বর্তমান জাতীয় সংসদকে ‘মজলুমের সংসদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বর্তমান জাতীয় সংসদে এমন কোনো সংসদ সদস্য নেই, যিনি জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হননি। এটি হলো মজলুমের সংসদ। তাই দেশের মানুষের মুক্তির কাফেলায় শরিক হয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে নিয়ে আমাদের একসঙ্গে বাঁচতে হবে। আমি সবাইকে আহ্বান করতে চাই, আমরা কি সেই সূর্যকে উঠতে দেব নাকি আবার অন্ধকারে তলিয়ে দেব? আমি চাই এই সুযোগটাকে যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে চিফ হুইপ বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমাদের দল, মত কিংবা কর্মসূচি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তাদের দায়মুক্ত, ফ্যাসিবাদমুক্ত, স্বাধীন, সার্বভৌম, নিরাপদ এবং স্বাবলম্বী মানবিক একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকবে না, থাকতে পারে না।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের সমাপনী দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর ধন্যবাদ বক্তব্যে চিফ হুইপ এসব কথা বলেন।
মো. নূরুল ইসলাম বলেন, পিঁপড়ারা যেমন একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বল তৈরি করে এবং পালাক্রমে উপরে-নিচে গিয়ে শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকে, তেমনি এই সংসদের সদস্যরাও ঐক্যবদ্ধভাবে দেশটাকে বাঁচিয়ে নিজেরা বেঁচে থাকার দায়িত্ব নিয়েছেন।
তিনি বলেন, এখানে (সংসদে) এমন অনেক সদস্য আছেন, যারা অতীতে মামলা, জেল-জুলুম এবং পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কাজেই আমাদের একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই ও বাগ্যুদ্ধ করা উচিত নয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণতন্ত্র কোনো ব্যাডমিন্টন বা টেনিস খেলা নয় যে, বল এপাশ থেকে ওপাশে যাবে এবং এক পক্ষ জিতে যাবে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা এই গণতন্ত্রকে কোথায় নিয়ে যেতে চাই। আমরা কি এখানে শেষ করতে চাই, নাকি পাঁচ বছর বা তার বেশি (সময় ধরে) টানতে চাই? আমরা যদি সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত না নিই, তবে অন্য কেউ এসে এখানে চেয়ার দখল করবে এবং আমাদের উভয়কেই বিপদে ফেলবে।
চিফ হুইপ বলেন, বর্তমান সময় হলো একটি গভীর অন্ধকার (যেখানে আয়নাঘর, টর্চার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি ছিল) থেকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বেরিয়ে আসার সময়। তিনি মার্টিন লুথার কিং-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সতর্ক করেছেন যে, যদি আমরা ভাইয়ের মতো ঐক্যবদ্ধ না হই, তবে নির্বোধের মতো সবাইকে মৃত্যুবরণ করতে হবে।
ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ বা কর্মসূচি থাকলেও একটি দায়মুক্ত, ফ্যাসিবাদমুক্ত, নিরাপদ এবং স্বাবলম্বী মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় কারো মধ্যে বিরোধ থাকা উচিত নয়।
ঐক্যবদ্ধ থাকার সুফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেমন ব্যক্তিগত লাভের তোয়াক্কা না করে প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইভাবে, তেল ও গ্যাসের সমস্যার সমাধানে বিরোধী দলের প্রস্তাব গ্রহণ করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করার চেষ্টা করা হয়েছে। যখনই আমরা ভালো বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হই, বাইরে মানুষের হাহাকার কমে যায়।
ঐতিহাসিক জঞ্জাল ও বিএনপির ভূমিকা প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, বিএনপি ঐতিহাসিকভাবেই বিভিন্ন শাসনের রেখে যাওয়া ‘জঞ্জাল’ পরিষ্কার করার দায়িত্ব পেয়ে আসছে। ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার পর মানুষ গণতন্ত্র ও সুদিনের স্বপ্ন দেখলেও, বাস্তবে পেয়েছে মুজিব বাহিনী ও রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার, এবং ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। যেখানে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের দায়িত্ব পরবর্তী নয় বছরের স্বৈরাচারী শাসনের জঞ্জাল দূর করে গণতন্ত্র ও ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করেন বেগম খালেদা জিয়া। আর বর্তমানে বিগত ১৭ বছরের আইনের শাসন বিহীন বিশৃঙ্খল অবস্থা ও ব্যাংক লুট ও টাকা পাচার পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনৈতিক জঞ্জাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাঁধে পড়েছে।
সংসদকে কার্যকর করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংসদকে কেবল প্রাণবন্ত নয়, বরং কার্যকর করে তোলা আমাদের মূল লক্ষ্য। সংসদে ভিন্ন মত থাকবে এটাই স্বাভাবিক, তবে দেশের মানুষের স্বার্থে এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে আমাদের এক জায়গায় ঐকমত্য হতে হবে। আইনের শাসন ও জাতীয় সমস্যার যৌক্তিক সমাধানের জন্য আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, রাজনীতি হতে হবে সাধারণ মানুষের জন্য— যিনি রিকশা চালান, যিনি কৃষক, যিনি মজুর, কামার বা কুমার সবার জন্য। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এই গণতন্ত্রকে লালন করা এবং সামনে নিয়ে আসা। আমরা সবাই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সেই গণতন্ত্রের তরীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
এফআর