ফাইলবন্দী প্রকল্পে ডুবেছে স্বপ্ন

আদিল সরকার

জাতীয়

পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি ও অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে এবারের বোরো মৌসুমে হাওড় এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর ধানের জমি তলিয়ে

2026-05-07T02:06:42+00:00
2026-05-07T02:42:59+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
ফাইলবন্দী প্রকল্পে ডুবেছে স্বপ্ন
আদিল সরকার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬, ২:০৬ এএম  আপডেট: ০৭.০৫.২০২৬ ২:৪২ এএম
ছবি : সংগৃহীত
পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি ও অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে এবারের বোরো মৌসুমে হাওড় এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর ধানের জমি তলিয়ে গেছে। বছরের একমাত্র ধানের ফসলটি হারিয়ে দিশাহারা হাওড় এলাকার কৃষক। পানিতে ডুবে গেছে তাদের স্বপ্ন। অথচ হাওড় এলাকার উন্নয়নে নেওয়া প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি অবহেলা করে চার বছর ফেলে রাখা হয়েছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকল্পটি ফেলে না রেখে সময়মতো কাজ করলে সর্বশান্ত হতে হতো না হাওড় এলাকার কৃষককে। 

এদিকে এক দফায় অর্থ কমিয়ে ১৪২৯ কোটি টাকায় ব্যয়ে প্রস্তাব করা প্রকল্পটি আজ মূল্যায়নের জন্য পিইসি সভায় উঠছে। অবশ্য দিগুণ বাড়তি অর্থ এবং সময় ক্ষেপণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। 

বন্যার পাশাপশি হাওড় এলাকায় পানির যথাযথ নিষ্কাশন না করতে পারায় সব মিলিয়ে মোটা অঙ্কের আর্থিক লোকসানে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের। তাই হাওড় এলাকায় আগাম বন্যা নিয়ন্ত্রণে বেশ বড়সড় অর্থের একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল ২০২২ সালের শেষদিকে। তখন প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার কোটিরও অধিক টাকা, যা চলতি বছরের জুনে শেষ করার লক্ষ্য ছিল। তবে পরে আর তা আলোচনায় থাকেনি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত এক পিইসি সভায় প্রকল্পটির ব্যয় কমিয়ে ৭৫০ কোটি টাকায় পুনর্গঠনের পরামর্শ দিয়ে প্রস্তাবটি ফেরত পাঠানো হয়। 

তবে সংশোধিত প্রস্তাব জমা দিতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় আরও দেড় বছরের বেশি সময় নেয়, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। এ দিকে দিগুণ অর্থ বাড়িয়ে এক হাজার ৪২৯ কোটি টাকা খরচ দেখিয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে, যা নিয়ে আজকের পিইসি সভায় আলোচনা হবে। 

জানা যায়, ‘হাওড় অঞ্চলের আগাম বন্যা ও সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন (প্রথম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদনের আগে যাচাই-বাছাই করতে আজ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হবে। 

অনুমোদন হলে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন মেয়াদে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার ১৬টি উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ লক্ষ্যে ১৩টি নদীর ৩০৩.৫৮ কিলোমিটার অংশ ড্রেজিং এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার খাল পুনর্খনন করা হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ডুবন্ত বাঁধ শক্তিশালী করতে তিন কিলোমিটার এলাকায় সিসি ব্লক আর্মারিং এবং পানি প্রবাহ ও নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ১২টি ফ্লাড ফিউজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পটির প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওড় অঞ্চলে সময়ের আগেই আকস্মিক বন্যা একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হয়ে রয়েছে, যেখানে কৃষি ও মৎস্য খাত স্থানীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এতে বলা হয়েছে সুরমা ও কুশিয়ারার মতো প্রধান নদীগুলো মারাত্মক পলি জমার কারণে তাদের পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা হারিয়েছে, যার ফলে হাওড় অববাহিকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

বন্যার পানি নামতে দেরি হওয়ায় প্রায়শই বোরো ধানের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার একটি প্রধান চালিকাশক্তি। এ ছাড়া এটি বীজতলা তৈরি এবং চারা রোপণে বিলম্ব ঘটিয়ে কৃষি পঞ্জিকাকেও ব্যাহত করে। এই প্রেক্ষাপটে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং সময়মতো পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করার জন্য নদী ড্রেজিং এবং খাল পুনর্খনন অপরিহার্য।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান আগাম বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে প্রকল্পের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি কমবে এবং তাদের জীবন-জীবিকায় স্থিতিশীলতা আসবে।

এ ছাড়া কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে ব্যয়, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে প্রত্যাশিত ফল অর্জন কঠিন হতে পারে।

তবে প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে পিইসি সভায় প্রশ্ন তুলতে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন। বিশেষ করে নদী ড্রেজিংয়ের খরচের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটার মাটি অপসারণে প্রায় ১৯৩ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা অন্যান্য চলমান প্রকল্পের তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি। 

কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পিইসি সভায় প্রস্তাবিত ড্রেজিং কাজের প্যাকেজভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য- দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, গভীরতা, উত্তোলিত মাটির পরিমাণ এবং ব্যয়ের হিসাব স্পষ্টভাবে উপস্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে উত্তোলিত মাটি কোথায় ও কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চাওয়া হবে। পাশাপাশি ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের ব্যয় আলাদাভাবে দেখানোর প্রয়োজনীয়তা জানতে চাওয়া হবে।

এ দিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পটি প্রথম ২০২২ সালের শেষদিকেই প্রস্তাব করা হয়, তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা এবং চলতি বছরের জুনে শেষ করার লক্ষ্য ছিল। পরে ২০২৪ সালের আগস্টে পিইসি সভায় ব্যয় কমিয়ে ৭৫০ কোটি টাকায় পুনর্গঠনের পরামর্শ দিয়ে প্রস্তাবটি ফেরত পাঠানো হয়। তবে সংশোধিত প্রস্তাব জমা দিতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় দেড় বছরের বেশি সময় নেয়। 

সব মিলিয়ে প্রায় চার বছর ধরে আলোচনায় ও প্রস্তাবনায় এসেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। বর্তমানে বর্ষায় হাওর এলাকাসহ অন্যত্রে পানি বৃদ্ধির ফলে নতুন সরকারের শুরুতেই প্রকল্পটি আবারও আলোচনায় এসেছে। তবে এবার প্রকল্পটি গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে প্রকল্পটি সম্পর্কিত কি না সে বিষয়েও জানতে চেয়ে পরিকল্পনা কমিশন। 

পরিবেশ ও হাওড় উন্নয়ন সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, আকস্মিক বন্যায় ফসলের ক্ষতির পরেই প্রায়শই এই ধরনের প্রকল্প শুরু করা হয় এবং বন্যা মৌসুম শেষ হয়ে গেলে তা অগ্রাধিকার হারায়। তিনি বলেন, বছরের পর বছর আলোচনা সত্ত্বেও হাওরের এই প্রকল্পটি এখনও অনুমোদন পায়নি। এটি সার্বিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত অনুমোদন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।

এ ছাড়া আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষার জন্য নদী ড্রেজিং ও খাল পুনর্খননের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা একটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে জানান তিনি।

এ দিকে প্রকল্পটির সময় ক্ষেপণের বিষয়ে জানতে চাইলে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের উপসচিব মোবাশশেরুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, আমরা প্রকল্পটি যাচাই-বাছাই করে পাঠিয়েছে। কেন দেরি হলো সেটা প্ল্যানিং কমিশন বলতে পারবেন। আর কাল (আজ) কেন পিইসি সভা ডেকেছে সেটা গেলে আমরা বুঝতে পারব। এ দিকে কমিশনের পক্ষ থেকে অর্থ কমানোর পরামর্শ দিয়ে আবারও প্রস্তাব পাঠানোর কথা থাকলেও প্রকল্পটির অর্থ দিগুণ বাড়ানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। 

তবে তিনি বলেন, প্রকল্পটি যেহেতু এখনও অনুমোদন হয়নি সেহেতু কমানো-বাড়ানোর কথা আসার কথা না। এ ক্ষেত্রে সুপারিশ অনুযায়ী কাজ করা হয়।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   ফাইলবন্দী  প্রকল্প  স্বপ্ন  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: