রান্নাঘরেও যুদ্ধের আঁচ

অলিউল ইসলাম

জাতীয়

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের অভিঘাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও তদারকির সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রভাবে দেশের এলপিজি গ্যাসের দাম হঠাৎ

2026-04-04T04:34:55+00:00
2026-04-04T04:34:55+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
রান্নাঘরেও যুদ্ধের আঁচ
অলিউল ইসলাম
প্রকাশ: শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৩৪ এএম   (ভিজিট : ২৮)
প্রতীকী ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের অভিঘাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও তদারকির সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রভাবে দেশের এলপিজি গ্যাসের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষের। বিশেষ করে দৈনন্দিন রান্নায় জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় সংসারের মাসিক বাজেট সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে গৃহিণীদের। একদিকে সিলিন্ডারের মূল্য লাফিয়ে বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে সরকারি দামের সঙ্গে বাস্তব দামের বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ায় ভোক্তারা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। বাধ্য হয়ে কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে ইনডাকশন চুলার দিকে ঝুঁকলেও সেখানে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল, সময়ক্ষেপণ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই রান্না কমিয়ে দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে এলপিজির এই মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনে অতিরিক্ত চাপ হয়ে দেখা দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে অস্থির হয়ে উঠেছে জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের এলপিজি গ্যাসের দামে। সরকার এক লাফে প্রায় ২৯ শতাংশ দাম বাড়িয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন চাপ তৈরি করেছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলপিজির সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই, কিন্তু বাজারে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা নতুন দাম অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার ৭২৮ টাকা। প্রতি সিলিন্ডারে খুচরা মূল্য বেড়েছে ৩৮৭ টাকা, যা ২০২১ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজির দাম নির্ধারণ শুরু করার পর এক মাসের ব্যবধানে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। কমিশন প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করেছে ১৪৪ টাকা। ফলে সাড়ে পাঁচ কেজি থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারের দাম হবে ৭৯২ টাকা থেকে শুরু করে ছয় হাজার ৪৮২ টাকা পর্যন্ত। যানবাহনে ব্যবহৃত এলপিজি বা অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটার ৭৯ দশমিক ৭৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত মাসে ছিল ৬১ দশমিক ৮৩ টাকা।
আরও পড়ুন

যদিও মার্চ মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল এক হাজার ৩৪১ টাকা, তবে বাস্তবে পুরো মাসজুড়ে সাধারণ গ্রাহকদের তা কিনতে হয়েছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকায়। মার্চের শেষ দিকে দাম আরও বাড়তে শুরু করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তের আগেই অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা প্রতি সিলিন্ডার এক হাজার ৯০০ থেকে ২৫০০ টাকায়ও বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিলিন্ডারের নতুন মূল্য ঘোষণার পর শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। কারওয়ান বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে প্রায় ২০০০ টাকায়, আফতাব নগরে এর চেয়েও বেশি দামে, আর মোহাম্মদপুরের বসিলায় বিক্রি হয়েছে ১৮০০ থেকে ১৯০০ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ সরকারি দামের সঙ্গে বাজার দরের বড় ধরনের ব্যবধান স্পষ্ট।

গৃহিণীরা বলছেন, লাইনের গ্যাস না থাকায় তারা অনেক আগেই সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। কিন্তু এখন সিলিন্ডারের দাম লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকায় তাদের বিকল্প খুঁজতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে ইনডাকশন চুলা ব্যবহার শুরু করেছেন। এতে একদিকে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, অন্যদিকে রান্নার গতি কমে যাচ্ছে। আগে যেখানে দুইমুখী গ্যাস চুলায় দ্রুত রান্না করা যেত, এখন একমুখী ইনডাকশন চুলায় একই কাজ করতে দ্বিগুণ সময় লাগছে।

মোহাম্মদপুরে বাসাবাড়িতে কাজ করা আছিয়া বেগম বলেন, আগে গ্যাস থাকলে কাজ দ্রুত শেষ করতে পারতাম। এখন সিলিন্ডারের দাম বেশি, মালিকরা কম ব্যবহার করতে বলে। ইনডাকশনে রান্না করতে গেলে সময় বেশি লাগে, আবার বিদ্যুৎ না থাকলে একদম বন্ধ। আমাদের কাজও আটকে যায়। গৃহিণী নাসিমা আক্তার বলেন, ইনডাকশন চুলা কিনতে হয়েছে বাধ্য হয়ে। কিন্তু এতে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেড়ে গেছে। আবার একটানা রান্না করলে ভয় লাগে, গরম হয়ে যায়। ছোট বাচ্চা থাকলে আরও চিন্তা হয়।

শান্তিনগর বাজার ঘুরে দেখা যায়, দোকানে সিলিন্ডার মজুদ থাকলেও ক্রেতা কম। হঠাৎ দাম বৃদ্ধির কারণে বাজারে কেনাবেচা কমে গেছে। বিক্রেতারা অলস সময় পার করছেন। অন্যদিকে ক্রেতারা বেশি দামের কারণে ক্ষুব্ধ।

গ্যাস কিনতে আসা রেজাউল ইসলাম বলেন, সিলিন্ডার কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আগে যে দামে কিনতাম, এখন সেই দামে পাওয়া যায় না। আবার শুনছি সামনে আরও বাড়বে। আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। কেউ আমাদের খবর রাখে না।

শান্তিনগরের বাসিন্দা শিউলি বেগম স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকেন। স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব রক্ষক। তিনি বলেন, আমাদের আয় তো বাড়ছে না, কিন্তু সবকিছুর রান্নাঘরে যুদ্ধের আঁচ দাম বাড়ছে। গ্যাসের দাম এভাবে বাড়লে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।

আরেক গৃহিণী রোজিনা বেগম বলেন, আগে ১৪০০-১৫০০ টাকায় কিনেছি। এখন ২০০০ টাকা ছাড়া কোথাও পাই না। বেশি টাকা দিলেই গ্যাস পাওয়া যায়।

এদিকে বিক্রেতাদের অভিযোগ, তারা নিজেরাও বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে কম দামে বিক্রি করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। শান্তিনগর বাজারের এক বিক্রেতা বলেন, আমরা ১৮০০ টাকা দিয়ে কিনে ৫০-১০০ বেশিতে বিক্রি করি। এর নিচে বিক্রি করলে আমাদের লোকসান। আরেক বিক্রেতা বলেন, এখন বিক্রি কমে গেছে। আগে দিনে ১২-১৩টা সিলিন্ডার বিক্রি হতো, এখন চার-পাঁচটাও বিক্রি হয় না।

মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এলপিজির দাম বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার অসঙ্গতি, তদারকির ঘাটতি এবং বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন দামে বিক্রির কারণে ভোক্তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক জায়গায় ডেলিভারি চার্জের অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমতুল্লাহ সময়ের আলোকে বলেন, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং দেশের জ্বালানি খাতে পরনির্ভরশীলতার কারণেই পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন না বাড়িয়ে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই তার প্রভাব সরাসরি দেশে পড়ে। এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, খাতে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নীতিনির্ধারণে সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। সঠিক পরিকল্পনা ও তদারকি থাকলে এ চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব ছিল।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য মিজানুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, এলপিজির দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে সিপি প্রাইস বৃদ্ধি। যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং পরিবহন ব্যয়ের প্রভাবও রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত দাম যাতে বাজারে কার্যকর থাকে, সে জন্য মনিটরিং জোরদার করা হবে।

বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ আহসানুল জব্বার সময়ের আলোকে বলেন, এলপিজির দাম নির্ধারণ আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়। বিশ্ববাজারে প্রোপেন-বিউটেনের দাম বাড়ায় দেশেও এর প্রভাব পড়েছে।

এএডি/


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: