পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ নির্বাচনে জয়লাভে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সমর্থন চায় বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঙ্গলবার বিকালে দিল্লি সফরে যাচ্ছেন। এই সফরে দুই দেশের সম্পর্ক পুনরায় ঘনিষ্ঠ করার পাশাপাশি জাতিসংঘের ভোটে দিল্লির সমর্থনের বিষয়টি গুরুত্ব দেবে ঢাকা। এ ছাড়া চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনায় জ্বালানি সহযোগিতা দুই পক্ষের বৈঠকের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে স্থান পাবে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের পর ঢাকার পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে দিল্লি সফর হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান মঙ্গলবার বিকালে দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে। দিল্লিতে মঙ্গলবার রাতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। এর আগে গত নভেম্বরে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে ড. খলিলুর রহমান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বুধবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এ ছাড়া একই দিনে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হারদ্বীপ সিং পুরির সঙ্গেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পৃথক বৈঠকের কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ সফরে জাতিসংঘের ভোট ইস্যুতে ভারতের সমর্থন চাওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। চলমান বৈশ্বিক সংকটে জ্বালানি ইস্যুও এ সফরে গুরুত্ব পাবে। এ ছাড়া সফরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা, নিরাপত্তা, সীমান্ত হত্যা, ভিসাসংক্রান্ত সমস্যা, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সার্ক (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা) পুনরুজ্জীবন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু আলোচনায় আসতে পারে।
দিল্লি সফর শেষে নবম ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে (ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলন) যোগ দিতে আগামী বৃহস্পতিবার সেখান থেকে মরিশাস সফরে যাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন এবং মরিশাস সরকারের আয়োজনে দেশটির রাজধানী পোর্ট লুইসে আগামী ১০ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হবে। চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ সম্মেলনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করাই এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য। এর আগে ২০২৩ সালের মে মাসে ঢাকায় ষষ্ঠ ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরের আগে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন জানিয়েছে, হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তারা দুই দেশের জাতীয় উন্নয়নসংক্রান্ত অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনগণকেন্দ্রিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে দ্বিপক্ষীয় সম্পৃক্ততা বিষয়ে আলোচনা করেন। হাইকমিশনার একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক ও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে এবং পারস্পরিক স্বার্থ ও কল্যাণের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের সঙ্গে একযোগে কাজ করার ক্ষেত্রে ভারতের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির সোমবার সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানি ছাড়াও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ইতিবাচক মানসিকতা থাকলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি নতুন ও সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। এ সময় দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন সরকারপ্রধান। জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে আগ্রহী ভারত।
দিল্লির একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের পটপরিবর্তনের পর ভারত সরকার একাধিক মাধ্যমে একাধিকবার বার্তা দিয়ে স্পষ্ট করেছে যে, বাংলাদেশের ভোটে নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করবে ভারত। গত ১২ ফেব্রুয়ারির বাংলাদেশের নির্বাচনের পর ভারতের এই বার্তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের স্পিকার এবং পররাষ্ট্র সচিব অংশ নেন। ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার নতুন সরকারের সব মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ দিয়েছেন। সর্বশেষ গত ২ এপ্রিল ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর সঙ্গে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ সাক্ষাৎ করেন, যা সম্পর্ক এগিয়ে নিতে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে।
ঢাকার একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ‘ডিপ স্টেট’ প্রসঙ্গ শোনা যায়। বিষয়টি যদি সত্য হয়, তবে ওই ডিপ স্টেটের অংশীদার হিসেবে ভারতও রয়েছে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না দিল্লি। পাশাপাশি বলা হচ্ছে, গত ১৭ বছরের অতীত পেছনে ফেলে নতুন গতিতে এগিয়ে যাবে দুই পক্ষের সম্পর্ক। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবিরের কাছে সাংবাদিকরা শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে হয়ে গেছেন। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ বলতে বাংলাদেশে এখন আর কিছু নেই। তবে বৈঠকে শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।