দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম ডিজেলনির্ভর। পাশাপাশি ক্ষেত প্রস্তুত থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্তও ডিজেল প্রয়োজন। অথচ কৃষক প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। একদিকে সংকট অন্যদিকে ডিজেলের মূল্য লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধির ফলে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের কৃষি খাতে।
জ্বালানির সংকট নেই বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ডিজেলচালিত পাম্পগুলোর বেশিরভাগই জ্বালানি সংকটের কারণে অচল হয়ে পড়ে আছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ ছাড়া হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও ডিজেল সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে সময়মতো ধান কাটতে না পারার আশঙ্কার পাশাপাশি বাড়তি খরচের চাপে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
অন্যদিকে গ্যাস সংকটে একের পর এক সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং যুদ্ধের কারণে আমদানিনির্ভর সারের বড় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
তারা বলছেন, আগামী বোরো মৌসুম শুরুর আগেই প্রয়োজনীয় সার আমদানি ও উৎপাদন নিশ্চিত করা না গেলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে বর্তমানে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর প্রায় ২৪ শতাংশ অর্থাৎ ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন ব্যবহার হয় কৃষিকাজে। দেশের ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রমও ডিজেলনির্ভর।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ ও ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প আছে। এসবের বড় অংশই ডিজেলচালিত। এ ছাড়া ১০ হাজার কম্বাইন হার্ভেস্টার, কয়েক লাখ রিপারসহ মাড়াই-ঝাড়াই ও অন্য যন্ত্র রয়েছে ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৮০৫টি। সব মিলিয়ে প্রায় ১৯ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি আছে, যার ৭৫ শতাংশই ডিজেলচালিত।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া আরও কঠিন হবে। আবার বাজারে খাদ্যের দাম বাড়ায় গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষের খরচ বাড়বে। বিশেষ করে চালের দাম বেড়ে গেলে গরিব মানুষের কষ্ট যেমন বাড়বে তেমনই অন্য খরচেও এর প্রভাব পড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। তা ছাড়া খরচ বাড়লে কৃষকের লাভের মুখ দেখার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায়। এমনিতেই বর্তমানে ভারত থেকে চাল আমদানি চালু থাকায় আমন ধানের দাম কমেছে। ফলে আসন্ন বোরো ধানের ভালো দাম পাওয়া নিয়েও তারা শঙ্কায়। এর মধ্যে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব কৃষি খাতসহ সবকিছুতেই পড়বে। নিশ্চিতভাবে কৃষকের খরচ বড় আকারে বেড়ে যাবে। মাঠে থাকা বোরো ঘরে তোলা, মাড়াই ও পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে চালের দামও বাড়বে। কৃষকদের বর্ধিত এ ব্যয় ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে পুষিয়ে দিতে হবে। না হলে পরবর্তী উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হবে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। কারণ কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে আগামীবার উৎপাদন করবেন না এটাই স্বাভাবিক।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের কৃষি ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দাম বাড়লেও ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের বর্ধিত খরচ সমন্বয়ে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, দেশের মোট ধান উৎপাদনের ৫৪ শতাংশই উৎপাদিত হয় বোরোর মৌসুমে। এ সময় উৎপাদন বিঘ্নিত হলে তা খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। তা ছাড়া বর্তমানে কৃষকদের নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে। এতে ধানের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায় কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তিনি জানান, বর্তমানে আমাদের ইউরিয়া সারের ব্যবহার প্রায় ২৭ লাখ টন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয়। বাকি ১৭ লাখ টনের বেশিরভাগই আসে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। বর্তমান সংঘাতের কারণে আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে মোট পাঁচটি ইউরিয়া উৎপাদন ফ্যাক্টরি আছে। এর চারটিই গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তায় বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় সারের প্রায় ৮০ শতাংশই এখন আমদানি করতে হয়। বর্তমানে বোরো মৌসুমের জন্য সারের কোনো সমস্যা নেই। তবে আগামী আউশ ও আমন মৌসুম এবং পরবর্তী রবি মৌসুমের জন্য সার সরবরাহ বাড়ানো দরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারা দেশের জন্য ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ৫৭ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিকটন। এর মধ্যে জুলাই থেকে এপ্রিলে ইতিমধ্যে ৫৪ লাখ ৭৯ হাজার মেট্রিকটন সার বিতরণ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে মে মাসের জন্য আগাম ৬৩ হাজার টন সার বিতরণ করা হয়েছে এবং জুন মাসের জন্য চাহিদা এসেছে ৭১ হাজার টন। এই পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে বড় সংকট না হলেও আগামী বোরো মৌসুমের আগেই পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।
অন্যদিকে কৃষকদের পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
তিনি বলেন, কৃষি খাতের জন্য জ্বালানি তেলের সমস্যা হবে না। হার্ভেস্টারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের সরবরাহ রয়েছে। হাওড়াঞ্চলের ধান যথাসময়ে কাটার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কৃষকদের সেচ খরচ কমাতে ধাপে ধাপে সোলার সিস্টেমে রূপান্তর করা হবে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, এতে জ্বালানি নির্ভরতা কমবে এবং কৃষি উৎপাদন আরও লাভজনক হবে। কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যয় কমাতে সরকার ডিপ টিউবওয়েল ও শ্যালো মেশিনে সোলার সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি। এ জন্য কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়া হবে, ফলে অর্ধেক খরচে সোলার সুবিধা পাবেন তারা।
এফআর