বেড়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশে সীমিত রয়েছে। অন্যদিকে গত চার বছরে জীবাশ্ম (গ্যাস,

2026-05-07T02:42:18+00:00
2026-05-07T02:42:18+00:00
 
  বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬,
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বেড়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬, ২:৪২ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশে সীমিত রয়েছে। অন্যদিকে গত চার বছরে জীবাশ্ম (গ্যাস, কয়লা ও তেল) জ্বালানি আমদানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ, যা জ্বালানি খাতে জীবাশ্ম নির্ভরতা আরও বাড়িয়েছে। 

বুধবার ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত চার বছরে বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে দেশের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং প্রত্যাশিত হারে বিদ্যুৎ চাহিদা না বাড়ায় বড় অঙ্কের ক্যাপাসিটি পেমেন্টও ব্যয় বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলো হলো- বিশ্ববাজারের অস্থিরতায় সরবরাহ ঝুঁকি বাড়ছে, বাড়ছে ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ, জ্বালানি রূপান্তরে জোর দেওয়ার আহ্বান; নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ আসে, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ। 

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখতে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন; শুধু মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চমূল্য বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়িয়েছে তেমন নয়- ব্যয়বহুল পিকিং পাওয়ার প্লান্ট, অব্যবহৃত উচ্চসক্ষমতার কারণে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং জ্বালানি সরবরাহ সংকট বিদ্যুৎ আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে, যা আর্থিক চাপ অব্যাহত রাখছে।

এ ছাড়া এলএনজির উচ্চমূল্য বাংলাদেশের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ভর্তুকি দিতে হতে পারে; নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের (বিবিআইএন) আন্তঃঅবকাঠামোর মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত জ্বালানি সহযোগিতা, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় গ্যাস সরবরাহ উন্নয়ন- এসব উদ্যোগ বাংলাদেশকে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

‘ফস্টারিং বাংলাদেশের এনার্জি ট্রানজিশন’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে কয়লার গড় মূল্য ২৯০ শতাংশ বৃদ্ধি, স্বল্প সময়ের জন্য তেলের উচ্চমূল্য এবং মুদ্রার তীব্র অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে।

তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় কয়লার মূল্য ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমে যাওয়া এবং তেলের মূল্য নিম্নমুখী থাকা সত্ত্বেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ব্যয় কমেনি।

প্রতিবেদনটির লেখক ও আইইইএফএর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বেসরকারি তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় গড়ে যথাক্রমে প্রায় ৯.৫ টাকা (০.০৭৭ ডলার) এবং ৫.৯ টাকা (০.০৪৮ ডলার) ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়ায় মোট উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। 

এ ছাড়া গ্যাস সরবরাহ সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়েছে। ২৫ শতাংশের কম লোড ফ্যাক্টরে চলা গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৬ দশমিক ৮৫ টাকা, যেখানে প্রায় ৭৫ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে তা ছিল ৬ টাকা।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন সময়ে এলএনজি আমদানির জন্য প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন ডলার (১৩১.৩৪ বিলিয়ন টাকা) ভর্তুকি দিতে হবে বলে প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই হিসাব ২০২৫ সালের একই সময়ের আমদানি প্রবণতা এবং প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) আমদানি মূল্য প্রায় ২০ ডলার বিবেচনায় নিয়ে করা হয়েছে, যেখানে রিগ্যাসিফিকেশন ও টার্মিনাল ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়।

অন্যদিকে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। ফলে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং উচ্চমূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা আমাদের বিদ্যুৎ খাতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সীমিত। বর্তমানে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি (ডিআরই) ব্যবস্থার ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে এর জীবনচক্রে ফার্নেস অয়েল আমদানি কমিয়ে এককালীন আমদানি শুল্কের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি সাশ্রয় সম্ভব, তাই সরকারকে শুল্ক মওকুফের আহ্বান জানানো হয়েছে।

শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান আমাদের কাছেই রয়েছে- বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সীমিত করা। স্পিনিং রিজার্ভ ও গ্রিড ব্যালান্সিংয়ের প্রয়োজন বিবেচনায় সরকার চাইলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে কিছু তেলভিত্তিক কেন্দ্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, যাতে উচ্চ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এড়ানো যায়।

গ্যাসের চাহিদা কমাতে বাংলাদেশ বিবিআইএন কাঠামোর আওতায় নেপাল ও ভুটানের সাশ্রয়ী জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে। মার্চ-সেপ্টেম্বরের উচ্চ চাহিদার সময়ে নেপাল ও ভুটান থেকে সম্মিলিত ৬ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ পেলে ২০৩০ সালের পর বছরে সর্বোচ্চ ২৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, করপোরেট পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্টের (সিপিপিএ) আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের ওপেন অ্যাক্সেস ব্যয় কম রাখা প্রয়োজন, যাতে পোশাক শিল্পসহ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসন (ইএসজি) লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তাদের কার্যক্রম ডিকার্বনাইজ করতে পারে। 

যদিও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো বলছে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তাদের রাজস্ব কমে যাবে, আইইইএফএর বিশ্লেষণে দেখা গেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্প খাতে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা (৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার)। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত জ্বালানি খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার আর্থিক চাপও বাড়াবে। 

তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর নির্ভর করছে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো বিচক্ষণ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর, যা আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও উচ্চ ভর্তুকি কমাতে সহায়তা করবে।

সময়ের আলো/ জেডি


  বিষয়:   জীবাশ্ম  জ্বালান্‌ আমদানি 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: