান্নাকাটি করছে। কাঁদতে কাঁদতে যেন গলায় আওয়াজই বের হচ্ছে না। পাশেই বসা মা মুরশিদা বেগম সন্তানের যন্ত্রণাকাতর মুখচ্ছবি দেখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছেন। যেন কিছু বলারও শক্তি হারিয়ে ফেলছেন তিনি। শুধু এই শিশু কিংবা তার মা নয় তাদের আশপাশেও একই অবস্থা।
সোমবার সরেজমিন দেখা গেছে, হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় এখন শয্যার চেয়ে রোগী বেশি। ভর্তি রোগীদের বড় অংশই শিশু; জায়গা না থাকায় অনেকে করিডোর ও বারান্দায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে। আর সন্তানের দুচিন্তায় রোগী ও স্বজনরা একদিকে যেমন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন তেমনি চোখে-মুখেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপ।
মুরশিদা বেগম সময়ের আলোকে বলেন, প্রথমে বুঝতে পারিনি হাম হয়েছে। যখন অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায় তখন শিশু হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে ভর্তি করায়নি। পরে এখানে নিয়ে এসে ৪ দিন আগে ভর্তি করাই। তবে ১০০ শয্যার এ হাসপাতালে হাম ছাড়াও জলাতঙ্ক, এইডস, টিটেনাসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীকে একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়ায় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৬ জেলাতেই ছড়িয়েছে হামের বিস্তার। দেশজুড়ে জানুয়ারি থেকে মার্চের ২৯ তারিখ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬৭৬ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগ আক্রান্তের শীর্ষে রয়েছে। তার মধ্যে বিভিন্ন জেলা ও বেসরকারি হাসপাতালের প্রাপ্ত তথ্যে এ বছর হামে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫৩ জন। যদিও সংশ্লিষ্টরা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছেন। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ২৮ জনের কথা জানিয়েছে।
যদিও হাসপাতালভিক্তিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি। এর মধ্যে শুধু সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে হামে আক্রান্ত হয়ে এ মাসে মোট ২১ জনের মৃত্যু এবং আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ৩৫৫ জন। এর আগের মাসে একজনসহ মোট মৃত্যু হয়েছে ২২ জনের। আর জানুয়ারিতে ভর্তি ২৫ জন এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ভর্তি হয় ৮৮ জন। অথচ স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যানে ঢাকা ২ সিটিতে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা দেখানো হচ্ছে ১১০ জন। একইভাবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যানে পাবনা জেলা রোগীর সংখ্যা দেখানো হচ্ছে ৫৬ জনে। কিন্তু আড়াইশ শয্যাবিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ১১৮ জন। অর্থাৎ হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে গরমিল দেখা যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বেশ কয়েকটি বড় সরকারি হাসপাতালের তথ্য যাচাই করে এসব জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, দেশে দুভাবে টিকা দেওয়া হয়। একটি হচ্ছে নিয়মিত টিকা কর্মসূচি, যা সারা বছর ধরে চলে। এর মধ্যে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে ১২টি রোগ প্রতিরোধে ৯টি টিকা দেওয়া হয়। বিভিন্ন বয়সি শিশুদের দেওয়া হয় ৭টি টিকা। শিশুদের ৯ মাস বয়সের সময় হাম ও রুবেলা রোগ প্রতিরোধে এমআর টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে মোট আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩৪ শতাংশের বয়স ৬ মাসের নিচে। তাই শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে বয়স কমিয়ে ৬ মাস করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা আগামী জুন মাসে দেশজুড়ে ২ কোটির বেশি শিশুকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম মূলত ‘রুবেলা’ নামের এক অতিসংক্রামক ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত রোগ। এ বছর হাম রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সঙ্গে মৃত্যুও বাড়ছে। রুবেলা ভাইরাসটি শ্বাসনালি দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সাময়িকভাবে নষ্ট করে দেয়। এর ফলে হামে আক্রান্ত হলে শিশু এর বাইরেও নানা রকম ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণু দ্বারা সহজে সংক্রমিত হয়।
হামের জটিলতা হিসেবে পরবর্তী সময়ে প্রায়ই নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া হতে পারে। এ ছাড়া আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’ এর মজুদ মারাত্মকভাবে কমে যায়। মারাত্মক অপুষ্টি, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ আরও অনেক রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ পরিস্থিতিতে হামের বিস্তার মোকাবিলা করতে হলে সঠিক তথ্য দরকার।
তাদের মতে, নিয়মিত টিকাদান এবং বিভিন্ন ধরনের টিকা কর্মসূচির কারণে দেশে পোলিও, ধনুষ্টংকার নির্মূলে সফল হয়েছে। হেপাটাইটিস এবং হামও অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, গাফিলতির কারণে একটি সফল কর্মসূচি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তাই টিকার ঘাটতি থাকলে এখন অবিলম্বে তা পূরণ করতে হবে এবং দ্রুত পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহ নিশ্চিত করা উচিত।
আর স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, টিকা সংকটের পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে টিকা কেনার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেওয়ায় মজুদ শূন্যে নেমে এসেছে। এ ছাড়াও মাঠপর্যায়ে টিকার স্বল্পতা ও জনবলঘাটতির কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শিশুরা যেমন টিকা পাচ্ছে না, তেমনি আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
ইপিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইপিআইয়ের মাধ্যমে দেশে ১২টি রোগ প্রতিরোধে ৯টি টিকা দেওয়া হয়। বিভিন্ন বয়সি শিশুদের দেওয়া হয় সাতটি টিকা। এর মধ্যে নিউমোনিয়া প্রতিরোধে পিসিভি টিকা, যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি টিকা, ডিপথেরিয়ার পেন্টা টিকা, পোলিও রোগের বিরুদ্ধে বিওপিভি টিকা এবং ধনুষ্টংকারে টিডি টিকাসহ বেশ কিছু টিকার মজুদ শূন্যের মধ্যে রয়েছে। আর টিকা সংকটে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কথা স্বীকারও করেছে বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জনরা। গত কয়েক মাস ধরে ওপিভি, পেন্টা, পিসিভি এবং আইপিভি ভ্যাকসিন তারা পাচ্ছেন বলেও জানান।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভাগওয়ারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়েছে মোট ৬৭৬ জন রোগী। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৭৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২১৪ এবং মার্চে ৩৫৬ জন আক্রান্ত হয়। আর মোট ৬৪ জেলার মধ্যে ৮ জেলায় হামের সংক্রমের কোনো রোগী পাওয়া যায়নি।
জেলাগুলো হলো চট্টগ্রাম বিভাগের রাঙামাটি ও বান্দরবান, খুলনার বাগেরহাট ও মেহেরপুর, রাজশাহীর জয়পুরহাট, রংপুরের লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও গাইবান্ধা। আর মোট আক্রান্তের মধ্যে ঢাকা বিভাগে আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি ২৪৫ জন। এর মধ্যে আবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি ৮৫ জন। এর পরেই রয়েছে ঢাকা জেলা। এখানে আক্রান্ত ৩২ জন। রাজশাহী বিভাগে ১৩৭ জন, এর মধ্যে পাবনায় সবচেয়ে বেশি ৫৬ জন। ময়মনসিংহ বিভাগে ৮০ জন, এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলায় ৪৭ জন। বরিশাল বিভাগে ৫১ জন, এর মধ্যে বরগুনা জেলায় সবচেয়ে বেশি ২৪ জন। খুলনা বিভাগে ৫১ জন. এর মধ্যে যশোরে সবচেয়ে বেশি ২১ জন। রংপুর বিভাগে ৬ জন, এর মধ্যে ঠাকুরগাঁয়ে সবচেয়ে বেশি ২ জন। সিলেট বিভাগে ১৩ জন, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬ জন মৌলভীবাজার জেলায়। চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৩ জন, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাঁদপুর জেলায় ১৯ জন। তবে জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৫ জন আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে কক্সবাজারে ২৮ জন, চাঁদপুরে ১২ জন, কুমিল্লায় ১৮ জন এবং চট্টগ্রামে ২ জন রোগী আক্রান্ত হিসেবে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়াও নোয়াখালীতে গত ১৫ দিনে ৩০০-এর বেশি শিশু আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যানের সঙ্গে জেলাভিক্তিক কোনো পরিসংখ্যানই মিলছে না।
হাসপাতালভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এ বছর ৪৭ শিশুর মৃত্যুর হয়েছে। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে এ মাসে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার আগের মাসে এক শিশুর মৃত্যু হয়।
এ ছাড়াও রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২১ জন, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬ জন এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। আর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ জন, বরিশাল বিভাগে ৩ মাসে ৭ জন এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ শিশুসহ মোট ৪৭ শিশুর মৃত্যু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ ৩৮ জনের মৃত্যু তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে চলতি মাসেই মারা গেছে ৩২ শিশু।
স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে, এখন পর্যন্ত মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সংখ্যা ২১ জন। এর বাইরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬ জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ জন এবং রাজশাহী ও পাবনায় ১ জন করে শিশু মারা গেছে। তবে বিভিন্ন জেলা ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য যোগ করলে এ বছর মোট মৃত্যুর সংখ্যা বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি প্রসঙ্গে মহাখালী সংক্রমকব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শ্রীবাস পাল সময়ের আলোকে বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। বিশেষ করে হাম কোভিডের চেয়েও বেশি ছোঁয়াছে।
সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। শিশুদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি বেশি এবং জটিলতা হলে নিউমোনিয়াসহ অন্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমাদের এখানে জানুয়ারিতে রোগীর সংখ্যা কম থাকলেও এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
শিশুদের মৃত্যুর বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু হামের কারণে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে, বিষয়টা তা নয়। দেখা গেছে, অনেক শিশুর শরীরে নিউমোনিয়াসহ অনেক ধরনের জটিলতা ছিল। পরে হাম হয়ে মারা গেছে।
আবার অনেক শিশুদের টিকা নেওয়ার পরও হাম আক্রান্ত হচ্ছে বলেও জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, এটার সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি। এ জন্য আরও রিসার্চ করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ইপিআই অ্যান্ড সার্ভিল্যান্সের উপপরিচালক ডা. মো. শাহারিয়ার সাজ্জাদ সময়ের আলোকে বলেন, শিশুর ৯ মাস পূর্ণ হলেই এমআর-১ একটা ডোজ দেওয়া হয়, আরেকটা এমআর-২ টিকা দেওয়া হয় ১৫ মাস পূর্ণ হলে। এখন সমস্যা হচ্ছে বাচ্চাদের ৯ বয়স পূর্ণ না হলে তো প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা দেখছি ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রায় ৩৪ শতাংশ শিশুর হাম হচ্ছে, যা সচরাচর হয় না। আমরা আশা করছি, হামের এই আউটব্রেকের কারণটা বের করতে পারলে সংক্রমণ মোকাবিলা করতে পারব।
তিনি বলেন, আজ (গতকাল) আমরা জাতীয় টিকাদান সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের (নাইট্যাগ) পরামর্শ সভা করেছি। সেখানে ৬ মাস বয়সি শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও আগামী জুন মাসে সারা দেশে ২ কোটি শিশু যাদের বয়স ৬ মাস থেকে ৫ বছরের মধ্যে রয়েছে তাদের টিকা দেওয়ার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। বিসিজি টিকার ক্ষেত্রে শতভাগ বাচ্চাকে আমরা টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করছি, যাতে কোনো শিশু বাদ না পড়ে।
এ ছাড়া ৬ জেলায় ১০ বছর পর্যন্ত ড্রপ আউট শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হবে বলেও জানান শাহারিয়ার সাজ্জাদ।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ বলেন, ৯ মাসের পরিবর্তে হামের সংক্রমণের ধরনকে বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত কর্মসূচিতে না হলেও ক্যাম্পেইনে ৬ মাসের শিশুদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
তিনি বলেন, পৃথিবীর বহু দেশে পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্যাম্পেইনে নির্ধারিত বয়সের আগেও টিকা দেওয়া রীতি আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ ব্যাপারে নির্দেশনাও রয়েছে। তবে নিয়মিত টিকাদানে অবশ্যই ৯ মাসের আগে দেওয়া যাবে না।
ইউনিসেফ থেকে হামের টিকা সংগ্রহ করছে সরকার : স্বাস্থ্যমন্ত্রী
এদিকে সোমবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইউনিসেফ থেকে হামের টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, দেশে হামের (মিজেলস) সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থায় জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) থেকে এই টিকা সংগ্রহ করা হবে। আগামী এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এই টিকা সরবরাহ শুরু হতে পারে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ চালু, ভেন্টিলেটর সরবরাহ ও বিশেষায়িত ওয়ার্ড প্রস্তুতের মাধ্যমে কাজ চলছে। একই সঙ্গে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
‘যারা টিকা পায়নি, তাদের মধ্যেই হামের প্রকোপ বেশি’ জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ইতিমধ্যে টিকা ক্রয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং অর্থ আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফকে পরিশোধ করা হয়েছে।
আগামী এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে টিকা সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে দেশে হাম আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের দুর্বলতা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
সোমবার এক বিবৃতি দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, চলতি মার্চ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ৩২ জন এবং এ বছর মোট ৪৬ শিশুর মৃত্যু ঘটেছে যা অত্যন্ত মর্মান্তিক। কিন্তু এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না।
জামায়াত নেতা আরও বলেন, এ পরিস্থিতির জন্য দেশের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনাই প্রধানত দায়ী। দেশবাসীর ধারণা, স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণেই সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে জনগণ তাদের সুচিকিৎসা পাওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় হাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।