সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের পথে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। এ নির্বাচনের ফলাফল শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয় বরং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপরও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভিবাসন, বাণিজ্য এবং তিস্তা পানি বণ্টনের মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা বিশ্লেষণ।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলোর একটি, তাই এখানকার রাজনৈতিক পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই দুই দেশের সম্পর্কের গতি-প্রকৃতি প্রভাবিত করতে পারে। ফলে নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি মূলত কেন্দ্রীয় সরকার, অর্থাৎ দিল্লির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই নীতির সরাসরি নির্ধারক না হলেও বাস্তবায়ন ও দৈনন্দিন বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হলো পশ্চিমবঙ্গ।
দুই দেশের সীমান্তের বড় অংশই এই রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। ভাষা-সংস্কৃতির মিল, বাণিজ্য, পানি, অভিবাসন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো এখানকার রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। মোটাদাগে সীমান্ত ও অভিবাসন, তিস্তা ও অন্যান্য নদীর পানি বণ্টন, বাণিজ্য ও যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বার্তা এই বিষয়গুলো পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
ভোটের সর্বশেষ ফলাফলের প্রবণতা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিজেপির নির্বাচনি প্রচারে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যেখানে তারা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের অভিযোগ বারবার তুলে ধরেছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হতে পারে, যা বাণিজ্য, মানুষের চলাচল এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশে ভারতীয় পুশইন বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও কেউ কেউ করছেন, যা তৃণমূল কংগ্রেসের সময় তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে দাবি করা হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে মূলত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে। বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বেশি সমন্বয় করে এই চুক্তিতে অগ্রগতি আনতে পারে এমন আশাবাদ যেমন রয়েছে, তেমনি এর বিপরীত সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। বন্দর, ট্রানজিট ও বাণিজ্য কার্যক্রম পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় রাজ্য সরকারের পরিবর্তনে এসব খাতে নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে ধর্মীয় ও অভিবাসন ইস্যু ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালেহ উদ্দিন আহমদের মতে, প্রথিতযশা সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষাল সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের একটি কৌশলগত পরিকল্পনা রয়েছে। তার অংশ হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীকে ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামানো হয়েছে।
তার মতে, বিজেপি যদি পশ্চিমবঙ্গে জয়ী হয় এবং শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হন, তবে বাংলাদেশের ওপর চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। তবে তিনি এটাও বলেন যে, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলাদেশ ইস্যুতে সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কোনো ইতিহাস নেই। শেখ হাসিনার সঙ্গেও তার সম্পর্ক মূলত আনুষ্ঠানিক ছিল।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থানরত কিছু আওয়ামী লীগ নেতাও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অতিথি হিসেবে রয়েছন বলে জানা যায়। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের ক্ষেত্রে দূরত্ব বজায় রেখেছেন বলেও বিশ্লেষকদের অভিমত।
একই বিশ্লেষকের মতে, মমতা পুনরায় নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতায় এলে সীমান্ত পরিস্থিতিতে কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে। যদিও কলকাতার এক সাংবাদিকের মতে, নির্বাচনি প্রচারে অনেক বক্তব্য থাকলেও বাস্তবে তাকে আসামের হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মতো অবস্থানে ফেলা ঠিক হবে না।
সাবেক রাষ্ট্রদূত রাশেদ আহমেদ চৌধুরী দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের রাজনৈতিক এজেন্ডা বোঝা জরুরি। বিজেপি একটি আদর্শগতভাবে ভিন্ন রাজনৈতিক দল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, যার একটি বড় কারণ ছিল রাজ্যের মুসলিম ভোট ব্যাংক।
তিনি বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে সীমান্ত উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং বাংলাদেশে পুশইন পরিস্থিতিও জটিল হতে পারে। তাই বাংলাদেশের এখন থেকেই কৌশলগত প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন এবং কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকা জরুরি।
বিকল্প ধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুল আমিন বেপারী দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে এতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সম্পর্ক তুলনামূলক ভালো ছিল। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে, কারণ দলটির অবস্থান অনেক সময় মুসলিমবিরোধী হিসেবে দেখা হয়।
তিনি আরও বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় থাকলে সীমান্ত পরিস্থিতিতে অস্থিরতা ও পুশইন বাড়তে পারে। তাই বাংলাদেশের উচিত হবে বিকল্প কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তিস্তা ব্যারাজসহ অভ্যন্তরীণ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে অগ্রগতি আনা।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থান নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সবসময় প্রতিবেশী দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি যেকোনো সরকারের ক্ষেত্রেই অপরিবর্তিত থাকবে। পানি বণ্টন, পুশব্যাকসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ইস্যু আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে, সরকার পরিবর্তনের ওপর তা নির্ভর করে না।