রাস্তায় বাস কম, ভাড়া বেশি

অলিউল ইসলাম

জাতীয়

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে দেশের পরিবহন খাত কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরিবহন মালিকরা সংকট নেই বললেও বাস্তবে

2026-04-08T00:31:27+00:00
2026-04-08T00:31:27+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
রাস্তায় বাস কম, ভাড়া বেশি
অলিউল ইসলাম
প্রকাশ: বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৩১ এএম 
সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে দেশের পরিবহন খাত কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরিবহন মালিকরা সংকট নেই বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। রাজধানীসহ সারা দেশে গণপরিবহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশেষ করে নারী যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। নির্ধারিত সময়ে বাস না পাওয়া, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং অনিরাপদ যাত্রা সব মিলিয়ে দৈনন্দিন দুর্ভোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমেছে এবং পণ্য পরিবহনও ব্যাহত হচ্ছে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। মোহাম্মদপুর, শাহবাগ, ফার্মগেট, মগবাজার, মিরপুর ও মহাখালীর মতো ব্যস্ত এলাকায় বাসের সংকট স্পষ্ট। গাবতলী ও সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে অনেক বাস নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যেতে পারছে না। ডিজেল সংকটের কারণে অনেক পরিবহন মালিক ট্রিপ বাতিল করছেন বা সময়সূচি পরিবর্তন করছেন। উত্তরাঞ্চলের কিছু রুটে প্রায় ৪০ শতাংশ দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।

শাহবাগে মিরপুরগামী বাসের অপেক্ষায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী শেখ তানিম বলেন, প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু বাস পাচ্ছি না। যেগুলো আসছে, সেগুলোতে ওঠার মতো জায়গা নেই। 

ফার্মগেটে এয়ারপোর্টগামী বাসের অপেক্ষায় থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী দিদারুল হাসান বলেন, আগে সহজেই বাস পাওয়া যেত, এখন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং ভাড়াও বেশি দিতে হচ্ছে। 

মহাখালীতে ময়মনসিংহগামী বাসের জন্য অপেক্ষমাণ ফারজানা ফেরদৌসী জানান, সময়মতো বাস না পাওয়ায় কর্মস্থলে দেরি হচ্ছে এবং বিকল্প পরিবহন নিতে গিয়ে খরচ বাড়ছে।

গণপরিবহন সংকটে নারী যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। বাস কম থাকায় অতিরিক্ত ভিড়ে ওঠানামা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলামোটরে রমনাগামী বাসের অপেক্ষায় থাকা রোজিনা বেগম বলেন, অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও বাস পাওয়া যায় না। যেগুলো আসে, সেগুলোতে উঠতে গেলে ধাক্কাধাক্কি হয়, এতে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। 

পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক গাড়ি সড়কে নামছে না। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনের কারণে সময়মতো জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অপারেটররা নিয়মিত ট্রিপ পরিচালনা করতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে সরবরাহ সীমিত থাকায় চালকরাও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

বসিলা থেকে আব্দুল্লাহপুর রুটে চলাচলকারী পরিস্থান বাসের সুপারভাইজর সারোয়ার আলম বলেন, আগের তুলনায় এখন গাড়ি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে ঠিকমতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ওয়েলকাম বাসের ম্যানেজার রুবেল বলেন, আগের মতো ট্রিপ দেওয়া যাচ্ছে না, অনেক গাড়ি গ্যারেজে রাখতে হচ্ছে।

হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার মাস্টার কামরুল জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের বাসের সংখ্যা কমেছে। আগে যেখানে ৫০টি বাস চলত, এখন তা ৪০টির মতো। নীলাচল পরিবহনের কন্ট্রোল ম্যানেজার শাওন বলেন, পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় ট্রিপ কমাতে হচ্ছে এবং কিছু বাস বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আগে যেখানে ৩০টি বাস চলত, এখন তা ১৫-২০টিতে নেমে এসেছে। এতে কর্মীদের কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়ছে।

তবে জ্বালানি সংকটের কারণে গণপরিবহন সংকটের বিষয়টি মানতে নারাজ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম। তিনি বলেন, যাত্রীদের বাসের কোনো অভাব নেই। কেবল পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন বাস রাস্তায় নামানো বন্ধ থাকায় কিছুটা ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। তার মতে, পিক-আওয়ারে যাত্রী চাপ বেশি থাকায় সংকট মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে গাড়ির সংখ্যা যথেষ্ট।

ঢাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারও কমেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় তিন লাখ ৫৭ হাজারের বেশি প্রাইভেটকার থাকলেও এর একটি বড় অংশ এখন নিয়মিত সড়কে নামছে না। জ্বালানি সংগ্রহে দীর্ঘ লাইনের ঝামেলা এড়াতে অনেকেই গাড়ি ব্যবহার সীমিত করছেন।

ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারকারীরা জানান, তেল সংগ্রহে সময় ও ভোগান্তি বাড়ায় প্রয়োজন ছাড়া গাড়ি বের করছেন না। এতে দৈনন্দিন চলাচলেও প্রভাব পড়ছে।

অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহন খাতেও। চট্টগ্রাম-ঢাকা, বেনাপোল-ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ভাড়া ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

বগুড়ার মহাস্থান হাট থেকে ঢাকায় সবজি পরিবহনের ভাড়া ১৬ হাজার থেকে বেড়ে ২৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ১০-১২ হাজার থেকে বেড়ে ১৫-২২ হাজার টাকায় উঠেছে। ট্রাকচালক ও মালিকরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রিপ কমে গেছে, ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং এর প্রভাব সরাসরি পণ্যের দামে পড়ছে।

ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের নেতারা জানান, আগে দিনে ৪-৫টি ট্রিপ দেওয়া গেলেও এখন ১-২টির বেশি সম্ভব হচ্ছে না। এতে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে।

এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই এবং পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীও একই ধরনের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে মাঠপর্যায়ে সেই আশ্বাসের প্রতিফলন এখনও দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।



  বিষয়:   মধ্যপ্রাচ্য  চলমান  যুদ্ধ  জ্বালানি  সংকট 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: