ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে সম্পদের দিক থেকে জামায়াতে ইসলামীর ১১ দলীয় জোটের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি জোটের প্রার্থীরা। দলটির ৩৬ প্রার্থীর মধ্যে ১৬ জনই কোটিপতি। সম্পদের পাশাপাশি মামলাও বেশি রয়েছে বিএনপি জোটের প্রার্থীদের নামে। অন্যদিকে জামায়াত জোটের ১২ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র একজন কোটিপতি। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে দুদলের প্রার্থীরাই প্রায় সমান অবস্থানে রয়েছেন।
বিএনপির কোটিপতি প্রার্থীরা হলেনÑ সেলিমা রহমান, শিরীন সুলতানা, নিপুণ রায় চৌধুরী, শওকত আরা আক্তার, ফাহিমা নাসরিন, সুলতানা আহমেদ, বীথিকা বিনতে হোসাইন, ফেরদৌসী আহমেদ, শামীম আরা বেগম স্বপ্না, আন্না মিন্জ, সানজিদা ইসলাম তুলি, সাবিরা সুলতানা, মাহমুদা হাবীবা, হেলেন জেরিন খান, নেওয়াজ হালিমা আরলী এবং রাশেদা বেগম হিরা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদ রয়েছে ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরীর। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, নিপুণ রায়ের সাড়ে ১০ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ ও ৫০২ ভরি স্বর্ণ রয়েছে। এ ছাড়া তার স্বামী অমিতাভ রায়ের নামে রয়েছে আরও ১০০ ভরি স্বর্ণ। সব মিলিয়ে ৬০২ ভরি স্বর্ণালংকারের মালিক নিপুণ-অমিতাভ দম্পতি। যেগুলো উপহার হিসেবে পেয়েছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, নিপুণ রায়ের বার্ষিক আয় প্রায় ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর মধ্যে আইন পেশা থেকে বছরে ২৬ লাখ টাকা এবং শেয়ার ও ব্যাংক আমানত থেকে আরও প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা আয় করেন। তার ব্যাংকে এক কোটি ১৩ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে। এক কোটি ১১ লাখ টাকা মূল্যের দুটি গাড়ি এবং ৮৫ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাটও রয়েছে। এই নেত্রীর স্বামীর নামে অস্থাবর সম্পদের মূল্য সাড়ে তিন কোটি টাকার বেশি। আর নগদ অর্থ হিসেবে স্বামী-স্ত্রী মিলিয়ে তাদের কাছে ৭৬ লাখ টাকা রয়েছে। এর মধ্যে ১৩ লাখ ২৯ হাজার টাকা রয়েছে নিপুণ রায়ের নিজের নামে। তবে তার নামে এক কোটি ১৯ লাখ টাকার ব্যাংক ঋণ ও অন্যান্য দায়ও রয়েছে।
অন্য প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানের সম্পদের পরিমাণ ৬ কোটি ৮৮ লাখ ৯৫ হাজার ৭৩৭ টাকা। ৮৫ বছর বয়সি এই প্রবীণ নেত্রীর বার্ষিক আয় ৩৬ লাখ টাকার বেশি। বিএনপির আরেক প্রার্থী হেলেন জেরিন খানের সম্পদের পরিমাণ ৬ কোটি ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৪৯৫ টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক আমানত ও নগদ অর্থ ছাড়াও ৫০ ভরি স্বর্ণ ও ১৪ লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গাড়ি রয়েছে। স্থাবর সম্পদের মধ্যে ৩০ কাঠা জমির ৬টি প্লটের মূল্য দেখিয়েছেন ৭৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮০০ টাকা। ঢাকায় ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের একটি এবং কুমিল্লায় ২৯ লাখ ৬২ হাজার ৪০০ টাকা মূল্যের দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। হেলেনের বৈদেশিক মুদ্রা ১ কোটি ৭৩ লাখ ১৩ হাজার ২৭৭ টাকা এবং স্বামীর কাছ থেকে ৬৫ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা হলেও সব মামলায় অব্যাহতি পান।
এ ছাড়া শামীম আরা বেগম স্বপ্না জমি বিক্রির বড় অঙ্কের আয়সহ ৪ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য দিয়েছেন। রেহেনা আক্তার রানুর রয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ। এ ছাড়া সানজিদা ইসলাম তুলি ২ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ ও ৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন। পেশায় ব্যবসায়ী বীথিকা বিনতে হোসাইন অর্জনকালীন সম্পদের মোট মূল্য ২ কোটি ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৭৮১ টাকা উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ৩২ লাখ ৯৫ হাজার ৭৮১ টাকা। স্বর্ণ রয়েছে ৭০ ভরি। বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পত্তি থেকে ভাড়া ৮৪ হাজার টাকা।
অন্যদিকে সম্পদের বিচারে অনেকটাই পিছিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা। এই জোটের ১২ প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র কোটিপতি প্রার্থী হচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক সাবিকুন্নাহার মুন্নী। তার সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৩৮ লাখ ৩৮ হাজার ৩১৬ টাকা। তার বছরে আয় ১৬ লাখ ৭ হাজার ২৫০ টাকা। এই নারী নেত্রীর ১৩ ভরি স্বর্ণ এবং ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা মূল্যের একটি প্রাইভেটকার রয়েছে। এ ছাড়া তার অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য দেখিয়েছেন ৮৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা। রাজধানীর উত্তরায় ৮ লাখ ৮ হাজার ৫০০ টাকার জমি রয়েছে। সাবিকুন্নাহারের স্বামীর নামে থাকা অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য ২ কোটি ৪৯ লাখ ৯২ হাজার ১৩০ টাকা এবং স্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য দেখানো হয় ১৬ কোটি টাকা।
জামায়াত জোটের প্রার্থী নূরুন্নিসা সিদ্দীকার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ টাকা এবং বার্ষিক আয় ১ লাখ ৬১ হাজার টাকা। একই জোটের প্রার্থী এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. মাহমুদা আলম মিতুর স্থাবর সম্পদ না থাকলেও ৩১ লাখ ২৮ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ ও ৩০ ভরি স্বর্ণালংকার রয়েছে। তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকা। তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) চেয়ারম্যান তাসমিয়া প্রধানের আয় তার স্বামীর চেয়ে বেশি দেখিয়েছেন। হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাসমিয়া প্রধানের বার্ষিক আয় স্বামী এসবিএ সিদ্দিকীর চেয়ে বেশি। ২০২৫ সালের আয়কর বিবরণী অনুযায়ী, তাসমিয়া প্রধানের বার্ষিক আয় ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৭৯৪ টাকা।
অন্যদিকে তার স্বামীর বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮০ টাকা। পেশায় ব্যবসায়ী স্বামীর তুলনায় আয়ের দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও মোট সম্পদের হিসেবে স্বামীর চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে আছেন তিনি। ব্যক্তিগত সম্পদের বিবরণে তাসমিয়া প্রধান জানিয়েছেন, তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৬৭ লাখ ২৯ হাজার ১৯৩ টাকা। বিপরীতে তার স্বামীর মোট সম্পদ রয়েছে ৭৫ লাখ ৮৭ হাজার ৭৬৩ টাকার। নিজের অস্থাবর সম্পদের বর্ণনায় এই নারীপ্রার্থী ২০ তোলা স্বর্ণের কথা উল্লেখ করেছেন, যার বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া তার ৫ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক পণ্য ও ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকার আসবাবপত্র রয়েছে। সব মিলিয়ে তার অর্জিত অস্থাবর সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য ৩৫ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭৬ টাকা। স্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে তাসমিয়া প্রধান উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি ফ্ল্যাটের তথ্য দিয়েছেন। ১ হাজার ৫৯০ বর্গফুটের এই ফ্ল্যাটটি তিনি বাবার মৃত্যুর পর পেয়েছেন। তবে হলফনামায় এই ফ্ল্যাট কিংবা অন্য কোনো স্থাবর সম্পদের নির্দিষ্ট কোনো বাজারমূল্য উল্লেখ করা হয়নি।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র জোটের একমাত্র প্রার্থী সুলতানা জেসমিন জুঁইয়ের সম্পদের পরিমাণ সাড়ে ২৮ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করেছেন। তার বার্ষিক আয় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশা : বিএনপি জোটের প্রার্থীদের মধ্যে আইন পেশায় রয়েছেন ৯ জন। অন্যদিকে এ পেশায় জামায়াতে ইসলামীর আছেন দুজন। দুদলে একজন করে চিকিৎসা পেশায় আছেন। জামায়াত জোটে তিনজন আছেন শিক্ষকতা পেশায় ও একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে তৈরি পোশাক ব্যবসায় রয়েছেন। এ ছাড়া জামায়াত জোট থেকে প্রার্থী হয়েছেন জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম। হলফনামায় তিনি বর্তমান পেশা হিসেবে গৃহিণী দেখিয়েছেন। তবে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএসসি।
বিএনপি জোটের ৩৩ প্রার্থীর (৯২ শতাংশ) বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও জামায়াত জোটের কারও বিরুদ্ধেই কোনো মামলার তথ্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ৫৩ প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার বাছাইকালে বিএনপি জোটের ৩৬ প্রার্থীর মধ্যে সবার এবং স্বতন্ত্র জোটের একমাত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। জামায়াত জোটের ১৩ প্রার্থীর মধ্যে ১২ জনের বৈধ ও একজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়। এ ছাড়া কোনো দল বা জোটের পরিচয় এবং প্রস্তাবক ও সমর্থকের স্বাক্ষর না থাকায় অন্য তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্রও বাতিল করেছে ইসি। ফলে চূড়ান্ত বাছাইয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে বৈধ বলে বিবেচিত হন ৪৯ প্রার্থী।
তফসিল অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিলের সময় শেষ হয়েছে গত ২৬ এপ্রিল। আপিল নিষ্পত্তি শুরু হয় গতকাল, যা শেষ হবে আজ। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় আগামীকাল এবং প্রতীক বরাদ্দ আগামী ৩০ এপ্রিল। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ১২ মে।