মালিক-শ্রমিক দুই পক্ষই নাখোশ

এসএম আলমগীর

জাতীয়

জাতীয় সংসদে ‘শ্রম (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস হয়েছে বৃহস্পতিবার। এই বিল পাস হওয়ার পর মালিক-শ্রমিক উভয়পক্ষই নাখোশ। শ্রমিক পক্ষের চাওয়া

2026-04-12T00:39:07+00:00
2026-04-12T00:39:07+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
মালিক-শ্রমিক দুই পক্ষই নাখোশ
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: রোববার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৩৯ এএম 
সংগৃহীত ছবি
জাতীয় সংসদে ‘শ্রম (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস হয়েছে বৃহস্পতিবার। এই বিল পাস হওয়ার পর মালিক-শ্রমিক উভয়পক্ষই নাখোশ। শ্রমিক পক্ষের চাওয়া ছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার শ্রম সংশোধন বিল যেভাবে দিয়েছিল নতুন সরকার যেন হুবহু সেভাবেই পাস করে সংসদে। 

আর মালিক পক্ষের চাওয়া ছিল বিতর্কিত অনেক ধারা রাখা হয়েছিল শ্রম বিলে, সংসদে পাসের আগে সেগুলো যেন পরিবর্তন করা হয়। বৃহস্পতিবার সংসদে বিল পাস হওয়ার পর দেখা যায়, শ্রমিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আবার মালিকরা যেসব বিষয়ে পরিবর্তনের দাবি তুলেছিলেন তার সবগুলোও মানা হয়নি। এ কারণে বিল পাসের পর উভয়পক্ষই আপত্তি জানিয়েছে এবং বিভ্রান্তিকর বিষয়গুলো পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

শ্রম (সংশোধন) বিল বলা হয়েছে কোনো কারখানায় ২০ জনের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন করা যাবে। আবার আগে নারী শ্রমিকরা মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন ভোগ করতে পারলেও সেটি বাড়িয়ে ১২০ দিন করা হয়েছে। এভাবে বেশ কিছু পরিবর্তন বা নতুন ধারা সংযোজন করে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বিলটি উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। গত বছরের গত ১৭ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বিল আকারে পাসের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়। 

পাস হওয়া নতুন আইনে শ্রমিকদের স্বার্থে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে শতকরা হারের জটিলতা থাকছে না এবং সর্বনিম্ন ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতেই ইউনিয়ন গঠনের আবেদন করা যাবে। নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন বা চার মাস করা হয়েছে। এ ছাড়া বার্ষিক উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৩ দিনে উন্নীত করা হয়েছে এবং ১০০ বা তার বেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন এমন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিকের লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ তহবিল গঠন অথবা জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের প্রগতি স্কিমে অংশগ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে। এই আইনে কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা ও জেন্ডার সমতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

প্রথমবারের মতো ‘যৌন হয়রানি’র সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নারী প্রধান ‘অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি’ গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই কাজে নারী ও পুরুষের মজুরি বৈষম্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া গৃহকর্মী, কৃষি শ্রমিক ও নাবিকদের শ্রম আইনের নির্দিষ্ট ধারার আওতায় এনে তাদের অধিকারের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আইনে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন এবং যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি মনোনয়নের বিধান রাখা হয়েছে। 

এ ছাড়া এ আইনে জাতীয় পর্যায়ে শ্রম আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে জাতীয় সামাজিক সংলাপ ফোরাম গঠনসহ শ্রমবিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কর্তৃপক্ষ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কনভেনশন আনুসারে নাবিকের সংজ্ঞা বিস্তৃত করা হয়েছে। শ্রমিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অন্যায়ভাবে ‘ব্ল্যাক লিস্টিং’ করাকে অসৎ শ্রম আচরণ হিসেবে গণ্য করে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

বিলটি পাসের সময় অধিবেশনে জানানো হয় যে, এই আইন পাস হওয়া কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এবং শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের প্রতিফলন। এটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ড নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রাপ্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের বৃহত্তম একক রফতানি বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১১ দফার বাস্তবায়নেও এটি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। 

সরকার আশা করছে, এই আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক স্থাপিত হবে এবং দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাক খাতসহ সামগ্রিক শিল্পে ইতিবাচক ও স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হবে।

শ্রম বিলের ২৭ ধারায় শ্রমিকের রিজাইন বেনিফিটের যে বিধান রাখা হয়েছে তা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন মালিকরা। বলা হচ্ছে এই বিধানের ফলে শিল্পে শ্রম অসন্তোষের রাস্তা করে রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো শ্রমিক যদি একটানা ৩ বছর কোনো কারখানায় চাকরি করে চলে যান তা হলে ৭ দিনের বেনিফিট পাবেন। 

এর পরই আবার বলা হয়েছে, কোনো শ্রমিক যদি ৩ বছরের বেশি এবং ১০ বছরের কম সময় একটানা কোনো কারখানায় কাজ করেন তা হলে ১৫ দিনের বেনিফিট পাবেন। মালিকরা বলছেন, একবার বলা হলো ৩ বছর হলে বিনেফিট পাবেন ৭ দিনের, আবার বলা হলো ৩ বছরের বেশি ১০ বছরের কমে হলে ১৫ দিন। এটা দ্বিচারিতা এবং এর কারণে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি করা হবে। 

এ ছাড়া ট্রেড ইউনিয়নের বিধান নিয়েও আপত্তি আছে মালিকদের। বলা হচ্ছে এতে বহিরাগতদের স্বার্থসিদ্ধির জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। ২০ জন বহিরাগত দিয়ে শ্রমিক সংগঠন করা হলে কারখানার প্রকৃত শ্রমিকরা বঞ্চিত হবেন। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোাহম্মদ হাতেম সময়ের আলোকে বলেন, সংসদে পাস হওয়া শ্রম আইনটিতে অনেক বিভ্রান্তিকর ধারা রয়ে গেছে। এ ধারাগুলো সংশোধনের দাবি জানাচ্ছি আমরা। 

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্দেশনায় গত অন্তর্বর্তী সরকার ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ কমিটির সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে আইনের কিছু ধারায় কৌশলে অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি তৈরি করার অপচেষ্টা করেছিল, যাতে শিল্প খাতে শ্রম অসন্তোষের বীজ বপন করা হয়েছিল বলে বিকেএমইএ মনে করে। এতে শিল্প কলকারখানা ও শ্রমিক উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিদেশি ক্রেতা গোষ্ঠীর কাছেও নেতিবাচক বার্তা তৈরি হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘শিল্প কলকারখানায় শান্তিপূর্ণ উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরবর্তী শ্রম বিধি সংশোধন এবং পরবর্তী আইন সংশোধনের সময় এসব অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি দূর করার জন্য সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ থাকবে।’

এই ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, ‘শ্রমিকদের অন্যায়ভাবে কালো তালিকাভুক্ত করাকে অসৎ শ্রম আচরণ হিসেবে গণ্য করে শাস্তির বিধানকে আমরা স্বাগত জানাই। 

আবার একই সঙ্গে কোনো শ্রমিক নামধারী কেউ যদি অন্যায়ভাবে ও আইনবহির্ভূত দাবি নিয়ে শিল্প কলকারখানায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও উচ্ছৃঙ্খলতা সৃষ্টি, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জিম্মি করে মারধর, অবৈধ ধর্মঘট ও অন্য শ্রমিকদের কাজে বাধাদান ইত্যাদি কর্ম করে শিল্প কলকারখানা ও প্রকৃত শ্রমিকদের ক্ষতিসাধন করে তা হলে সেটাকে অসৎ শ্রম আচরণ হিসেবে গণ্য করে আরও কঠিন শাস্তির বিধান রাখা উচিত বলে আমরা মনে করছি।’

মোহাম্মদ হাতেম দাবি বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দূতাবাস, যারা বাংলাদেশের শ্রম আইন সংস্কার ও সংশোধনীতে নির্দেশনামূলক ভূমিকা রেখেছেন, তারা যেন বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের আন্তর্জাতিক ক্রেতা গোষ্ঠী ন্যায্য ও নৈতিক মূল্য দিচ্ছেন কি না, সেটাও তদারকি ও নজরদারিতে রাখেন। অন্যথায় দিনশেষে শিল্প কলকারখানা ও শ্রমিক উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

শ্রমিক নেতা তৌহিদুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘শ্রম বিলটি আমরা হুবহু পাসের আশায় ছিলাম, কিন্তু পাস হওয়ার পর দেখলাম অনেক ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নারী শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে বল হচ্ছে ১১২ দিন থেকে ১২০ দিনে নিয়েছে; কিন্তু আগের আইনে বলা ছিলÑ যে দিন থেকে ছুটিতে যাবে তখন তার বেনিফিট হবে পূর্ববর্তী তিন মাসের বেতনের গড় হিসাবে। নতুন আইনে বলা হয়েছে সর্বশেষ এক মাসের হিসাব গণ্য হবে। এতে ২০-৩০ হাজার টাকা মাতৃত্বকালীন বেনিফিট কমে যাবে। আবার ২০ শতাংশ হলেই ইউনিয়ন করতে পারবে বলা হচ্ছে; কিন্তু পূর্বের মতোই তিনটির বেশি সংগঠন থাকলে সে কারখানায় আর সংগঠন করা যাবে না বলা হচ্ছে এটাতে আমাদের আপত্তি আছে। আমরা এটারও পরিবর্তন চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রভিডেন্ট ফান্ড বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু চূড়ান্ত আইনে শ্রমিকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে করা হবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা নিয়েও আমাদের আপত্তি। যদি বাধ্যতামূলক থাকত তা হলে আমরা মালিকদের বাধ্য করতে পারতাম।’

নতুন শ্রম আইনে আরও যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে : শ্রম আইন ২০০৬-এর নারী শ্রমিকদের মহিলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সংশোধিত শ্রম আইনে সেটি পরিবর্তন করে কোনো নারী শ্রমিককে মহিলা উল্লেখ না করে নারী শ্রমিক হিসেবে উল্লেখের বিধান রাখা হয়েছে।

এতদিন শ্রম আইনে গৃহ শ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে উল্লেখ ছিল না, এখন থেকে গৃহ শ্রমিককেও শ্রমিক হিসেবে উল্লেখের বিধান রাখা হয়েছে। শ্রমিকের সংজ্ঞায় কর্মকর্তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা ছিল, সেটি বাদ দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত আইনে বলা হয়েছে কর্মকর্তারা তাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলাদা অ্যাসোসিয়েশন বা সমিতি গঠন করতে পারবে। 

জাতীয় পেনশন স্কিমে মালিক ৫০ শতাংশ এবং শ্রমিক ৫০ শতাংশ অর্থ দেবেন। তবে কোনো শ্রমিক পেনশন স্কিমে যুক্ত হতে না চাইলে তার ক্ষেত্রে মালিক ৫০ শতাংশ দিতে বাধ্য থাকবেন না।


  বিষয়:   জাতীয়  সংসদ  শ্রম  সংশোধন  বিল 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: