যেভাবে গড়ে উঠল ইরানি দুই ভাইয়ের ক্রিপ্টো সাম্রাজ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

তেহরানের অভিজাত আলবোর্জ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত একটি চকচকে অফিস ভবন। ভেতরে কর্মীরা ভিডিও গেম খেলছেন, সিনেমা দেখছেন, বিশাল কাচের জানালা

2026-05-02T10:23:20+00:00
2026-05-02T10:23:20+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
রয়টার্সের বিশ্লেষণ
যেভাবে গড়ে উঠল ইরানি দুই ভাইয়ের ক্রিপ্টো সাম্রাজ্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে, ২০২৬, ১০:২৩ এএম 
সংগৃহীত ছবি
তেহরানের অভিজাত আলবোর্জ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত একটি চকচকে অফিস ভবন। ভেতরে কর্মীরা ভিডিও গেম খেলছেন, সিনেমা দেখছেন, বিশাল কাচের জানালা দিয়ে পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করছেন। নারী কর্মীদের হিজাব পরার বাধ্যবাধকতা নেই, ধর্মীয় ছুটির দিনেও অফিস খোলা থাকে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় এটি সিলিকন ভ্যালির কোনো স্টার্টআপ। কিন্তু ভেতরের গল্পটা সম্পূর্ণ আলাদা।

এই প্রতিষ্ঠানের নাম নোবিটেক্স- ইরানের সর্ববৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ। দেশের মোট ক্রিপ্টো লেনদেনের ৭০ শতাংশ এখানে হয়। ব্যবহারকারী সংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখ- দেশের প্রতি দশজনে একজন। কিন্তু রয়টার্সের দীর্ঘ অনুসন্ধানে এমন তথ্য সামনে এসেছে, যা বিশ্বের ক্ষমতাবান মহলে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিকরা হলেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার একেবারে ঘনিষ্ঠ একটি পরিবারের সদস্য, যারা নিজেদের পরিচয় বছরের পর বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছেন।

নোবিটেক্সের প্রতিষ্ঠাতা দুই ভাই- আলী ও মোহাম্মদ। তেহরানের বিখ্যাত শেরিফ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন, যাকে ইরানের এমআইটি বলা হয়। সহপাঠীরা তাদের চিনতেন ‘আঘামির’ পদবিতে। বন্ধুরা তাদের অদ্ভুত লম্বা নাম নিয়ে ঠাট্টা করতেন, কিন্তু ভাই দুজন কখনো ব্যাখ্যা দিতেন না।

বছরের পর বছর ধরে প্রতিষ্ঠানের নিকটতম সহকর্মীরাও জানতেন না যে তারা আসলে খাররাজি পরিবারের সন্তান। সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের সূত্রে তাদের দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ট এক বন্ধু ও ওই প্রতিষ্টানের সাবেক কর্মী হতবাক হয়ে যান।  

আরেক সাবেক কর্মী বলেন, আমি সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতাম, আমার সহকর্মীরাও করতেন। পরিবারের আসল নাম জানার পর ভয় লেগে গেল। আমি তো সরকার ও ধর্ম নিয়ে অনেক কিছুই বলেছি।

খাররাজি পরিবার ইরানের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী রাজবংশ। তাদের পারিবারিক শিকড় ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের তিনজন সর্বোচ্চ নেতার পরিবারের সঙ্গে বিবাহসূত্রে জড়িত। দুই ভাইয়ের দাদা ছিলেন প্রখ্যাত আয়াতুল্লাহ, যিনি বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনির একসময়ের শিক্ষক। পিতা আয়াতুল্লাহ বাঘের খাররাজি ইরানে হেজবুল্লাহর প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৭৯ বিপ্লবের পর আইআরজিসি গঠনে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। চাচা কামাল খাররাজি ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও একাধিক সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা ছিলেন।

ইরানি সাংবাদিক ও গবেষক ফারিবোর্জ কালান্তারি- যিনি দুর্নীতি নিয়ে লেখার কারণে কারাদণ্ড ও ৭৪ বেত্রাঘাতের সাজা পেয়েছিলেন এবং এখন বিদেশে বাস করেন। তিনি বলেন, ইরানের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে একটি ভেতরের বৃত্ত আছে এবং একটি বাইরের বৃত্ত। খাররাজিরা সবসময় আলী খামেনির ভেতরের বৃত্তের অংশ ছিলেন।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় ইরানের প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রায় অচল। আন্তর্জাতিক লেনদেন বন্ধ, মুদ্রার মান তলানিতে, মুদ্রাস্ফীতি আকাশছোঁয়া। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ ইরানিদের কাছে নোবিটেক্স হয়ে উঠেছে টিকে থাকার অবলম্বন। বিদেশি মুদ্রার বিকল্প হিসেবে, সঞ্চয় রক্ষার উপায় হিসেবে কোটি মানুষ এই প্ল্যাটফর্মে আস্থা রাখছেন।

কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আড়ালে আরও একটি ব্যবহারকারী গোষ্ঠী সক্রিয়- ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান এলিপটিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার নোবিটেক্সের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মোট লেনদেনের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৫০ কোটি ডলারে।

এই তথ্য সামনে আসে এক অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে। ইরানে আত্মসাতের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত (পরে মাফ পাওয়া) বিলিয়নেয়ার বাবাক জানজানি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিবাদে জড়িয়ে সামাজিক মাধ্যমে কিছু ওয়ালেট ঠিকানা ফাঁস করে দেন। সেই সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা একটি জটিল নিষেধাজ্ঞা-ফাঁকির চক্র উন্মোচন করেন, যার কেন্দ্রে রয়েছে নোবিটেক্স।

বিভিন্ন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে নোবিটেক্সের মাধ্যমে মোট অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ৩৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। তবে সব বিশ্লেষকই সতর্ক করেছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। ইরানের পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের প্রমাণও পাওয়া গেছে।

নোবিটেক্সের ইতিহাস কেবল সাফল্যের গল্প নয়, এটি ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে এক জটিল টানাপোড়েনের ইতিহাসও। প্রতিষ্ঠার পরপরই আইআরজিসি প্রতিষ্ঠানের তেহরান অফিসে হানা দেয় এবং তৎকালীন প্রধান নির্বাহী আমির হোসেইন রাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কয়েক বছর পর আবার অভিযান চালিয়ে রাদকে গ্রেফতার করা হয়, কর্মীদের ল্যাপটপ জব্দ করা হয় এবং অফিস সিলগালা করা হয়।

২০২২ সালে একটি বড় ধাক্কা আসে। নোবিটেক্সের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী মোহাম্মদ বাঘের নাহভির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান— সাফিরান এয়ারপোর্ট সার্ভিসেস মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। রাশিয়ায় ইরানি ড্রোন পরিবহনে সহায়তার অভিযোগে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

একই বছর মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে কোম্পানির উদারনৈতিক পরিবেশেও পরিবর্তন আসে। নারী কর্মীদের হিজাব পরতে বাধ্য করা হয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর হয়। এক কর্মী বলেন, সেদিন থেকে প্রতিষ্ঠানটি আর টেকস্টার্টআপ মনে হতো না।

তবে এতকিছুর পরেও নোবিটেক্স থামেনি। ২০২৫ সালে হ্যাকার গোষ্ঠী ‘প্রেডেটরি স্প্যারো’ সাইবার হামলায় প্রায় ৯ কোটি ডলার মূল্যের ক্রিপ্টো অকার্যকর ওয়ালেটে পাঠিয়ে দিলেও ভাই দুজন নিজেরা অর্থ পরিশোধ করে গ্রাহকদের ক্ষতি পূরণ করেন। এর মাধ্যমে তাদের বিপুল আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ করে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েল সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন এবং দেশে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু হয়। ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়। মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ মানুষ সরকার-অনুমোদিত ইন্টারনেট সুবিধা পাচ্ছেন। তবু নোবিটেক্স সচল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই প্ল্যাটফর্মে ১০ কোটি ডলারেরও বেশি লেনদেন হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিদেশে চলে গেছে।

ক্রিস্টাল ইন্টেলিজেন্সের প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিক স্মার্ট এই জটিলতার কথা তুলে ধরে বলেছেন, নোবিটেক্সের সমস্যা হলো, এর এত বেশি সাধারণ ব্যবহারকারী আছেন যে শাসক গোষ্ঠীর লেনদেন আর সাধারণ মানুষের লেনদেন আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এপ্রিলের শুরুতে একটি বিমান হামলায় দুই ভাইয়ের চাচা কামাল খাররাজির স্ত্রী নিহত হন, কামাল নিজে কয়েক দিন পর মারা যান। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনি রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় সম্মানিত খাররাজি পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। যা পরোক্ষভাবে নিশ্চিত করে দেয় যে নোবিটেক্সের প্রতিষ্ঠাতারা ঠিক কোন পরিবারের সন্তান।

মার্কিন সিনেটের ব্যাংকিং কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য এলিজাবেথ ওয়ারেন এই অনুসন্ধানকে জরুরি সতর্কসংকেত বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ক্রিপ্টো ইকোসিস্টেমে অর্থ পাচার ও নিষেধাজ্ঞা ফাঁকির বিরুদ্ধে মৌলিক নিয়ন্ত্রণের অভাব থাকায় শত্রু রাষ্ট্রগুলো বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নিতে পারছে অনায়াসে।

ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের অর্থ উপার্জন, স্থানান্তর ও প্রত্যাবাসনের সক্ষমতা নষ্ট করতে সব ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে নোবিটেক্সের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকি এই বাস্তবতার সারসংক্ষেপ করে বলেন, ইরানে কোনো ব্যবসা লাভজনক হয়ে উঠলেই সরকার ঢুকে পড়ে নিজের অংশ নিয়ে নেয়। সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ইরানে সফল ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

/কহু


  বিষয়:   ইরান  ক্রিপ্টো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: