যৌথ উদ্যোগে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ডিএমপি এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানের পর হকাররা আবারও ফুটপাথ ছেড়ে সড়কে নেমে এসেছেন। তারা ভ্যান, চৌকি ও অস্থায়ী কাঠামো ব্যবহার করে মূল সড়ক ও ফুটপাথে ব্যবসা শুরু করেছেন। গত ১ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১০ দিন রাজধানীর ফুটপাথ ও সড়কে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের ফলে পথচারীদের চলাচলে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও জীবিকার উৎস হারিয়ে হাজারো হকার আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে রাস্তায় ফিরে এসেছেন। ফলে রাজধানীর ফুটপাথ ও সড়ক নতুন করে জটিল ও অস্থির পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
হকারদের অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরে এসব জায়গায় ব্যবসা করে আসছেন। হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তাদের জন্য কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই তারা আবার আগের অবস্থানে ফিরে এসেছেন। তাদের ভাষায়, ‘আমরা বহু বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। উচ্ছেদ করলে আমরা কোথায় যাব? আমাদের পরিবার-পরিজন কীভাবে চলবে? তাই বাধ্য হয়েই আবার বসেছি।’
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) হকারদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র বা ‘হকার কার্ড’ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে ডিএনসিসি মিরপুর ১০, মিরপুর ১ ও মিরপুর ২ এলাকার ২০২ জন হকারকে এবং ডিএসসিসি প্রায় ১০০ জনকে ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে আরও হকারদের এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, হকারদের পুর্নবাসনের কথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বলেছেন।
তবে হকাররা বলছেন, তারা যে যেখানে ব্যবসা করেন, সেখানেই থাকবেন। তাদের ভাষ্যমতে, আমরা ব্যবসা করি গুলিস্তানে। আর পাঠানো হলো মিরপুরে। সেখানে গিয়ে কি ব্যবসা করতে পারব? ব্যবসা হবে না। তাই সব কথা শোনার সময় নেই। যেখানে আছেন সেখানেই থাকবেন। আমরা তো নেতাদের টাকা দিই। চাইলেই কি উঠিয়ে দেওয়া সম্ভব? সিটি করপোরেশনেরও অনেক কর্মকর্তা টাকা নেন। আমাদের উচ্ছেদ করেছিল। আবার আমরা বসেছি। যাব কোথায়। দীর্ঘদিন থেকে যেখানে ব্যবসা করি, অন্য জায়গায় গেলে কি আমাদের ব্যবসা চলবে। সিটি করপোরেশন বলছে, আমাদের পূর্নবাসন করা হবে।
সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উচ্ছেদ অভিযানের পরপরই গুলিস্তান, মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম, সায়েদাবাদ, ধোলাইখাল, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট, মিরপুর, গুলশান ও উত্তরাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে হকাররা আবারও ফুটপাথ ও সড়ক দখল করে নিয়েছেন। কোথাও কোথাও তারা ভ্যানগাড়ি ও অস্থায়ী চৌকি বসিয়ে বিভিন্ন পণ্যের দোকান চালু করেছেন। এতে এসব এলাকার যান চলাচলে আবারও চাপ তৈরি হয়েছে এবং পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষ করে গুলিস্তান, মতিঝিল ও আশপাশের এলাকায় পরিস্থিতি আগের মতোই ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফুটপাথের পাশাপাশি সড়কের বড় অংশ দখল করে অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। এতে করে যানজট ও জনদুর্ভোগ আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ফুটপাথ হকারমুক্ত রাখতে রাজধানীতে আটটি নৈশ মার্কেট চালুর পরিকল্পনা করছে। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএসসিসি প্রশাসক জানান, হঠাৎ উচ্ছেদ কার্যকর সমাধান নয়। তাই সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট স্থানে হকারদের বসার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, যাতে দিনের বেলায় ফুটপাথ ও সড়ক যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
রাজধানীর গুলিস্তানের রমনা হোটেলের সামনে বাচ্চাদের গেঞ্জি, প্যান্ট নিয়ে ভ্যানগাড়িতে ব্যবসা করছেন রহিম মিয়া। তিনি প্রায় ৮ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, আমাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু কোথায় যাব। আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। ফলে আমরা আবার বসেছি। দীর্ঘদিন থেকে এখানে ব্যবসা করি। আমাদের নাকি জায়গা দেওয়া হবে। কিন্তু অন্য জায়গায় গিয়ে তো ব্যবসা করতে পারব না। ইতিমধ্যে আমাদের কাছ থেকে কাগজপত্র নেওয়া হয়েছে কার্ড দেবে নাকি। আমরা নেতাদের টাকাও দিয়েছি।
রাজধানীর গুলিস্তানে স্যান্ডেলের ব্যবসা করেন কেরামত আলী (ছদ্মনাম)। বয়স প্রায় ৬০ ছুঁই ছুঁই। তিনি বলেন, উচ্ছেদ করছিল। আবার বসেছি। যাব কোথায়? খাব কী? উচ্ছেদ করলেই হলো? টাকা দিই। পুলিশকে টাকা দিই। বিএনপির নেতাকে টাকা দিই। স্থানীয় নেতাদের টাকা দিই। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের টাকা দিই। কার্ড দিছে, তার জন্যও টাকা নিছে।
সিটি করপোরেশনও কি টাকা নেয়? এমন প্রশ্নের জবাবে কেরামত আলী বলেন, আপনার কাছে কি মনে হয়, সিটি করপোরেশনে যারা আছেন, তারা ভালো মানুষ। এখন শুনছি আমাদের নাকি পুর্নবাসন করবে? কিন্তু কোথায় করবে? এখানে আমি ব্যবসা করে জীবনটা পার করে দিলাম প্রায়। এখন মিরপুর পুর্নবাসন করবে, আর চলে যাব তা হয় নাকি? বললেই যাব নাকি? এখানেই থাকব। এই ব্যবসা দিয়ে সংসার চলে। এক ছেলে ও এক মেয়ে কলেজে পড়াশোনা প্রায় শেষ। এখানে ব্যবসা করেই তাদের পড়াশোনা করিয়েছি। কোথাও যাব না।
রাজধানী গুলিস্তানে ফ্লাইওভারের নিচে জিন্সের প্যান্ট ও টি-শার্টের ব্যবসা করেন রাসেল মোল্লা। তিনি ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তায় চৌকি বসিয়ে ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, আমি ১০ বছর এখানে ব্যবসা করি। গত মাসে আমাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। শুধু গত মাসে নয়, গত সরকারের আমলেও অনেকবার উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু পরে আমরা বসেছি। এবারও উচ্ছেদ করার পর আবার বসেছি। আমার কোনো হকার কার্ড নেই। একজন বলছিল, কার্ড করে দেবে। কিন্তু পরে আর আসেনি। আমরা তো এমনিতেই টাকা দিই। টাকা দিয়েই তো ১০ বছর ধরে ব্যবসা করে আসছি। শুনছি, আমাদের নাকি অন্য জায়গায় বসার ব্যবস্থা করবে সিটি করপোরেশন। কিন্তু এখান থেকে কেন যাব? এখানে ব্যবসা করতে করতে সবাই পরিচিত হয়ে গেছে। অন্য জায়গায় গেলে ব্যবসা ভালো চলবে না। এই ব্যবসা করেই আমরা সংসার চলে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তালিকা ধরে পর্যায়ক্রমে হকারদের বিকল্প স্থানে স্থানান্তর করা হবে। এ পর্যন্ত ২০২ জন হকারের মাঝে ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০২ জনকে মিরপুর-১০ এলাকা থেকে মিরপুর-১৩ ওয়াসা রোডে এবং বাকি ১০০ জনকে গাবতলী কাঁচা বাজার সংলগ্ন ফাঁকা স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। তালিকাভুক্ত মোট হকারের সংখ্যা ৮২৯ জন। বাকি হকারদেরও পর্যায়ক্রমে পরিচয়পত্র দিয়ে নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর করা হবে। স্থানান্তরের জন্য স্বল্প সময় দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের পর পুরোনো স্থানে হকার পাওয়া গেলে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। হকারদের স্থায়ী কোনো কাঠামো নির্মাণ না করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে হকারদের জন্য পৃথক হকার্স মার্কেট গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, পথচারী ও যান চলাচল নির্বিঘ্ন রেখেই হকার পুনর্বাসন করা হচ্ছে। অতীতে হকাররা অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফুটপাথ ও রাস্তা দখল করার ফলে জনভোগান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো। এখন থেকে ফুটপাথ বা রাস্তার নির্ধারিত স্থানে, নির্দিষ্ট সংখ্যক হকার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বসতে পারবেন। আমরা পথচারী ও যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা নিশ্চিত করেই হকারদের সুশৃঙ্খল পুনর্বাসনের কাজ করছি। তাদের পরিচয়পত্র দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের নেতারা বলছেন, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নীতি বাস্তবসম্মত নয়। তাদের মতে, প্রকৃত হকার শনাক্ত না করা, অসম্পূর্ণ তালিকা, সমন্বয়হীনতা এবং বিকল্প ব্যবস্থার অভাব এ অবস্থায় সমস্যার সমাধান না হয়ে আরও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলছে।
সব মিলিয়ে উচ্ছেদ, পুনর্বাসন ও বাস্তবায়নের এই টানাপড়েনে রাজধানীর ফুটপাথ ও সড়ক আবারও হকারদের দখলে চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি কার্যত আগের অবস্থাতেই ফিরে গেছে। ফলে নগর ব্যবস্থাপনা ও জনস্বার্থের ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর ও টেকসই সমাধানের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।