মাস্কাটে জিএসএ নিয়োগে অনিয়ম

রফিক রাফি

জাতীয়

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ওমানের মাস্কাট স্টেশনে জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) হিসেবে এম এস বাহওয়ান ট্রাভেল এজেন্সিস এলএলসির নিয়োগ ও চুক্তি

2026-04-08T02:32:39+00:00
2026-04-08T12:52:55+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বিমানের অডিট
মাস্কাটে জিএসএ নিয়োগে অনিয়ম
রফিক রাফি
প্রকাশ: বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৩২ এএম  আপডেট: ০৮.০৪.২০২৬ ১২:৫২ পিএম
সংগৃহীত ছবি
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ওমানের মাস্কাট স্টেশনে জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) হিসেবে এম এস বাহওয়ান ট্রাভেল এজেন্সিস এলএলসির নিয়োগ ও চুক্তি নবায়ন ঘিরে অনিয়ম, চুক্তি লঙ্ঘন এবং আর্থিক ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। 

দুর্বল পারফরম্যান্স, সেবার মানের অবনতি ও নিয়মভঙ্গের পরও এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তিন বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। বিমানের অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদনে মাস্কাট স্টেশনে বিভিন্ন অনিয়ম, আর্থিক ক্ষতি এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার চিত্রসহ নানা তথ্য উঠে এসেছে।  

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ওমানে বিমানের জিএসএ হিসেবে কাজ করছে এম এস বাহওয়ান ট্রাভেল এজেন্সিস এলএলসি। কিন্তু শুরু থেকেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি নবায়ন করা হয় এবং কমিশন ২.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা অডিট প্রতিবেদনে অস্বাভাবিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই চুক্তি নবায়নের প্রস্তাব আসে তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার শরিফুল আলমের কাছ থেকে। অডিট প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধেও অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে এই কোম্পানিকেই ওমানের কার্গো সার্ভিস এজেন্ট (সিএসএ) নিয়োগ দিতে একটি মহল কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০১৯ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময়কাল পর্যালোচনা করে তৈরি এই প্রতিবেদনে রাজস্ব আদায়, ব্যয় ব্যবস্থাপনা, বিক্রয় কার্যক্রম, কর্মচারী সুবিধা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে নানা অসংগতি চিহ্নিত করা হয়েছে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে। এতে বিমানের এ মাস্কাট স্টেশনের সামগ্রিক আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে মাস্কাট স্টেশন ১৫০ শতাংশ বিক্রয় অর্জন করে সন্তোষজনক পারফরম্যান্স প্রদর্শন করলেও পরবর্তী বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৩ শতাংশ কম ছিল। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে। 

২০২৪-২৫ অর্থবছরেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, যেখানে মোট বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১ শতাংশ কম অর্জিত হয়।
বিশেষ করে কার্গো ও অতিরিক্ত ব্যাগেজ (ঊইঞ) খাতে বড় ধরনের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। এসব খাতে যথাযথ উদ্যোগ না নেওয়ায় রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ধারাবাহিক লোকসানে স্টেশন : নিরীক্ষা প্রতিবেদনে মাস্কাট স্টেশনের লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত ছয়টি অর্থবছরেই স্টেশনটি লোকসানে পরিচালিত হয়েছে। সর্বমোট প্রায় ৩০৮ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরিচালন ব্যয় ও অবদান মার্জিন নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে, যা স্টেশনের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্রয় বৃদ্ধি ও কার্যকর বিপণন কৌশল গ্রহণ না করলে এই ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া ফ্লাইট পরিচালনায় সময়ানুবর্তিতার ক্ষেত্রেও মাস্কাট স্টেশনের পারফরম্যান্স সন্তোষজনক নয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে অন-টাইম পারফরম্যান্স (ঙঞচ) ছিল ৬৩ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ সালে কমে দাঁড়ায় ৫৮ শতাংশে। খারাপ আবহাওয়া, কারিগরি ত্রুটি এবং ইমিগ্রেশন জটিলতাকে এই বিলম্বের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবকে দায়ী করেছে নিরীক্ষা দল।

নিরীক্ষার সময় রাজস্ব সংক্রান্ত নথিপত্রের ঘাটতি ধরা পড়ে, যা একটি গুরুতর অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিছু ম্যানুয়াল রেভিনিউ ডকুমেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং যথাযথ ডকুমেন্ট কন্ট্রোল রেজিস্টারও সংরক্ষণ করা হয়নি। এতে আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাস্কাটে বিমানের জেনারেল সেলস এজেন্ট (এঝঅ) হিসেবে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান এমএস বাহওয়ান ট্রাভেল এজেন্সিস এলএলসির কার্যক্রমেও নানা অসংগতি ধরা পড়েছে। বিক্রয় কমে যাওয়া সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ রাজস্ব কমে গেছে। এ ছাড়া গ্রাহক চাহিদা অনুযায়ী অফিস সময়সীমা বাড়ানো হয়নি, যা বিক্রয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের তথ্যও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ওমান এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষকে অতিরিক্ত ট্যাক্স ও ফি প্রদান, হ্যান্ডলিং চার্জে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ, হুইলচেয়ার চার্জে অতিরিক্ত ব্যয় এবং হোটেল বিলেও অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা হয়েছে।

এ ছাড়া কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা খাতে একাধিক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিনোদন ভাতা, যাতায়াত ভাতা এবং সেটেলমেন্ট এলাউন্সে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংক হিসাব না থাকা ও অর্থ প্রেরণে জটিলতা : প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মাস্কাট স্টেশনের নিজস্ব কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। ফলে সব বিক্রয় আয় দুবাই স্টেশনে পাঠানো হয়, যা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি করছে। এই অর্থ যথাযথভাবে জমা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ নজরদারির সুপারিশ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে পূর্বের জিএসএ প্রতিষ্ঠানকে হঠাৎ সরিয়ে দিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠান এম এস বাহওয়ান ট্রাভেল এজেন্সিস এলএলসিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারি ক্রয়বিধির মৌলিক নিয়মগুলো উপেক্ষা করা হয়। এই কোম্পানিকে জিএসএ নিয়োগের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়নি, গঠন হয়নি যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য কোনো কমিটি, পূর্বের প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ জানানো হয়নি এবং নতুন প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই প্রক্রিয়াকে অডিট প্রতিবেদনে ‘অস্বচ্ছ ও প্রশ্নবিদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই কোম্পানিকে জিএসএ নিয়োগ দেওয়ার পর ওমান স্টেশনে বিমানের আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। আগে যেখানে প্রায় ১০ জন বাংলাদেশি কর্মী কাজ করতেন সেখানে এখন আছেন মাত্র ১ জন, নতুন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। আগে ৫৬টি সেলস কাউন্টার থাকলেও তা কমে এখন হয়েছে ১টি। কোনো কার্যকর সেলস বা মার্কেটিং কার্যক্রম নেই।  অফিস টাইম সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সীমিত করা হয়েছে। এতে প্রবাসী শ্রমিকরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্জিত হচ্ছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশি কর্মচারী না থাকায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে যাত্রীসেবায়। অনেক যাত্রী ভাষাগত সমস্যার কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন।

সেবার নিম্নমান ও কর্মীদের আচরণ নিয়ে অভিযোগ শুধু বিমানের অফিসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এমনকি বিষয়টি রয়েল ওমান পুলিশের কাছেও গড়িয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ রয়েছে।

প্রতিবেদনে মাস্কাট স্টেশনের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন,  বছরের চুক্তি পুনর্বিবেচনা, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নতুন জিএসএ নিয়োগ, বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ নিশ্চিত করা, অফিস সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও বিমান কর্তৃপক্ষ এখনও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে নি বলে জানা গেছে।  

ওমানে প্রায় সাত থেকে আট লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত। তাদের একটি বড় অংশ প্রতি বছর দেশে যাতায়াত করেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে।

টিকেট বিক্রি থেকে শুরু করে যাত্রী সহায়তা, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় বিপণন সবই তাদের দায়িত্ব। তাই এঝঅ হিসেবে যে প্রতিষ্ঠান কাজ করে, তাদের দক্ষতা সরাসরি প্রভাব ফেলে বিমানের রাজস্ব ও যাত্রীসেবার ওপর।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমানের ওমানের কান্ট্রি ম্যানেজার জে টি খান সময়ের আলোকে বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি, আগের ম্যানেজারের সময়ে অডিট হয়েছে। প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে। জিএসএ চুক্তির মেয়াদ এখনও আছে। কোনো অসংগতি আছে কি না তা দু-চার মাস পর বলা যাবে।

বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম সময়ের আলোকে জানান, তিনি এ বিষয়ে অবগত নন। সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে বিষয়টি জেনে তারপর  এ বিষয়ে কথা বলবেন।


  বিষয়:   বিমান  বাংলাদেশ  এয়ারলাইন্স  ওমান  মাস্কাট  স্টেশন 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: