আগে শৃঙ্খলা পরে পে-স্কেল

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

নতুন পে-স্কেল নির্ধারণে আগের সরকারের প্রস্তাব সরাসরি গ্রহণ না করে বর্তমান সরকারের নিজস্ব কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয়

2026-04-01T05:15:24+00:00
2026-04-01T05:15:24+00:00
 
  রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬,
৯ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
আগে শৃঙ্খলা পরে পে-স্কেল
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৫ এএম 
সংগৃহীত ছবি
নতুন পে-স্কেল নির্ধারণে আগের সরকারের প্রস্তাব সরাসরি গ্রহণ না করে বর্তমান সরকারের নিজস্ব কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে আগামী বাজেটে কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার এবং জ্বালানি খাতে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপরও জোর দেন এই অর্থনীতিবিদ।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) কার্যালয়ে ‘বাজেট ঘিরে নাগরিক ভাবনা ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন। 

অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিগত সরকার তাদের মেয়াদের শেষ সময়ে পে-স্কেল সংক্রান্ত যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমান সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে এক ধরনের ‘প্রলম্বিত দায়’ তৈরি হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্যও। এ ছাড়া আগের সরকারের পে-কমিশনের রিপোর্টটি প্রশ্নহীনভাবে বিবেচনা করার সুযোগ উনাদের নেই।

পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘চুরি করা টাকা ফেরত আনতে হবে। দেশের ভেতরে ও বাইরে যেসব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, সেগুলো দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় বিক্রি করে অর্থ দেশে আনতে হবে। সম্প্রতি বিদেশ থেকে ৪৪ কোটি টাকা ফেরত আনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘ছোট অঙ্কের টাকা ফিরছে, কিন্তু বড় অঙ্কের টাকা কেন আসছে না?’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে অতিরিক্ত ব্যয় করার জন্য নতুন সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যও চাপে। বৈশ্বিক অস্থিরতা আগের আর্থিক দুর্বলতাগুলোকে প্রকট করেছে। সে জন্য কঠোর আর্থিক বাজেট করতে হবে। সরকারকে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নির্দয় হতেই হবে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারকে স্বল্পমেয়াদি রূপরেখা দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে সিপিডি ফেলো বলেন, খুব দ্রুত সময়ে সরকারকে তিন-চার মাসের জন্য একটি রূপরেখা দেওয়া দরকার। এটিকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে তিন বছরের জন্য মধ্যমেয়াদি বাজেটকাঠামো করা যেতে পারে।

বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) পর্যালোচনার জন্য টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, কাজটি এক-দেড় মাসের মধ্যে করতে হবে। এডিপি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। এটি না করে আগের মতো প্রকল্প নিলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না।

এ দিকে কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা ও করদাতারা লাভবান হলেও 
সরকার ঠকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ভট্টাচার্য। 

তিনি বলেন, এনবিআর কর্মকর্তাদের বড় সমস্যা হলো তারা তাদের হাতে থাকা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছাড়তে চান না। বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যবস্থায় গেলে এই স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় তারা এতে অনাগ্রহী।

তিনি বলেন, করদাতা সবার অভিযোগ যে ইনস্পেক্টর বা কমিশনাররা যে ক্ষমতা রাখেন, তারা সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। ওই যে (কর) আদায় কম হয়, আমরা তো সবাই জানি, তা তিন ভাগ হয়। যে করযোগ্য আয় আছে তার এক-তৃতীয়াংশ যায় যারা আদায় করেন তাদের কাছে। এক-তৃতীয়াংশ যায় সরকারের কাছে। বাকি এক-তৃতীয়াংশ যার দেওয়ার কথা তিনি দেন না। তো সবাই লাভ নিয়ে বের হয়ে যায়, ঠকে যায় সরকার।

এ দিকে জ্বালানি খাত বিষয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মত দেন, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সামষ্টিক অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন জরুরি। দেশের আর্থিক সক্ষমতা, ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা ও বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতির অবস্থা পরিষ্কারভাবে নিরূপণ না করে জ্বালানি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা ভুল পথে যেতে পারে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় যদি এককভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সমন্বয়ের অভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। 

সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি আমদানির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, বৈদেশিক সম্পর্ক কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলে তা রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। সরকারের ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে তিনি তিনটি দিক তুলে ধরেন আমদানি ও সরবরাহ বৃদ্ধি, শুল্ক কমানো এবং প্রয়োজনে দাম বৃদ্ধি। 

এরই মধ্যে জেট ফুয়েলের দাম বেড়েছে এবং অন্যান্য জ্বালানির দামও বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত করেন তিনি। 

এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তির বিষয়ে এই ফেলো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তির ফলে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলায় কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে কি না, তা সরকারকে বিবেচনা করতে হবে। 

বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের কথা উল্লেখ করে ড. ভট্টাচার্য সতর্ক করে বলেন, বৈদেশিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় হতে পারে, যা দেশের জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশের সমান। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে, যা টাকার অবমূল্যায়নের ঝুঁকি বাড়াবে। 

এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্ভাব্য অস্থিরতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই ওই অঞ্চল থেকে আসে। ফলে সেখানে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য আরও চাপে পড়তে পারে।

রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে পারলে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক শক্তি না থাকায় এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি। তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য প্রথম বছরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রথম বছরে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি না হলে শেষ বছরে তা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

সরকারি ব্যয় ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাহিদা বাড়বে। তাই ভর্তুকির মধ্যে অন্যায্য খাতগুলো চিহ্নিত করে তা পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। পাশাপাশি ধাপে ধাপে নগদ প্রণোদনা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি। আসন্ন বাজেটে অর্থসংস্থান বাড়াতে কর ছাড় কমানো, করের আওতা বৃদ্ধি এবং পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান এই অর্থনীতিবিদ।

  বিষয়:   পে  স্কেল  সরকার 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: