মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ মাসে বিদেশগামী কর্মী প্রবাহ ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশ কমে গেছে। এই যুদ্ধের ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশি অভিবাসীরা চাকরি, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অভিবাসন সম্ভাবনা নিয়ে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
চলমান এই যুদ্ধের ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে বা অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে সম্ভাব্য বহু চাকরির সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে বুধবার শরণার্থী ও অভিবাসী আন্দোলন গবেষণা ইউনিট (আরএমএমআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত উপসাগরীয় শ্রমবাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যা লাখো বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিএমইটির (জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) বরাত দিয়ে বলা হয়, যুদ্ধের কারণে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ মাসে বিদেশগামী কর্মী প্রবাহ ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশ কমে গেছে। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হচ্ছে।
এ অনিশ্চয়তা সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’-এর মেগা প্রকল্পগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে নিওম, রেড সি পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্প এবং কিদ্দিয়া। এসব প্রকল্প নির্মাণ ও সেবা খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছিল।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়া, ব্যয় বৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে সম্ভাব্য বহু চাকরির সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পৃক্ততায় ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি আমিরাতে বসবাসরত প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশির জীবন ও জীবিকার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আঞ্চলিক পরিবহন ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় অভিবাসন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ‘দ্বিতীয় সংকট’ তৈরি হয়েছে। কর্মী পাঠানো বিলম্বিত হওয়া ও বাতিল হওয়ার কারণে নিয়োগদাতা এজেন্ট ও বিদেশে যেতে আগ্রহী কর্মীদের মধ্যে খরচ ও অর্থ পরিশোধ নিয়ে বিরোধ তৈরি হচ্ছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য সরকারের কোনো সমন্বিত সংকট মোকাবিলা ব্যবস্থা নেই। চাকরি হারানো, আহত হওয়া বা দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া শ্রমিকদের জন্য আলাদা জরুরি তহবিলও নেই।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, এই সংকট মোকাবিলায় উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোতে বাংলাদেশি দূতাবাসে বিশেষ অভিবাসী সংকট মোকাবিলা সেল গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা চালু বাংলা ভাষার হটলাইন চালু করা যায়।
এ ছাড়া ইরান থেকে ফেরা কর্মীদের বিমানভাড়া সহায়তা, নগদ সহায়তা এবং চাকরি হারানো বা সংঘাতজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য জরুরি তহবিল গঠন করা জরুরি। আর আটকে পড়া কর্মীদের জন্য জরুরি খাদ্য, আশ্রয় ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, হোয়াটসঅ্যাপ ও এসএমএসের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় সংকট সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা দরকার। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
আরএমএমআরইউর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ২০০ বাংলাদেশি ইরান থেকে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু সরকার থেকে ফেরত আসাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য আমরা পাইনি, যা তাদের পুনর্বাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি যুদ্ধকবলিত অভিবাসীদের সহায়তায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের তহবিল ব্যবহার না করে আলাদা বাজেট বরাদ্দের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই তহবিল শ্রমিকদের অবদানে গঠিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন, লেবাননে অন্তত ৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। সৌদি কোম্পানিগুলো তাদের কর্মীসংখ্যা কমিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কর্মীরা মজুরি কমে যাওয়া, মজুরি আত্মসাৎ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি হচ্ছেন। সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অন্তত ১১ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার বলেন, সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল থেকে বাতিল হওয়া ফ্লাইট, আটকে পড়া অভিবাসী এবং দেশে ফেরত আসাদের তথ্য পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো রিয়েল-টাইম মনিটরিং ড্যাশবোর্ড নেই। ইরান বা উপসাগরীয় দেশ থেকে ফেরা কর্মীদের জন্য কোনো সমন্বিত পুনর্বাসন কর্মসূচি নেই। বিদেশে আটকে পড়া ও কাজ হারানো শ্রমিকদের জন্যও জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি।
সময়ের আলো/জেডি