বাড়বে করের বোঝা

এসএম আলমগীর

জাতীয়

একদিকে রয়েছে আর্থিক টানাপড়েন, অন্যদিকে দাতা সংস্থা আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর চাপ। আবার রাজস্ব আদায়েও বেশ খানিকটা পিছিয়ে আছে এনবিআর। এ

2026-05-08T00:33:40+00:00
2026-05-08T00:33:40+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
আসছে নতুন বাজেট
বাড়বে করের বোঝা
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬, ১২:৩৩ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
একদিকে রয়েছে আর্থিক টানাপড়েন, অন্যদিকে দাতা সংস্থা আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর চাপ। আবার রাজস্ব আদায়েও বেশ খানিকটা পিছিয়ে আছে এনবিআর। এ ছাড়া বিশেষত বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও রয়েছে ভঙ্গুর অবস্থায়। ব্যবসা-বাণিজ্যেও একরকম স্থবিরতা চলছে। 

এই পরিস্থিতিতে আসতে যাচ্ছে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। এই বাজেটে নতুন সরকার আয় বাড়ানোর দিকে বেশ জোর দিচ্ছে। এ জন্য বাড়ানো হচ্ছে করের বোঝা। 

কর আদায়ে কঠোরতার সিদ্ধান্ত : চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে আগামী বাজেটে। এই বিশাল অঙ্কের বাড়তি কর আদায়ে আরও কঠোর হতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এর জন্য আগামী বাজেটে যেমন করের জাল বাড়ানো হবে, তেমনি নতুন নতুন খাত করের আওতায় আনা হবে। 

বিশেষ করে করের জাল বাড়াতে ফ্রিল্যান্সার, ই-কমার্স ও সারা দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসাকে করের আওতায় আনা হবে। এ জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় কর আদায়ে কর প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কার ঘটানো হবে। আয় বাড়াতে বাড়ানো হবে ভ্যাট-শুল্কনির্ভরতা। এতে পরোক্ষ করের চাপ আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে এবারের বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা না বাড়ানোর সম্ভাবনাই বেশি। ফলে সাধারণ মানুষ খুব একটা স্বস্তি পাবে না। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর কাঠামোতে সরকারের বড় ধরনের পরিবর্তন আনা ছাড়া বিকল্প উপায় নেই। কারণ সরকারকে একদিকে যেমন বিশাল ঘাটতি পূরণের চাপ সামলাতে হবে, অন্যদিকে আছে দাতা সংস্থাগুলোর ভর্তুকি কমানোর চাপ। 

অর্থনীতিবিদ ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মজিদ সময়ের আলোকে বলেন, দেশের অর্থনীতিতে এখন টানাপড়েন চলছে। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকেও এখনও অনেক পিছিয়ে আছে এনবিআর। দাতা সংস্থা চাপ দিচ্ছে ভর্তুকি কমানোর জন্য। যদিও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে এ খাতে ভর্তুকি আরও বেড়েই চলেছে। এরকম পরিস্থিতিতে আগামী বাজেটে সরকারকে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে রাজস্ব আদায়ে। আর রাজস্ব আদায়ে জোর দেওয়া মানেই দেশের জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়ানো। 

আব্দুল মজিদ আরও বলেন, সরকার হয়তো বাধ্য হয়েই আগামী বাজেটে করের বোঝা বাড়াবে কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ যাতে অন্যদিক দিয়ে কিছুটা স্বস্তি পায় তার জন্য নতুন বাজেটে ব্যবস্থা রাখা দরকার। যেমন করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো দরকার।

কেমন হচ্ছে বাজেটের আকার : জানা গেছে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ হবে আগামী ১১ জুন। আর বাজেট অধিবেশন শুরু হবে আগামী ৭ জুন। আসন্ন বাজেটের আকার হতে যাচ্ছে প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকা থেকে সোয়া ৯ লাখ কোটি টাকার মতো। সম্ভাব্য মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা। নতুন বাজেট ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার মতো। 

চলতি বছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা : এদিকে চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২০২৬) শুরুতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের মাঝপথে আরও ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। 

কিন্তু বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গিয়ে বড় ধরনের হোঁচট খায় এনবিআর। প্রতি মাসেই রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে সংস্থাটি। গত ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। আদায়ে বড় ধরনের হোঁচট খেয়ে অবশেষে রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। 

ইতোমধ্যে ৯ মাসে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাকি তিন মাসে এনবিআরকে আদায় করতে হবে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। গড়ে প্রতি মাসে আদায় করতে হবে ৪৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবে বিগত সময়ে এনবিআরে এক মাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ হিসাবে নতুন রেকর্ড গড়েই রাজস্ব আদায়ের নতুন এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে এনবিআরকে। লক্ষ্যমাত্রা কমানো হলেও এটি অর্জন করাও চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরের রাজস্ব আদায়ের এই পরিস্থিতি সামনে রেখেই আগামী অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্য ঠিক করতে হচ্ছে। আগামী বছরেও যে রাজস্ব আদায় খুব সহজ হবে, তেমনটি নয়। কারণ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসেনি, নতুন বিনিয়োগও থমকে আছে। তাই আগামী অর্থবছরে এনবিআর করের জাল বেশি বিস্তারের চেষ্টা করবে। 

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে ডিজিটাল করের যুগে ঢুকছে বাংলাদেশ। এ জন্য অনলাই, ফেসবুক থেকে অর্থ উপার্জন করা ফ্রিল্যান্সার এবং ইউটিউবারদের ওপর কর চাপানো হবে। মোবাইল রিচার্জে বাড়তি টাকা গুনতে হতে পারে। নেটফ্লিক্সে ভ্যাট ধার্য হবে। এ জন্য তরুণদের পকেটে নতুন বাজেটের চাপ পড়েব। মোবাইল-ইন্টারনেটের ওপরও খরচ বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। বিলাসপণ্যে শুল্ক বাড়ানো হবে আগামী বাজেটে। একই সঙ্গে ধনীদের ওপর সারচার্জ বাড়ছে আগামী বাজেটে। 

বাড়ছে না করমুক্ত আয়সীমা : জানা গেছে, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষিত কাঠামো অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে তাদের কর দিতে হবে। আয় না বাড়লেও করের হার ও আয়ের স্ল্যাবের মারপ্যাঁচে সব করদাতাকে বাড়তি কর দিতে হবে। এ ছাড়া নিজ নামে স্থাবর সম্পত্তি থাকলে তার ওপর মৌজা রেটে দিতে হবে সম্পদ কর। এর বাইরে আয়কর আইনে আরও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। এ কারণে করের বোঝা বাড়বে।  

আগামী অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কী হারে কর দিতে হবে, তা নির্ধারণ করে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই হিসাবে করদাতাদের কর দিতে হবে আগামী ২ অর্থবছর। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬-২০২৭ ও ২০২৭-২০২৮ অর্থবছরের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করেছে। তবে আয়ের স্ল্যাব ও করহারে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। আর এ কারণে পাল্টে গেছে করদাতার করের হিসাব-নিকাশ।

২০২৬-২০২৭ ও ২০২৭-২০২৮ অর্থবছরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের জন্য করদাতাদের কর দিতে হবে না। এর পরের ৩ লাখ টাকার জন্য ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার জন্য ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার জন্য ২০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকা আয়ের জন্য ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট টাকার জন্য ৩০ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে করহার ও স্ল্যাবে পরিবর্তন আনায় এ করদাতাকেই ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বাড়তি আড়াই হাজার টাকা আয়কর দিতে হবে। 

আরোপ হচ্ছে সম্পদ কর : অন্যদিকে আগামী বাজেটে সারচার্জের পরিবর্তে বাজেটে ‘সম্পদ কর’ আরোপ করতে যাচ্ছে সরকার। দলিল মূল্যের পরিবর্তে জমির বাজার (মৌজা) মূল্যের ওপর কর আদায় করা হবে। রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারা, চট্টগ্রামের খুলশী, আগ্রাবাদসহ বিভাগীয় শহরের অতি ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে নেওয়া হচ্ছে এই উদ্যোগ। 

করের জাল বিস্তারে নজর : এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, করের জাল বিস্তারে এবার ফ্রিল্যান্সার, ই-কমার্স, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী- যারা এতদিন করের বাইরে ছিল তাদের আওতায় আনা হবে। ডিজিটাল করব্যবস্থায় জোর দেওয়ায় টিআইন-বিআইএন অটোমেশন করা হবে। এতে করফাঁকি কমবে। পরোক্ষ করনির্ভরতা বাড়াতে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক বাড়লে সাবান, মোবাইল বিল, ইন্টারনেট, সিগারেটের দাম বাড়বে।

করপোরেট করের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য ২০ শতাংশ, অতালিকাভুক্ত ২৭.৫ শতাংশ- এটা ধরে রাখার সম্ভাবনা বেশি। বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন খাতে কর অবকাশ দেওয়া হতে পারে আগামী বাজেটে। ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপের জন্য ১০ বছর কর অবকাশ বা হ্রাসকৃত হার আসতে পারে। আমদানি শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করা হবে। বিলাসপণ্যে শুল্ক বাড়বে, শিল্পের কাঁচামালে কমবে।

এ ছাড়া আগামী বাজেটে ভ্যাট হার ১৫ শতাংশই থাকছে। কিছু পণ্যে ৫ শতাংশ থেকে ৭.৫ শতাংশ হ্রাসকৃত হার উঠিয়ে ১৫ শতাংশ করা হতে পারে। ই-কমার্স ও সেবার ক্ষেত্রে ফেসবুক বুস্টিং, নেটফ্লিক্স, ইউটিউব প্রিমিয়ামের মতো ডিজিটাল সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট ধরা হতে পারে। তামাকপণ্য ও মোবাইলের ক্ষেত্রে সিগারেট, মোবাইল কলরেট, ইন্টারনেটে সম্পূরক শুল্ক বাড়ার আশঙ্কা বেশি। এখান থেকেই দ্রুত রাজস্ব আসে।

সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে কিছু উদ্যোগ : আগামী বাজেটে দেশের সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর চেষ্টা থাকবে। এখন যে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে সেটি ৭.৫ শতাংশে এ নামিয়ে আনার চেষ্টা থাকবে। এ ছাড়া আগামী বাজেটে ইরান-ইসরাইল সংঘাতের কারণে বিদ্যুৎ, এলএনজি, সার, খাদ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা ভর্তুকি রাখা হতে পারে। এতে চাল, সার, বিদ্যুতের দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা হবে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে বাজার মনিটরিং জোরদারে নজর দেওয়া হবে আগামী বাজেটে।

সময়ের আলো/জেডি 



  বিষয়:   কর  অর্থনীতি  রাজস্ব  ব্যবসা-বাণিজ্য 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: