ভঙ্গুর অর্থনীতি আরও নাজুক হওয়ার শঙ্কা

এসএম আলমগীর

জাতীয়

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি প্রাপ্তি ঝুলে গেছে। রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কারে ব্যর্থতার কারণ দেখিয়ে ঋণের

2026-04-18T01:01:38+00:00
2026-04-18T01:01:38+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
আইএমএফের ঋণ প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা
ভঙ্গুর অর্থনীতি আরও নাজুক হওয়ার শঙ্কা
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১:০১ এএম 
প্রতীকী ছবি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি প্রাপ্তি ঝুলে গেছে। রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কারে ব্যর্থতার কারণ দেখিয়ে ঋণের পরবর্তী কিস্তি স্থগিত করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে অতিরিক্ত শর্তসহ একটি নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে আইএমএফের পক্ষ থেকে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে চলমান জ্বালানি সংকটসহ অর্থনীতিতে যে একরকম স্থবিরতা চলছে সেখান থেকে কিছুটা স্বস্তি আনতে হলে আইএমএফের ঋণের অর্থ দেশে আসা দরকার ছিল। যদি এখন সেটি না আসে তা হলে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি আরও নাজুক হয়ে যাবে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, যদি এই মুহূর্তে আইএমএফ ঋণ দেওয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়- তা হলে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকাসহ অন্য দাতা সংস্থাগুলোও পিছু হটবে বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে। তাই আইএমএফ ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব অর্থনৈতিক সংস্কারের শর্ত দিয়েছিল সেগুলো দৃশ্যমান করতে হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। এ ছাড়া আসন্ন জাতীয় বাজেট অহেতুক বড় না করে ছোট করতে হবে। 

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, আইএমএফের ঋণের পরবর্তী কিস্তির অর্থ ছাড়ের জন্য যে কাজগুলো করার কথা ছিল, সেগুলো থেমে গেছে। কিছু উদ্যোগ একেবারে থমকে আছে। মূলত এ জন্যই ঋণের অর্থ ছাড় স্থগিত করেছে। কথা হলো- কোনো দেশ সহায়তা চাইলে দাতা সংস্থার পক্ষ থেকে ক্রাইসিস মোকাবিলার যেসব শর্ত দেওয়া হয়- সেগুলো কতটা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেটি খুবই গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়। 
তবে আগের সরকার ও বর্তমান নতুন সরকারও এমন কিছু কাজ করেছে- যা দেখে দাতা সংস্থার মনে হয়েছে শর্তগুলো ঠিকমতো মানা হচ্ছে না। যেমন এই সরকার ব্যাংক কোম্পানি রেজ্যুলেশন-২০২৬ পাস করেছে সংসদে। এটা অনেকটা পিছু হটার মতো হয়েছে- যা ভালোভাবে নেয়নি আইএমএফ। কারণ ব্যাংক খাতের সংস্কারের বিষয়ে সংস্থাটি অনেক জোর দিয়েছিল। বলা হয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা- অথচ আগের গভর্নরকে যেভাবে বিদায় করা হলো, তাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কীভাবে থাকল। এ ছাড়া এক্সচেঞ্জ রেটের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে আগের মতো করে। অনেক ক্ষেত্রেই টেলিফোন করে বলা হয়েছে ১২২.৭৫ টাকার বেশিতে কেনা যাবে না- এটাও তারা ভালোভাবে নিচ্ছে না। ইতিমধ্যেই জানতে পারছি- আগামী বাজেট আসতে যাচ্ছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার। অথচ আইএমএফ বাজেট সংকোচন করতে বলেছে। এই সংকটের সময় বাজেটকে অহেতুক টেনে বড় করার কোনো দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।
আরও পড়ুন

যা বলা হয়েছে আইএমএফের পক্ষ থেকে : মূলত কম রাজস্ব আহরণ ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের কারণে অনিশ্চয়তা দেখা গেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি প্রাপ্তিতে। যার পরিমাণ ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এই ঋণ পেতে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

আজ শনিবার সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের চলমান বসন্তকালীন বৈঠকে ঋণের বিষয়ে আরও আলোচনা হবে। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত থাকবেন। বৈঠক শেষে এই বিষয়ে কথা বলবেন অর্থমন্ত্রী।

সংস্থাটি জানায়, চলমান ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

আইএমএফ বলছে, কাক্সিক্ষত সহযোগিতা পেতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে বাংলাদেশকে। ওয়াশিংটনে চলমান বসন্তকালীন বৈঠকে বাংলাদেশকে এমন বার্তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। যদিও অর্থমন্ত্রীর দাবি, আগামী দিনে বাংলাদেশে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবস্থানে দাতাসংস্থাগুলো।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভার চতুর্থ দিনের সংবাদ সম্মেলনে বৃহস্পতিবার আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশ সংস্কার কার্যক্রম কতটা এগিয়ে নিচ্ছে, সেদিকেই নজর রাখছে আইএমএফ। এর ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের অর্থছাড়। 

এছাড়া সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া ব্যাংক রেজুলেশন বিলে সরকার ১৮ক ধারা যুক্ত করে রেজুলেশনের জন্য তালিকাভুক্ত করা ব্যাংকগুলোতে পুরোনো মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ।

সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাজেটের অর্থ ব্যবহারের সরকারি পরিকল্পনারও সমালোচনা করেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, আমানতকারীদের পাওনা মেটাতে বাজেট থেকে অর্থ খরচ না করে ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স স্কিম বা অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়া উচিত।

ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের চলমান বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের এক সদস্য গণমাধ্যমকে জানান, গত দুদিনের বৈঠকে ঋণের পরবর্তী কিস্তি না ছাড়ের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। এ অবস্থায় চলমান ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার যে আশা করছে বাংলাদেশ, তা জুনের মধ্যে ছাড় করা হবে না বলে বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি। বর্তমান কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এখনও মোট ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার পাবে, যার মেয়াদ আগামী জানুয়ারিতে শেষ হবে।

অন্যদিকে বর্তমান কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের কঠোর অবস্থানের কারণে ওয়াশিংটনে অবস্থানরত বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল তুলনামূলক সহজ শর্তে অতিরিক্ত অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও আলোচনা করছে বলে জানা গেছে। 

জানা যায়, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময় ২০২৩ সালে আইএমএফের সঙ্গে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি সই করে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঋণের পরিমাণ আরও ৮০০ মিলিয়ন ডলার বাড়ানো হয়। ফলে ঋণ কর্মসূচির মোট আকার দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্য থেকে বাংলাদেশকে মোট ৩ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের অর্থ ছাড় করেছে আইএমএফ।

গত ডিসেম্বরে আরেকটি কিস্তি পাওয়ার কথা থাকলেও নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করে ঋণের অর্থ ছাড় করার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে তা আটকে রাখে সংস্থাটি। ডিসেম্বরের বকেয়া কিস্তির সঙ্গে আগামী জুনের একটি কিস্তি মিলিয়ে জুন মাসেই ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার আশা করেছিল বাংলাদেশ।

ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন জানান, তিনি সাম্প্রতিক বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর সঙ্গে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। 

তবে এদিন বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে অর্থায়নে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে দাতা সংস্থাগুলো। অর্থমন্ত্রী দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গেও বৈঠক করেন। যেখানে আলোচনা হয় দুই দেশের বাণিজ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে।

ঋণের অর্থ না পেলে কী পরিস্থিতি দাঁড়াবে : যদি ঋণের অর্থ ছাড় না মেলে তা হলে অর্থনীতিতে নতুন অনেক সংকট দেখা দেবে বলে মনে করছেন ড. জাহিদ হোসেন। 

তিনি সময়ের আলোকে বলেন, যদি সংস্থাটি ঋণের অর্থ ছাড় না করে তা হলে বিশ্বব্যাংকও পিছু হটবে। বিশ্ব ব্যাংক থেকে যে বাজেট সহায়তা পাওয়ার কথা সেটিও ঝুলে যেতে পারে। 

আইএমএফের পর বিশ্ব ব্যাংকও যদি ঋণ না দেয় তা হলে এডিবি, জাইকাসহ অন্য দাতা সংস্থাগুলোও পিছু হটবে। ফলে কোনো সংস্থা থেকেই সহজে ঋণ মিলবে না।

তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ অনেক খাতে এর প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে রফতানিতে ধাক্কা লেগেছে, আমদানি ব্যায় বাড়ছে- এতে সংকট আরও বাড়বে। যদিও রেমিট্যান্স এখনও ভালো- তবে সামনে এটাও খারাপ হতে পারে। যে হারে আমদানি ব্যয় বেড়েছে তাতে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি বেড়েছে। হয় ডলারের দাম বাড়তে দিতে হবে, নতুবা আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেটার পরিণামও তো ভালো হবে না। পণ্যমূল্য বেড়ে যেতে পারে। এভাবে নানা ধরনের সংকটে পড়বে বাংলাদেশ। এ জন্য বাজেটের আকার ছোট করা দরকার। 

পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় : করণীয় বিষয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সবার আগে নিজেদের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। সরকারের তরফ থেকে যদিও বলা হচ্ছে- বিকল্প সোর্স থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। যেখানে আইএমএফ না দেবে- তখন আর কে দেবে ঋণ। তাই সরকারকে ব্যয় সংকোচন নীতি নিতে হবে অথবা সরকার এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আইএমএফকে দেখাক যে তাদের শর্ত পরিপালনে সরকার সচেষ্ট।

এএডি/


  বিষয়:   আইএমএফ  ঋণ  অনিশ্চয়তা  অর্থনীতি 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: