সদ্য সমাপ্ত এপ্রিল মাসে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে দেশে মোট ৪৬৩টি সড়ক দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে, যাতে ৪০৪ জন মানুষ নিহত এবং ৭০৯ জন আহত হয়েছেন।
বুধবার (৬ মে) নয়টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোট নিহতের মধ্যে মোটরসাইকেল আরোহীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ১৪২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এছাড়া ১০২ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ২৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬ জন যানবাহন চালক ও সহকারী।
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ ঘটেছে আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়কে। এর মধ্যে ১৬৮টি দুর্ঘটনা জাতীয় মহাসড়কে এবং ১৯৩টি আঞ্চলিক সড়কে ঘটেছে। এছাড়া গ্রামীণ ও শহরের সড়কেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাণহানি হয়েছে। দুর্ঘটনার ধরন অনুযায়ী ১৯৪টি ক্ষেত্রে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এবং ৯৭টি ক্ষেত্রে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে।
১০৬টি ঘটনায় পথচারীকে চাপা দেওয়া বা ধাক্কা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এই দুর্ঘটনাগুলোতে মোট ৬৫৯টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল, যার মধ্যে ১৫৩টি মোটরসাইকেল, ৯১টি ট্রাক, ৮৪টি বাস এবং ১১২টি থ্রি-হুইলার রয়েছে। সময় অনুযায়ী দেখা গেছে, দিনের শুরু অর্থাৎ সকালের দিকে ২৮ দশমিক ৫০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে, যা দিনের অন্য সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ।
বিভাগভিত্তিক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে ঢাকা বিভাগ শীর্ষে অবস্থান করছে। গত মাসে এই বিভাগে ১০৯টি দুর্ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন। এর বিপরীতে সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ১২টি দুর্ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতিও বেশ আশঙ্কাজনক; এখানে ৩৬টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত এবং ৬৭ জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এই ক্রমবর্ধমান দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকদের অদক্ষতা, মহাসড়কে ধীরগতির যানের উপস্থিতি এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিও দুর্ঘটনার পরোক্ষ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নিরাপদ করতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ১২ দফা সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ ও বিআরটিসি সংস্থাদ্বয়ের আধুনিকায়ন ও সংস্কার, আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে।
এছাড়া দক্ষ চালক তৈরি করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন রাস্তা থেকে প্রত্যাহার করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে সংগঠনটি। পরিকল্পিত সংস্কার ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু কমানো সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সময়ের আলো/টিএইচ