রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব, যা ক্রমেই জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, ঘটছে শিশুমৃত্যুর ঘটনাও। উদ্বেগজনকভাবে টিকা নেওয়া শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে শয্যা সংকট তৈরি হয়েছে, মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত অভিভাবকরা শিশুদের স্কুলে পাঠাতে দ্বিধায় পড়েছেন, আর স্বাস্থ্য বিভাগ জারি করেছে সতর্কতা।
মঙ্গলবারও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চাঁদপুর ও শরীয়তপুর বিভিন্ন হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় হামের উপসর্গ নিয়ে কমপক্ষে আরও ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামে আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে দেশের বেশ কয়েকটি জেলা থেকে হামে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আর হামের প্রকোপ বাড়ায় আতঙ্কিত শিশুদের অভিভাবকরা। সংক্রমণ বাড়ায় ভয়ে স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন তারা। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। হামের প্রাদুর্ভাবের শঙ্কায় সতর্কাবস্থায় রয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
হাসপাতালগুলোর শিশু বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, রোগীতে ঠাসা শিশু বিভাগগুলো। শয্যা সংকটে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেক রোগীকে। আবার শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের দীর্ঘ সারি। কেউ এসেছেন হাম শনাক্ত করতে, কেউ আবার বসন্ত সন্দেহে পরীক্ষা করাতে। এতে করে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের।
চিকিৎসকরা বলছেন, দেশজুড়ে দ্রুত হারে বাড়ছে হাম। শিশুদের রোগ হলেও এখন এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রাপ্তবয়স্করা। তাই সবাইকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে সরকারকে হামের টিকার ব্যাপারে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টার মধ্যে মৃত্যু হয় তাদের। এ সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ১৬ শিশু।
মঙ্গলবার দুপুরে খুদে বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছেন রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কুমার বিশ্বাস। বার্তায় তিনি জানান, হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৯৮টি শিশু ভর্তি আছে। গেল দুই দিনে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে।
রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাহিদা ইয়াসমিন জানান, হামে আক্রান্ত বেশিরভাগ শিশুর বয়স ছয় মাসের নিচে। ছয় মাসের নিচে শিশু আক্রান্তের হার ৭০ শতাংশের কাছাকাছি, যা আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। এক বছরের ওপরে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা খুবই কম।
রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম বলেন, জেলায় ১০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। হামের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে বেশি। আক্রান্তদের বেশির ভাগেরই বয়স ৬ থেকে ৯ মাস। কিন্তু হামের টিকা দেওয়া হয় ১০ থেকে ১৫ মাসে। ফলে যেসব শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই আনভ্যাকসিনেটেড বা টিকা না নেওয়া শিশু।
রামেক হাসপাতালে এ বছর হামের উপসর্গ নিয়ে ৩২ জন শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় মাত্র একজনের শরীরে হাম পজিটিভ পাওয়া গেছে। বাকি ২৯ জনের নমুনা পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়নি, যদিও তারা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিল।
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, এ জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ২৮ শিশুকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়, যা স্থানীয়ভাবে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে চাঁদপুর সদর জেনারেল হাসপাতালে সর্বাধিক ২২ জন চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩ জন এবং মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরও ৩ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই নতুন করে জ্বর, সর্দি ও কাশিসহ বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে শিশু রোগীদের আগমন বাড়ছে।
চাঁদপুর সদর জেনারেল হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা গেছে, রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় সেখানে বেড সংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালটিতে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য একটি পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ফ্লোরে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, যা চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দেয়।
এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। শিশুদের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী যথাযথ যত্ন নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চাঁদপুর সদরের লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন থেকে আসা লাকি বলেন, আমার শিশুর দুদিন ধরে পুরো শরীরে হাম ওঠে। পাশাপাশি গায়ে জ্বর, কাশি, চোখ দিয়ে পানি পড়ে।
শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আজিজুর রহমান জানান, গত এক সপ্তাহে ৫০ শিশুর কেস নিয়ে কাজ করেছি। সাধারণত ওইসব রোগী হাসপাতালে ভর্তি রাখি, যাদের খেতে না পারা, নেতিয়ে পড়া, দ্রুত শ্বাস। এসব রোগীর জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে।
অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তারা প্রথমে খেয়াল রাখতে হবে সাধারণ বিপজ্জনক চিহ্নগুলা আছে কি না। হামের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চমাত্রার জ্বর, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, কাশি এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, এ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় শুধু সদর হাসপাতালেই ভর্তি হয়েছেন তিন রোগী। তাদের মধ্যে একজন শিশু। এরই মধ্যে জেলা থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুরের বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে গত দুই সপ্তাহে হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশু ও তরুণদের মধ্য থেকে ২৫ ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পরে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।
তাদের মধ্যে জাজিরা উপজেলার বড় গোপালপুর এলাকার জাকির হোসেনের মেয়ে তাসিফা ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখীপুর থানার বালারহাট এলাকার ইসহাক মিয়ার মেয়ে রুকাইয়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। বর্তমানে জেলা সদর হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুসহ তিনজন চিকিৎসা নিচ্ছে।
এদিকে শিশুদের পাশাপাশি হামে আক্রান্ত হচ্ছে উঠতি বয়সের তরুণরাও। গত ২৪ ঘণ্টায় একই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও দুই তরুণ। তারা হলো শরীয়তপুর পৌরসভার বাঘিয়া এলাকার ইমন মুন্সী ও সদর উপজেলার দাদপুর এলাকার শাহীন কাজী। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তারা হামে আক্রান্ত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন চিকিৎসক।
শাহীন কাজী বলেন, কয়েক দিন ধরে জ্বর ছিল। এতটাই খারাপ অবস্থা যে বিছানা থেকে উঠতে পারিনি। ভর্তি হওয়ার পর রক্ত পরীক্ষা করলাম। রাত থেকে জ্বর নেই, কিন্তু শরীরে অনেক র্যাশ উঠেছে, যা এখন অনেক কষ্টদায়ক। গায়ে কাঁটার মতো বিঁধছে।
হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় আতঙ্কিত শিশুদের মায়েরা। সংক্রমণ বাড়ায় ভয়ে বিদ্যালয়ে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন তারা। আসমা খানম নামের এক নারী বলেন, ‘সারা দেশে হাম মহামারি আকার ধারণ করছে। আমরা আমাদের শিশুদের নিয়ে খুবই আতঙ্কে আছি। বাচ্চাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে হামের টিকা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা এখন ওদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে শঙ্কায় আছি। আশা রাখি সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
সদর হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মিজানুর রহমান বলেন, হামের কিছু উপসর্গ এ রোগকে বেশি জটিল করে ফেলে। আমরা পরামর্শ দেব হামে আক্রান্ত রোগীকে শরীরের পানির ভারসাম্য ঠিক রাখতে হবে। বেশি বেশি তরল খাবার দিতে হবে। কেউ আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এতে সঠিক চিকিৎসায় রোগীরা দ্রুত সেরে উঠবেন।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মিতু আক্তার বলেন, আমাদের এই হাসপাতালে এখন এক শিশু ও দুই তরুণসহ তিনজন ভর্তি আছেন। তাদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, দেশের অন্য জেলার মতো চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি এক শিশু মারা গেছে হাসপাতালে। মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিশুর মৃত্যু হয়। হামের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুটিকে সোমবার কক্সবাজার থেকে এনে চমেকে ভর্তি করা হয়েছিল। ছয় মাসের কম বয়সি এই শিশু হামে মারা গেছে কি না তা নিশ্চিত হতে নমুনা পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে নমুনা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ঢাকায়।
চমেক সূত্র জানায়, হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি অনেকের হামের উপসর্গ আছে। গেল সোমবার রাতে কক্সবাজার থেকে হামের উপসর্গ থাকা এক শিশুকে চমেকে এনে ভর্তি করা হয়। রাতেই তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে শিশুটির মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চমেকে মারা যাওয়া ছয় মাস বয়সি শিশুটির হামের উপসর্গ ছিল। শিশুটি হামে আক্রান্ত ছিল কি না তা নিশ্চিত হতে নমুনা পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ৭ জনের হাম ও একজনের মধ্যে রুবেলার সংক্রমণ পাওয়া গেছে। হামের লক্ষণ নিয়ে ২৯ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে। চিকিৎসা শেষে চারজনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। আরও ৭৫ জনের হামের লক্ষণ থাকায় নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন পেলে হামে আক্রান্ত কি না তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, হামে আক্রান্ত হয়ে কুমিল্লার তিন শিশু ঢাকায় মারা গেছে বলে জানিয়েছে জেলা সিভিল সার্জন অফিস। এ ছাড়া কুমিল্লা ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে আরও অন্তত ২১টি শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে একজন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকার এবং দুজনের বাসা তিতাস উপজেলায়।
সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির বলেন, হামে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় কুমিল্লার তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে তাদের বিষয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, গত এক মাসে ৬৯ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জনের পজিটিভ এসেছে। আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ বলেন, গত ১৮ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ১২ দিনে ২৫টি হাম আক্রান্ত শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে ৮ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ২ জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ১৫ জন শিশু হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, ৪১ জনের নুমনা পরীক্ষা করে গত দুই দিনে জেলায় নয়জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকায় বসবাসকারী নওগাঁ জেলার এক শিশু সেখানে (ঢাকা) মারা গেছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় হামের উপসর্গ থাকা রোগী পাওয়া গেছে ৪১ জন। ল্যাবটেস্টে এর মধ্যে পজিটিভ এসেছে ৯ জনের। আক্রান্তরা নওগাঁ সদর, পোরশা, নিয়ামতপুর, সাপাহার, আত্রাই ও মান্দা উপজেলা উপজেলার বাসিন্দা। সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে নওগাঁ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড ও নিয়ামতপুর উপজেলার ভাবিচা ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে।
মঙ্গলবার দুপুরে ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, রোগীতে ঠাসা শিশু বিভাগটি। শয্যা সংকটে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেক রোগীকে। ২০ ওয়ার্ডের বিপরীতে সর্দি, জ্বরসহ বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছে ৭০ জন। সেবা দিতে হিমশিম অবস্থা চিকিৎসক-নার্সদের।
রানীনগর উপজেলা মিরাট ইউনিয়নের হরিশপুর গ্রামের জোবেদা বেগম জানান, ‘তার নাতির কয়েক দিন থেকে শরীরে জ্বর ছিল। পরে খিঁচুনি ওঠে হাত-পা বাঁকা হয়ে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। পরে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তবে হাসপাতালে বেড না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।’
নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম জানান, ‘হামের প্রাদুর্ভাবের শঙ্কা দেখা দেওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। ইতিমধ্যে জেলা সদর হাসপাতালসহ প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। এরই মধ্যে জেলায় ৯ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। ঢাকায় বসবাসকারী নওগাঁ জেলার এক শিশু হামে আক্রন্ত হয়ে সেখানেই মারা গেছে।
যশোর প্রতিনিধি জানান, গত দুই মাসে যশোরের দুটি হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে দুই শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে মার্চ মাসে হামে আক্রান্ত হওয়া দশ শিশুও রয়েছে।
শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ড ইনচার্জ সাইদা সুলতানা জানান, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। দুই মাসে অন্তত ৯০টি শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অনেক শিশুর হাম রুবেলা টিকা গ্রহণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. সৈয়দ নূর-ই হামিম বলেন, হাসপাতালে টিকার কোনো সংকট নেই।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রার ডা. আফসার আলী জানান, গত তিন মাসে ৪৫টি শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল ও তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, যশোরেও হামের প্রাদুর্ভাবের শঙ্কা দেখা দেওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার সব সরকারি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জ্বরসহ শরীরে র্যাশ বা ঘামাচির মতো দেখা গেলে শিশুদের স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকা এবং হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য অভিভাবকদের অনুরোধ করা হয়েছে।