রাজধানীজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে নাকাল জনজীবন। প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন চালকরা। সোমবার ভোর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকেই তেল পাচ্ছেন না। চলমান এই সংকট নিয়ে গ্রাহক ও পাম্পমালিকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ চলছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহে ফুয়েল পাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অভিযানে ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়টি।
সোমবার (৩০ মার্চ) সকাল থেকে তেজগাঁও, বিজয় সরণি, আসাদগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনের সামনে চালকদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক গ্রাহক তেল পাচ্ছেন না।
কোথাও তেল এলেও তা অল্প সময়েই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে চালকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরে তেল পাওয়া যাবে কি না, এই শঙ্কায় অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে ভোক্তাদের। সরেজমিন দেখা যায়, পাম্পটিতে স্বাভাবিকভাবেই তেল সরবরাহ করা হলেও লাইনের দৈর্ঘ্য গিয়ে ঠেকেছে বিএএফ শাহীন কলেজের পেছন পর্যন্ত, যা প্রায় মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
পাম্পে আসা ভোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তেলের সংকট না থাকার সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। তেল নিতে লাইনে দাঁড়ানো আব্দুল করিম বলেন, সরকার বলছে তেলের কোনো সংকট নেই কিন্তু আমরা তো লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছি। অনেক পাম্প বন্ধ থাকায় চাপটা নির্দিষ্ট কয়েকটি পাম্পে পড়ছে।
একই ধরনের অভিযোগ করেন মোহাম্মদ সেলিম।
তিনি বলেন, ঢাকা শহরের অনেক ফিলিং স্টেশনই বন্ধ রাখা হচ্ছে।
পাম্পমালিকরা বলছেন, তারা ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে।
মোটরসাইকেলচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, কিছু পাম্পমালিক অবৈধভাবে তেল মজুদ করে রাখছেন, যা সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যারা তেল মজুদ করে রাখছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আমরা সহজেই তেল পেতাম। এখন কষ্ট করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
এদিকে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। তাদের দাবি, অনেক ভোক্তা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নিতে এসে অপ্রয়োজনীয় ভিড় তৈরি করছেন।
পাম্পের কর্মচারী শহিদুল ইসলাম বলেন, অনেক গাড়ির ট্যাঙ্কে আগে থেকেই তেল থাকে। তারপরও তারা ট্যাঙ্ক ফুল করতে আসছেন। এতে লাইনের চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
তবে পাম্প কর্তৃপক্ষ মনে করছে, সঠিক তদারকি থাকলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো। শহিদুল বলেন, সরকার যদি নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি করত, তা হলে আমরা তেল সরবরাহ আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে পারতাম।
পূর্বাচল ফিলিং স্টেশনে দুপুরের দিকে দেখা যায়, তেল বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ। এ সময় ডিপো থেকে আসা তেল খালাসের কার্যক্রম চলছিল। ডিপোর গাড়ি আসার সঙ্গে সঙ্গে পাম্পের সামনে শতাধিক মোটরসাইকেল জড়ো হয়ে যায়।
পূর্বাচল ফিলিং স্টেশনের বিক্রয়কর্মী সোহেল বলেন, আমাদের তেল ছিল না। কেবল গাড়ি আসছে, তেল নামাচ্ছে। নামানো হলেই দেব।
জনপ্রতি কত টাকার তেল দেবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব মোটরসাইকেল ৫০০ টাকার করে তেল পাবে।
পরিবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশন এলাকায় শাহবাগ মোড়মুখী সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তবে এখানে তেলের কোনো সংকট নেই। ধাপে ধাপে তারা তেল দিচ্ছে। সরকার নির্ধারিত ৫ লিটার তেল মোটরসাইকেল চালকরা পাচ্ছেন। এ ছাড়া প্রাইভেটকার ১০ লিটার তেল নিতে পারছে।
পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের কাছে এখন ১৭ হাজার লিটার অকটেন মজুদ রয়েছে। তবে পাম্পে অবস্থান করা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কিছুটা আতঙ্কে আছেন। নড়াইলে জ্বালানি তেল না পেয়ে বাকবিতণ্ডার পর একটি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপককে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনার পর তারা কিছুটা আতঙ্কিত রয়েছেন।
পাম্প কর্মচারীদের অভিযোগ, গ্রাহকরা তাদের পেশিশক্তি দেখান। লাইন ভেঙে তেল নেওয়া বা কথাকাটাকাটির মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। কর্মচারীরা দিনভর চেষ্টা করছেন সেসব চাপ সামলিয়ে গ্রাহকদের সেবা দিতে।
এদিকে আসাদগেট এলাকার তালুকদার পাম্প থেকে তেল নিতে গণভবন হয়ে জিয়া উদ্যানমুখী সড়কে এবং সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে টাউনহলমুখী সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে।
দুপুরে তালুকদার পাম্পের সামনে অপেক্ষারত মোটরবাইকচালক মোবারক হোসেন রবিন বলেন, সকাল থেকে তেল দেয়নি। একটু আগে শুরু করছে। লাইনে দাঁড়িয়ে আছি আড়াই-তিন ঘণ্টা। পাম্পে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী জানান, সকাল থেকে তেল ছিল না তাই দেওয়া বন্ধ ছিল। এখন তেল দেওয়া শুরু হয়েছে।
পাম্পের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা শেষে চাহিদার তুলনায় কম তেল পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন যানবাহনের চালকরা।
সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষারত মোটরসাইকেলচালক মারুফ খন্দকার বলেন, কোনো পাম্পেই তেল দিচ্ছে না। পাম্পওয়ালারা বলছে, তেল নাই, তেল নেই। সব জায়গায় বলছে তেল নেই। আর যেসব জায়গায় তেল আছে, সেসব জায়গায় অতিরিক্ত ভিড়। আবার দিচ্ছে মাত্র ৫০০ টাকার। যে সময় দিচ্ছি সে অনুযায়ী ট্যাঙ্কি ফুল করে দিলে কষ্টটা মানা যেত। যে তেল দিয়েছে তাতে সর্বোচ্চ তিন দিন পর আবার পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে দুই-তিন ঘণ্টা শ্রম দিতে হবে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে সংকট নিয়ন্ত্রণে আনতে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
এর মধ্যে ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহে ‘ফুয়েল পাস’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী।
সোমবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, দেশের জ্বালানির মোট চাহিদার ৬৩ শতাংশ ডিজেল। বর্তমানে ডিজেলে কোনো সংকট নেই। অকটেন নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটি অনেকটা মনস্তাত্ত্বিক। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পাম্প থেকে তেল নেওয়ার ক্ষেত্রে ফুয়েল পাসের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। প্রাথমিকভাবে পেট্রোল ও অকটেনচালিত পরিবহনের জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ ধরতে সারা দেশে অভিযান চালাচ্ছে সরকার। ৩ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৬৪ জেলায় মোট ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে অবৈধভাবে মজুদ করা ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৫৩টি মামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টিতে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের উপস্থাপনায় বলা হয়, উদ্ধার করা জ্বালানি তেলের মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৬৫ লিটার ডিজেল। এ ছাড়া ২২ হাজার ৫৩৯ লিটার অকটেন, ৪৬ হাজার ১৪৬ লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়েছে। অবৈধ মজুদকারীদের কাছ থেকে ৭৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এসব অভিযানে বিভিন্ন স্থানে জরিমানা ও দণ্ড দেওয়া হয়েছে। সময়ের আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক ও
ঢাকা : জেলার দোহারে অবৈধভাবে তেল মজুদ করে বিক্রির অভিযোগে মো. করিম মণ্ডল নামে এক ব্যক্তিকে ৭ দিনের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সোমবার দুপুরে উপজেলার মেঘুলা বাজারে এ অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাসফিক সিগবাত উল্লাহ।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্র জানায়, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাসফিক সিগবাত উল্লাহ জানান, অভিযানে বাজারে অবৈধ মজুদ ও কৃত্রিম সংকট তৈরির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় প্রশাসন। এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে গণমাধ্যমকে তিনি জানান।
নাটোর : জেলার সিংড়ায় শেরকোল বাজারের মেসার্স আশা ট্রেডার্সে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে ১১ হাজার লিটারের বেশি জ্বালানি তেল মজুদের দায়ে ব্যবসায়ী আলতাফ শেখকে এক লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে দুই মাসের জেল দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
সোমবার বেলা ৩টায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল রিফাতের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ৪৯ ব্যারেল ডিজেল, ৫ ব্যারেল অকটেন, ২ ব্যারেল পেট্রোল ও ২ ব্যারেল লুব্রিক্যান্ট জব্দ করা হয়। বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় এই শাস্তি দেওয়া হয়। মজুদ তেল ৭ দিনের মধ্যে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম : জেলার সীতাকুণ্ডে জ্বালানি তেল মজুদ, কালোবাজারি ও অনিয়ম প্রতিরোধে আকস্মিক পরিদর্শন চালিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন।
গত রোববার বিকালে সীতাকুণ্ড থানাধীন বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও জ্বালানি তেল সংরক্ষণস্থলে অভিযান চালিয়ে তিনি পাম্পগুলোতে তেলের মজুদ পরিস্থিতি সরেজমিনে যাচাই করেন এবং রেজিস্টার কঠোরভাবে পরীক্ষা করেন।
খাগড়াছড়ি : জেলার দীঘিনালা উপজেলার কবাখালী ইউনিয়নের উত্তর মিলনপুর এলাকায় আলম স্টোর নামে মুদি দোকানে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযানে অবৈধভাবে মজুদ রাখা ১৫০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।
গত রোববার রাতে ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট দি বেবি টাইগার্সের দীঘিনালা জোনের সেনাসদস্য এবং দীঘিনালা থানা পুলিশের যৌথ টহল দল এ অভিযান চালায়। অভিযানে ১২০ লিটার ডিজেল ও ৩০ লিটার অকটেন জব্দ করা হয়।
এ ঘটনায় দোকান মালিক মো. আলমকে আটক করা হয়। তিনি উত্তর মিলনপুর এলাকার মৃত মো. ইউনুস মিয়ার ছেলে।
অভিযান পরিচালনা করেন সার্জেন্ট মামুনুর রশীদ ও দীঘিনালা থানার এসআই চয়ন হালদার। উদ্ধারকৃত তেলসহ মো. আলমকে দীঘিনালা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন এসআই চয়ন হালদার।