প্রথমবার এমপি হয়েই মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়া শেখ রবিউল আলম একাই দায়িত্ব পেয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মতো বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়ের। আগে যেখানে এসব মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রী একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতেই চাপের মুখে পড়তেন সেখানে নতুন একজনের পক্ষে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তা ছাড়া কাজের চাপ কমাতে এই মন্ত্রণালয়গুলোতে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে হাবিবুর রশীদ এবং রাজিব আহসানকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও মাথার ওপরে মন্ত্রী থাকায় এককভাবে তারাও সব সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার কারণে কাজের গতি কমছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তারা বলছেন, শুধু এই তিনটি মন্ত্রণালয় নয়, এরকম আরও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এমনিতেই নিজেরা নতুন, অন্যদিকে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ায় মন্ত্রীদের অনেক ক্ষেত্রেই আমলাদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্যদিকে কম গুরুত্বপূর্ণ বা ছোট মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী এবং উপদেষ্টাকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে কোনো কোনো প্রতিমন্ত্রী অনেকটা অলস সময় পার করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে আরও গতিশীল করতে এখন ‘এক মন্ত্রীর হাতে একটি মন্ত্রণালয়’ নীতি অনুসরণের কথা ভাবা হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অভিজ্ঞ ও নতুনদের সমন্বয়ে ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে গঠিত হয় বিএনপির নতুন সরকার। এ ছাড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ১০ জনকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এবার অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী প্রথমবারই দায়িত্ব পেয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রণালয়ের। আবার সিনিয়র নেতাদের কেউ কেউ কম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। পাশাপাশি একাধিক মন্ত্রণালয় একজন মন্ত্রীর অধীনে এনে সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী রাখা হলেও কাজের সমন্বয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
টেকনোক্র্যাট হিসেবে মন্ত্রিসভার সদস্য মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে শপথ নেওয়ার পর কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে কয়েক দিন পর তার কাছ থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সরিয়ে নিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারীকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া আব্দুল মুক্তাদিরকে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, আরিফুল হককে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, আবু জাফর মোহাম্মদ জাহিদ হোসেনকে সমাজ কল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক এবং প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারীকে খাদ্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গুচ্ছ মন্ত্রণালয়ের ধারণা থেকেই সরকার সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন মন্ত্রীকে দিয়েছিল যাতে কাজের সমন্বয় করা সহজ হয়।
যেমন খাদ্য, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাজ একটি অন্যটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। একইভাবে সড়ক পরিবহন, নৌপরিবহন ও রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং শিল্প, বস্ত্র, পাট ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাস্তবে এসব মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি এত বড় যে একজন মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে ঠিকমতো কাজ করা তার পক্ষে অনেকটাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। তা ছাড়া সচিবালয়ের ভেতরে এসব মন্ত্রণালয় আলাদা ভবনে হওয়ায় মন্ত্রীকেও এক মন্ত্রণালয় থেকে আরেক মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। আবার শিল্প ও রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় সচিবালয়ের বাইরে হওয়ায় কোনো মন্ত্রণালয়েই ঠিকমতো সময় দিতে পারেন না অনেক মন্ত্রী।
এমন পরিস্থিতিতে মন্ত্রিসভা গঠনের দুই সপ্তাহ পর গত ৪ মার্চ আট প্রতিমন্ত্রীর দফতর পুনর্বণ্টন করা হয়। প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মো. শরীফুল ইসলামকে শুধু বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়; কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়; সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদকে রেলপথ এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে; সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসানকে নৌপরিবহন ও সেতু বিভাগে; অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিকে (জোনায়েদ সাকি) পরিকল্পনা, মহিলা ও শিশু এবং সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীনকে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়; শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুরকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে; শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে শুধু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কর্মকর্তারা জানান, প্রতিমন্ত্রীদের নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের মাথার ওপরে একজন করে মন্ত্রী থাকায় তারা এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সময়ক্ষেপণ ও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুজন করে অর্থাৎ একজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার তথ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীদের তেমন কোনো কাজ না থাকায় অলস সময় কাটাতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। যেমন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রী থাকার পর প্রতিমন্ত্রীর তেমন কোনো প্রয়োজন হয় না বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
অন্যদিকে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে হেভিওয়েট মন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাকে দায়িত্ব দেওয়ায় সিদ্ধান্ত নিতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তা ছাড়া অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ে একজন করে প্রতিমন্ত্রী দেওয়ায় তাদের জন্য নতুন করে অফিস বানাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে গণপূর্ত বিভাগকে। কারণ অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী একজনের জন্য অফিস সাজানো রয়েছে। এখন অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ে একজন করে প্রতিমন্ত্রী থাকায় প্রতিমন্ত্রী এবং তাদের পিএস ও এপিএসের অফিস সাজানোর জন্য কক্ষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কাজে আরও গতিশীলতা এবং সমন্বয় নিশ্চিত করতে ‘এক মন্ত্রীর হাতে এক মন্ত্রণালয়’ নীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তা।
অন্যদিকে সরকার গঠনের দুই মাস পূর্ণ হওয়ায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়ন শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা আগামী ১৮০ দিন বা ছয় মাস ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকবে। একে জবাবদিহি নিশ্চিতের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, সরকারের একাধিক মন্ত্রীর অপ্রাসঙ্গিক ও বিতর্কিত মন্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বিব্রত। বিশেষ করে নিজের মন্ত্রণালয় ছেড়ে অন্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে মন্তব্য করা এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীদের কাজে সমন্বয়হীনতা দেখে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। তাই সরকারকে আরও গতিশীল করতে এখন ‘এক মন্ত্রীর হাতে একটি মন্ত্রণালয়’ নীতি অনুসরণের কথা ভাবা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে শিগগিরই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীদের শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। আবার কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে শুধু প্রতিমন্ত্রীকে এককভাবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
তবে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সময়ের আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাজের সমন্বয়ের সুবিধার্থে সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছেন। যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থা অর্থাৎ নৌ, সড়ক পরিবহন ও রেলপথ মন্ত্রণালয় একটি অন্যটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই গুচ্ছ মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থেই একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে। একইভাবে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও একটি অন্যটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। দুটি মন্ত্রণালয়ই কৃষি সেক্টরের। ফলে একজনকে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কারণে কাজের সমন্বয়হীনতা নয়, বরং সমন্বয় করতে আরও সহজ হবে।
তিনি বলেন, মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীরা নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন। তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয়হীনতা নেই।