‘শুধু মাটি কাটলেই হবে না, খাল পুনরুদ্ধারে দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা’

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

খাল পুনঃখননকে শুধু মাটি কাটার প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল মিলবে না বলে মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা বলেছেন,

2026-05-09T15:40:46+00:00
2026-05-09T15:40:46+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
‘শুধু মাটি কাটলেই হবে না, খাল পুনরুদ্ধারে দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা’
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ৩:৪০ পিএম 
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) কনফারেন্স। ছবি : সংগৃহীত
খাল পুনঃখননকে শুধু মাটি কাটার প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল মিলবে না বলে মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা বলেছেন, খাল পুনরুদ্ধারকে জাতীয় জলাশয় পরিকল্পনা, স্থানিক পরিকল্পনা, জলবায়ু অভিযোজন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।

শনিবার (৯ এপ্রিল) রাজধানীর বাংলামোটরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) কনফারেন্স হলে আয়োজিত ‘খাল পুনঃখনন কর্মসূচি: পানিব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন ও স্থানিক পরিকল্পনার প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান। আরও বক্তব্য দেন বিআইপির সহসভাপতি শেখ মেহেদী আহসান।

খাল শুধু খনন নয়, দরকার কাঠামোগত পরিকল্পনা

ড. আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের নদী, খাল, বিল, লেক, জলাভূমি ও নিম্নভূমি শুধু পানি ধারণের জায়গা নয়; এগুলো কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, জীবিকা ও জলবায়ু সহনশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাশয় ভরাট, খাল দখল ও প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবক্ষয়ের কারণে পানিব্যবস্থাপনা এখন বড় স্থানিক পরিকল্পনার সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকা ও অন্যান্য নগর এলাকায় খাল ও জলাশয় দখল ও ভরাটের কারণে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা, নগর বন্যা ও জনদুর্ভোগ বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

জলাভূমি হারানোয় বাড়ছে তাপমাত্রা

প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে ঢাকায় জলাভূমি কমার সঙ্গে সঙ্গে নগরের তাপমাত্রা বেড়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকায় প্রায় ৬৯ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। একই সময়ে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৩ দশমিক ৪৪ ডিগ্রি থেকে ৯ দশমিক ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিসংকট ও ভূগর্ভস্থ পানি

সংবাদ সম্মেলনে বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির সংকটও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, পুনঃখননকৃত খাল, পুকুর ও বিল বর্ষার পানি ধরে রেখে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এজন্য বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন।

রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়নের গুরুত্ব

শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, বর্তমান সরকার খাল পুনঃখননকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দেওয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, যা ইতিবাচক ফল আনতে পারে। বাংলাদেশে যেকোনো উন্নয়ন কর্মসূচি রাজনৈতিক অগ্রাধিকার পেলে তার বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে ভালো হয়।

তিনি বলেন, খাল পুনঃখননের প্রয়োজন বহুমাত্রিক-শুষ্ক মৌসুমে কৃষির জন্য পানি সংরক্ষণ, মৎস্য চাষ, পরিবেশগত ভারসাম্য ও প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধার। তবে অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও দখলের কারণে বহু খাল নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। উজানের পানি প্রত্যাহার ও নদীর প্রবাহ পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে খালগুলোর পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শুধু খাল খনন করলেই সুফল মিলবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোথাও খরা, কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে এগুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দাবি

শেখ মেহেদী আহসান বলেন, আগের মতো একই ধাঁচে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যর্থতা আসবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি ও কৃষি সংস্থার পাশাপাশি নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন পেশাজীবীকে যুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, খাল পুনঃখননকে প্রকৌশল প্রকল্প হিসেবে না দেখে সমন্বিত নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। এতে পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর জোর

অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, খাল পুনঃখননকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনায় আনতে হবে। শুধু খনন নয়, পানি প্রবাহ, রক্ষণাবেক্ষণ, দখলমুক্তকরণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি জানান, অনেক এলাকায় পুনঃখননের পর অল্প সময়ের মধ্যেই আবার পলি জমে খাল ভরাট হয়ে যায়। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গভীরতা কমে যায়। তাই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা জরুরি। তিনি আরও বলেন, খাল পুনরুদ্ধারকে জাতীয় জলাশয় পরিকল্পনা, স্থানিক পরিকল্পনা ও জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে, যাতে দখল বা দূষণ ফিরে না আসে।

১১ দফা সুপারিশ

সংবাদ সম্মেলনে ১১ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, জাতীয় পানিসম্পদ পরিকল্পনা প্রণয়ন, অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা, জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল মনিটরিং, খাল-জলাশয়কে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ ও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা, পরিবেশগত সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে কমিউনিটি-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।

আরবিএন


  বিষয়:   বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স  বিআইপি  কনফারেন্স 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: